• ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮, শনিবার
  • 31 July 2021, Saturday
ইমুনিতি ইমুনিতি ছবি: ইন্টারনেট

ইমুনিতি ইমুনিতি

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী

Updated On: 11 Jun 2021 01:04 am


দেড় বছরের শিশুটি অন্য ঘর থেকে প্রবল বেগে হামাগুড়ি দিয়ে এ ঘরে চলে এল। খাটের পায়া আঁকড়ে বিছানার উপরে উঠে পড়ল। খাটের এক কোণায় রাখা স্টিলের বাটিটার ঢাকনা সরিয়ে ভিতরে রাখা পুঁটুলিটা বের করে নাকের সামনে ধরল। শুঁকল দু’ বার। একগাল হেসে আধো আধো বুলিতে বলল, ইমুনিতি ইমুনিতি। খাটের উপরে বসে থাকা বছর সত্তরের মানুষটি তাঁর নাতির কাণ্ড দেখে যেভাবে হাসলেন, তাকে পরমানন্দ বলে।

আমার চোখে হয়তো বিস্ময় লেগে ছিল। ভদ্রলোকের তা নজর এড়ায়নি। পুঁটুলিটা বের করে বললেন, দশ মিনিট পর পর এটা শুঁকি, বুঝলে ভাই? লবঙ্গ, কালোজিরে আর এলাচ গুঁড়ো করে রেখে দিয়েছি। ফেসবুক বলেছে, যতবার শুঁকব, পাল্লা দিয়ে বাড়বে ইমিউনিটি। জানতে পারলাম, ইমিউনিটি বাড়ানোর জন্য যে ঢালগুলো ধারণ করেছেন দিনযাপনে, পুঁটুলিটা তার এক সামান্য অংশ মাত্র। সকালে উঠেই তুলসী পাতা চিবিয়ে খান। প্রতি আধ ঘণ্টা অন্তর ভাপ নেন। মানে ভেপার। আদা চা খান দিনে ছ’ বার। কীসব ক্কাথ মেশানো চা তিন কাপ। ভিটামিন সি ট্যাবলেট দিনে দুটো। জিঙ্কের ট্যাবলেট ও মাল্টিভিটামিন দিনে একটা করে। জলের বোতলে মিশিয়ে দেন তুলসীর ড্রপ। অ্যান্টি অক্সিডেন্টের বড়ি খাওয়া শুরু করেছেন মাসখানেক হল। অনলাইনে অর্ডার করে একটা অত্যন্ত দামি প্রোটিন পাউডার কিনে এনেছেন। সকালে একবাটি দুধ খাওয়ার সময় তাতে ওই পাউডার মিশিয়ে নেন। রাত্রিবেলার দুধের বাটিতে মেশে হলুদের ড্রপ। এছাড়াও প্রতিদিনের পুষ্টিতে যোগ হয়েছে একটি অশ্বগন্ধার ট্যাবলেট ও রসুনের বড়ি। টিভির পাশে লাইন দিয়ে সাজানো আছে বিভিন্ন আকারের, নানা রঙের কৌটো। কোনোটার গায়ে লেখা ইমিউনোকিং, অন্যটা ইমিউনোবুস্ট। উনি বললেন, এগুলো যখন যতটুকু পারা যায় খেয়ে নিই আর কি। ইমিউনিটিটা তো বাড়াতে হবে, কী বলো ভাই?” ফেসবুকেরই কোনো এক পোস্ট থেকে উনি সম্প্রতি জানতে পেরেছেন ইমিউনিটি বাড়ানোর ক্ষেত্রে গোমূত্রের অসাধারণ ক্ষমতার কথা। কোন ব্র্যান্ডের মূত্রের কোয়ালিটি ভালো তা নিয়ে আপাতত স্বতঃপ্রণোদিত ফেসবুক রিসার্চ ও সমীক্ষা চালাচ্ছেন। ভদ্রলোক রসিক মানুষ। বললেন, এত কিছু করা সত্ত্বেও মনের মধ্যে কেউ যেন সারাদিন হেঁকে যায়, ইমিউনিটি কি কম পড়িয়াছে? ওকে দুঃখ দিতে চাই না। তাই সীমিত সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু পারা যায় করার চেষ্টা করি। শরীর তো একটাই, কি বলো?” বয়স নিতান্তই কম বলে দাদুর মতো নাতি এতটা পেরে ওঠে না এখনও। হামাগুড়ি দেওয়ার সময় নিজের সাধ্যমতো ইমিউনিটি পুরে দেওয়া পুণ্য পুঁটুলিটি তাই বারবার শুঁকে যায়।

হাজার ওয়াটের আলো যে ওকে রাঙিয়ে দেবে কোনোদিন, ইমিউনিটি নামক শব্দটা কি নিজেও ভাবতে পেরেছিল কখনো? স্কুলজীবনের শেষে জীবনবিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে যে শব্দটাকে বিদায় জানিয়েছিলাম, তা আবার বছরদেড়েক হল কলার তুলে হাজির। সিরিয়ালের ব্রেকে, এফএম রেডিওর দুটো গানের ফাঁকে, খবরের কাগজের পাতায়, আম আদমির মাথায় এখন শুধু ইমিউনিটি এবং ইমিউনিটি। প্যারাসিটামল, প্যান্টোপ্রাজল সাধারণ ওষুধ। তাই ওগুলোর নির্দিষ্ট ডোজ থাকে। ইমিউনিটি বুস্টার হল মহৌষধি। ওষুধের পিছনে নাম কা ওয়াস্তে একটা প্রয়োগবিধি লেখা থাকলেও আমাদের বিশ্বাস বলে, তা যত খাওয়া যায় তত ভালো। আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল, এক বুস্টারের সঙ্গে অন্য বুস্টারের কোনো বিরোধ নেই। ফলে সবই খাওয়া যেতে পারে সানন্দে। এই মহৌষধির কারবারি যাঁরা, তাঁদের হাসি চওড়া হচ্ছে ক্রমশ। কতটা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মালে থেমে যাওয়া উচিত, তা নিয়ে মানুষের ভাবতে কার্যত বয়েই গিয়েছে। থার্মোমিটার তাপমাত্রা মেপে দেয়। লাল নীল আলো জ্বালিয়ে শরীরের অক্সিজেন মেপে দেয় এই এতটুকু এক অক্সিমিটার। অনলাইনে অর্ডার করে আনানো ভিডিও গেমের মতো প্রেশার মাপার যন্ত্র বিপ বিপ শব্দ করে মিনিটখানেকের মধ্যে বাতলে দেয় ব্লাড প্রেশার। হাতে বেঁধে রাখা স্মার্ট ব্যান্ড বলে দেয় হাঁটলাম কতটা আর তার ফলে ক্যালরি পুড়ল কত। ইমিউনিটি মাপার এমন কোনো যন্ত্র বাজারে আসেনি এখনও। ফলে প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর শেষ বলে কিছু নেই। ইমিউনিটি গর্জানোর কারবারিদের কাছে এই তথ্য এক আনন্দময় পাশবালিশ।

এক পরিচিত নাট্যকর্মী সেদিন মাথা চুলকে বললেন, নায়কের থেকে পার্শ্বচরিত্রের দাম বেড়েছে অনেক। বুঝলাম, নিশানায় সেই ইমিউনিটি বুস্টার। ভাত-রুটি-ডাল-মাছ-মাংস যদি খাদ্য হয়, তাহলে ইমিউনিটি বুস্টার হল খাদ্য পরিপূরক। ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট। বিজ্ঞাপন আর গুজবে গলা অবধি ডুবে থাকা আমরা মূল ডায়েটের থেকে ডায়েটের এই সাপ্লিমেন্টকে পাত্তা দিতে শুরু করে দিয়েছি অনেক বেশি। এই পালটে যাওয়া অভ্যেস শুধু এ দেশের মানুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আঁচ লেগেছে বিশ্বজুড়ে। একটি মার্কিন সমীক্ষা বলছে, রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়ানোর এই ম্যাজিক খাবারের মার্কেট সাইজ ২০২৬ সালে ছুঁয়ে ফেলবে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯ সালে এর পরিধি ছিল ১৫.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। আশা করা যাচ্ছে, প্রতি বছর তা বাড়বে ৭.২ শতাংশ হারে। বিলিয়নের ঘাড়ে এই শতাংশ কার্যত বিশ্বজয়ের কথা বলে। ওয়াকিবহাল শিবিরের অনেকেই মনে করছেন, মানুষের মনে কোভিড ভীতি যত দিন জিইয়ে রাখা যাবে, প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোর ক্যাশবাক্সে ততদিন জোয়ার লেগে থাকবে। সংস্থাগুলোর কাছে বড় আশার কথা, এই ভীতি আপাতত যাওয়ার নয়।

যে কোনো অনলাইন বিপনির ইমিউনিটি বুস্টার সামগ্রীর পরিধি দেখলে চোখে ঝিলমিল লেগে যায়। কোনো বুস্টারের গায়ে যদি ফাস্ট-এর তকমা লেগে থাকে, তবে অন্যটির স্টিকার বলে আমি আল্ট্রা ফাস্ট। সেকেন্ডে অ্যাসিডিটি নিরাময়ের মতো রাতারাতি ইমিউনিটির ব্রহ্মাস্ত্র শানিয়ে নেওয়ার কথা বলে ঝলমলে বিজ্ঞাপন। কোনোটাতে ১১টা ভেষজের দেমাক তো অন্যটাতে ২৪টি জড়িবুটির আস্ফালন। মধ্য তিরিশে পৌঁছে জানতে পারলাম, শুধু তুলসী বলে কিছু হয় না দুনিয়ায়। জানা দরকার, রামা তুলসী, শ্যামা তুলসী, বিষ্ণু তুলসী, বিশ্ব তুলসী না অমৃত তুলসী—আসলে মুখে উঠছে কোনটা? কিনে নিতেই হবে তুলসীর ড্রপ। রামা-শ্যামা-বিষ্ণু-বিশ্ব-অমৃত সবই চলে আসবে অমুক সংস্থার তুলসী ড্রপে। লিটারে পাঁচ ফোটা। যত লিটার জল খাওয়া হবে দিনে, পাঁচ করে মিশতেই থাকবে। অর্ডার দেওয়ার পরে হয়তো দেখা যাবে অন্য সংস্থার ড্রপে মিশে ছিল কাপুরী তুলসী ও শ্বেত তুলসীর মতো আরো দুটো জাদু-পাতার নির্যাস। দুটো মিস করে গেলাম। এবারে যাব কোথায়! জড়িবুটি আর ভিটামিন-মিনারেলের যে কয়েকশ পারমুটেশন-কম্বিনেশন ছোট-বড়-মাঝারি ব্র্যান্ডের পোশাক পরে সেজেগুজে হাজির হয়ে যায় ল্যাপটপ কিংবা মোবাইলের পর্দায়, তা সংকটমোচন করে যতটা, তার থেকে অনেক বেশি ঢেকে দেয় ধোঁয়াশার চাদরে। অফলাইন তো বটেই, অনলাইন বিপণির পাকা বাজারুরাও এর কোনো সহজ সমাধান পান না।

চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ কিন্তু মনে করেন, এই ইমিউনিটি বুস্টার বলে পদার্থগুলো আসলে মিথ ছাড়া কিছু নয়। তাঁরা বলছেন, এই ইমিউনিটি বুস্টিং অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা রাঙিয়ে দেওয়ার যে দাবি করে থাকে সংস্থাগুলো, তার কোনোরকম বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, প্রমাণ তো অনেক দূরের কথা। চিকিৎসকদের মতে, রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা আসলে নিহিত থাকে আমাদের শরীরের অন্দরের সার্কিট বোর্ডে। এর কোনো ফাস্ট, সুপার ফাস্ট কিংবা আল্ট্রা ফাস্ট সমাধান পথ নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন বিজ্ঞাপনে মজে না গিয়ে শরীরের ভিতটাকে আরো মজবুত করার কথা। হজমী গুলির মতো ভিটামিন মিনারেল ট্যাবলেট না গেলার সহজ এবং স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প হিসাবে তাঁরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন আরো বেশি পরিমাণে ফল-শাক-সবজি খাওয়ার কথা, প্রোটিন পাউডার না খেয়ে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার কথা। ইমিউনিটি বাকি থেকে গেল কি না ভেবে যাঁদের কপালের বলিরেখা প্রকট হচ্ছে ক্রমশ, রাত্রে ঘুম আসছে না, চিকিৎসকরা তাঁদের হাত জোড় করে বলছেন মন দিয়ে ঘুমোতে। সাধারণ মানুষের ইমিউনিটি পাগলামি দেখে এক পরিচিত চিকিৎসককে বলতে শুনেছিলাম, পরিশ্রম করব না, হাঁটব না, দৌড়ব না, সারাদিন বাড়িতে বসে থেকে কিলো কিলো চিপস্ খাব, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ওয়েব সিরিজ দেখব, দুশ্চিন্তা করব আর প্রায়শ্চিত্তর জন্য ইমিউনিটি বুস্টারে স্নান করব---- এ করলে কি আর শরীর ঠিক থাকে? এ আমাদের গোড়ায় গলদ। অথচ, বলার কোনো লোক নেই।

জনস্বাস্থ্য নিয়ে যাঁরা সত্যিই সজাগ, তাঁরা এই উলটোপালটা, মর্জিমাফিক বুস্টারসেবনের মধ্যে আসলে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন। তাঁদের মতে, খাদ্যের কোন উপাদান আমাদের শরীরের জন্য কতটুকু প্রয়োজনীয়, তা কিছুই না জেনে কিংবা জানার চেষ্টা না করে মুড়ি-মুড়কির মতো বুস্টার খেয়ে গেলে একদিন তার মূল্য দেবে শরীর। দেবেই। অতিরিক্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়তে গিয়ে ইতিমধ্যেই বহু মানুষ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হচ্ছেন। মজার কথা হল, বেশি বুস্টার খেয়ে শরীরে যখন কোনো অসুখ ডেকে আনছেন কেউ, তখনও ভাবছেন, রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা কম হয়ে যাওয়ার জন্যই বুঝি এই বিপদ হল। ফলে পরের মাসের শপিং কার্টে যোগ হচ্ছে আরো একটা বেশি ইমিউনিটি বুস্টার। যাহা কম পড়িয়াছিল।

বুস্টারজনকদের কানে নিরন্তর ডিজে মিউজিকের ঝিনচ্যাক।

 

 

Recent Comments:

Leave a Comment: