• ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮, শনিবার
  • 31 July 2021, Saturday
দ্য পোলার কোয়েস্ট ছবি: ইন্টারনেট

দ্য পোলার কোয়েস্ট

সুদীপ চট্টোপাধ্যায়

Updated On: 15 Jul 2021 12:33 am



 


পর্ব: ২১


 


কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর সব সন্দেহ দূর হয়ে গেল। হেনরি বুঝলেন, তিনি নিজের জায়গায় ফিরে এসেছেন। একা থাকতে কোনোরকম অসুবিধে হচ্ছে না, হাঁটার ছন্দও ফিরে পেয়েছেন। এত দিন পর এ ধরনের অভিযানে এলে কিছুদিন শারীরিক অস্বস্তি থাকেই, কিন্তু সেটা বাদ দিলে সব ঠিকঠাক। সবচেয়ে বড় কথা, একটা শান্তি অনুভব করছেন সর্বক্ষণ। তিনি ডায়রিতে লিখলেন, “So, so happy to be back. Many days of struggle ahead but a glorious start. My spirits lifted as soon as I got going. This is best place on Earth right now.”

প্রথম সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত প্রায় সত্তর নটিকাল মাইল দূরত্ব অতিক্রম করলেন হেনরি। জনি ক্যাশ আর ডেভিড বাউয়ের গান শুনতে শুনতে স্লেজ টানেন, রান্নাও করেন গান শুনতে শুনতে। অডিও ব্রডকাস্টের মাধ্যমে নিজের পরিস্থিতির কথা জানান, অভিজ্ঞতাও ভাগাভাগি করে নেন শ্রোতাদের সঙ্গে।

কিন্তু সব হিসেব ওলটপালট হয়ে গেল ২৪ নভেম্বর। এক বিধ্বংসী তুষারঝড় আছড়ে পড়ল দক্ষিণ মেরুর ওপর, এরকম সর্বনেশে ঝড় আগে দেখননি হেনরি। বরফের স্তরের নীচে যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে সমস্ত পৃথিবী, আর্তনাদ করছে অদৃশ্য দৈত্যরা। তাঁবুর মধ্যে গুটিসুটি মেরে বসে অডিও ব্রডকাস্টে ঝড়ের বিবরণ দিলেন তিনি। বললেন, “A salutary reminder just who is in control around here. Trespassers will be punished.” 

পরের দিন হেনরি তাঁবু থেকে বেরিয়ে দেখলেন সমস্ত অঞ্চল পুরু বরফের আস্তরণে ঢেকে গেছে। কোমর পর্যন্ত ঢুকে যাচ্ছে হাঁটতে গেলে। যেন একটা আইসক্রিমের বাটিতে বসিয়ে দিয়েছে কেউ। স্লেজ নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হেনরি বুঝলেন, পরিস্থিতি মোটেও সুবিধের নয়। স্লেজ টানতে অসুবিধে হচ্ছে, শরীরটাও ঠিক জুত মনে হচ্ছে না, তারপর আকাশের অবস্থাও চিন্তাজনক। কিন্তু কী আর করা! বসে তো থাকা যায় না! এগিয়ে চললেন হেনরি।

পরের দিন পথ চলার সময় একটা পাহাড়প্রমাণ বরফের খাড়াই পথ পড়ল। ক্রেম্পন পড়ে স্লেজ টানার চেষ্টা করলেন হেনরি, কিন্তু স্লেজ একচুল নড়ল না। কয়েক বার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলেন তিনি। কিন্তু এভাবে বসে থাকলে ঠান্ডায় জমেই মারা যাবেন! কী করা যায়? হেনরি ভাবলেন, জিনিসপত্র বের করে দিলে হয়তো স্লেজ টানা সহজ হবে। বেশিরভাগ জিনিস বের করে একটা পাথরের ওপর রেখে খাড়াই পথ ধরে উঠতে শুরু করলেন তিনি। ওপরে পৌঁছে জিনিসপত্র নামিয়ে আবার ফিরতে হল অন্য জিনিসগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্যে। বেশ কয়েক বার ওঠানামা করার পর যখন সব জিনিস স্লেজে তুলে নিয়ে আবার এগোলেন, পায়ে এককড়া ক্ষমতা নেই। এমন সময় বেসামাল হয়ে একটা অগভীর ক্রিভাসে পা পড়ে গোড়ালির হাড়টা মুচকে গেল। অসহ্য ব্যথা হলেও দাঁতে দাঁত চিপে সেটা সহ্য করলেন তিনি। এই সব খুব সামান্য ঘটনা, মেরু অভিযানে এ ধরনের ঘটনা ঘটা খুব স্বাভাবিক; এই বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন তিনি।

পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে গড়াতে লাগল দিনে দিনে। ঝড়ের কোনো ঠিকঠিকানা নেই। একদিন শান্ত থাকে তো পর পর দু-তিন দিন ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অমানুষিক পরিশ্রম আর মচকে যাওয়া গোড়ালি নিয়ে এগোতে থাকার ফলে পঞ্চাশোর্ধ্ব হেনরির শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে লাগল। প্রতিদিনই তিনি ডায়রিতে এই অসহায়তার কথা লেখেন, সন্দেহ প্রকাশ করেন পরের দিনের পথ চলা নিয়ে। কিন্তু দেখা যায়, সকাল হলেই ঠিক স্লেজ টেনে বেরিয়ে পড়েছেন তিনি। দাঁতে দাঁত চেপে এগোতে থাকেন, যন্ত্রণার কথা মনে পড়লে স্যাকলটনকে মনে করেন বার বার। ইয়ারফোন প্রিয় গান আর পডকাস্ট চালিয়ে দেন মনকে অন্য দিকে ঘোরানোর জন্যে, কিন্তু থেমে থাকেন না। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তাঁর এই উদ্যম আর জীবনীশক্তি দেখে কথা খুঁজে পান না বিশ্লেষকরা। এক জানুয়ারিতে সাউথ পোলে পৌঁছনোর লক্ষ্য নিয়ে হেনরি ক্রমে এগিয়ে চলেছেন বাধাবিপত্তিকে পিছনে ফেলে। তার ওজন কমে অর্ধেক হয়ে গেছে, কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে এসেছে, পা দুটো কাঠির মতো সরু হয়ে গেছে, একটা জমে যাওয়া প্রোটিন বার খেতে গিয়ে সামনের একটা দাঁত ভেঙে গেছে; কিন্তু কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন তাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে। 

এই শরীর নিয়ে যে তিনি কী করে স্লেজ টানছেন, সেটা ভেবেই তাজ্জব হয়ে যায় এএলই অপারেটররা।


Recent Comments:

Leave a Comment: