• ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮, শনিবার
  • 31 July 2021, Saturday
দ্য পোলার কোয়েস্ট ছবি: ইন্টারনেট

দ্য পোলার কোয়েস্ট

সুদীপ চট্টোপাধ্যায়

Updated On: 11 Jun 2021 12:54 pm

পর্ব: ১৭



এই অবস্থাতেও এই জনহীন প্রান্তরের সৌন্দর্য মুগ্ধ করে হেনরিকে। 

অ্যালেকজান্দ্রা আর গাও যখন আগেভাগে ডিনার করে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়ে, হেনরি ক্লান্ত শরীর নিয়েও খানিকটা টহল দিয়ে আসে। রস আইস সেলফের ভাসমান বরফের সীমানা কত বড়, সেটা এখন সে আন্দাজ করতে পারছে। ফ্রান্সের চেয়েও বড় এই বরফের রাজ্য। দক্ষিণ মেরুর সম্পূর্ণ ক্ষেত্রফল ধরতে গেলে সাড়ে পাঁচ লক্ষ বর্গ মাইল, শীতকালে সেটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। স্যাকলটন এই অঞ্চলকে বলেছিলেন ‘dead, smooth, white plain, weird beyond description’. কিন্তু এই বিচিত্র প্রান্তরের মধ্যেও প্রকৃতি কিছু অসামান্য ভাস্কর্য নির্মাণ করে রেখেছে। নীল আর সাদা বরফের তৈরি কিছু গ্লেসিয়ার দেখে মনে হয় মিউজিয়াম থেকে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে। আর এখানকার মতো দিগন্ত খোলা আকাশ হয়তো পৃথিবীতে অন্য কোথাও দেখা যায় না। হেনরি কানে ইয়ারফোন দিয়ে গান শুনতে শুনতে হাঁটে, কখনো কখনো একদৃষ্টে চেয়ে থাকে দিগন্তের দিকে। এই জনমানবহীন প্রান্তরের মাঝে সে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে। 

ক্রমে আরো দক্ষিণের দিকে এগিয়ে চলল হেনরিরা। বরফের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে জায়গার সঙ্গে। কোথাও ঝুরো বরফ, কোথাও পাউডারের মতো নরম তুষারস্তর, আবার এমন জায়গাও আছে যেখানে বরফ পাথরের চেয়েও শক্ত। মাঝে মাঝে চড়াই পড়ে, তখন দাঁতে দাঁত চিপে স্লেজ টানতে হয়। এরকম পরিস্থিতিতে ক্র্যাম্পন পরা অবস্থায় ম্যানহাউলিং করে চড়াই ভাঙা যে কী পরিশ্রমের কাজ, সাধারণ মানুষ সেটা আন্দাজও করতে পারবে না। প্রয়োজনীয় ট্রেনিং না থাকলে দু-তিন মিনিটের মধ্যেই হৃদ্‌পিণ্ড কাজ করা বন্ধ করে দেবে, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে অভিযাত্রীরা। হেনরি, অ্যালেকজান্দ্রা আর গাও; তিন জনেই টানা পাঁচ বছর এই অভিয়ানের জন্যে প্রস্তুতি নিয়েছে কিন্তু তাতেও কষ্ট লাঘব হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। 

প্রতিদিন ছয় থেকে আট হাজার ক্যালোরি বার্ন হচ্ছে বলে প্রত্যেকেই চকোলেট, সালামি, বাদামের মতো ফ্যাটযুক্ত খাবার খাচ্ছিল বেশি করে, কিন্তু তাতেও কিছু লাভ হল না। অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে তিন জনেরই ওজন কমতে শুরু করল হু হু করে। বেগতিক দেখে প্রমাদ গুনল হেনরি। এভাবে ওজন কমে গেলে স্লেজ টেনে নিয়ে এগোনোর পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। শরীর ও মনের ওপর প্রচুর চাপ পড়ছে, এরকম পরিস্থিতিতে কোনো ভালো কথা মনে পড়ে না। হতাশা আর নৈরাশ্যবাদী চিন্তাই মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। গাও আর অ্যালেকজান্দ্রার মেজাজ বিগড়ে গেছে, কথায় কথায় ঝগড়া লাগিয়ে দেয় তারা। আর্নেস্ট স্যাকলটন মারা গেছেন একশো বছর আগে, তার পদচিহ্ন অনুসরণ করে নিজেদের প্রাণ খোয়ানোর অর্থ কী? নিজেদের বোকামির কথা ভেবে হাহুতাশ করছে দুজনেই। হেনরি বুঝতে পারে, এর চেয়েও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন স্যাকলটন। তারা চাইলেই রেসকিউ টিমের সাহায্য নিতে পারে, কিন্তু একশো বছর আগের অভিযাত্রীরা আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ফিরে এসেছিলেন। এরকম পরিস্থিতিতে স্যাকলটন কী করে মাথা শান্ত রেখেছিলেন? চাগিয়ে রেখেছিলেন দলের সদস্যদের?

হেনরি মন-প্রাণ দিয়ে দলের দুজনকে সামলানোর চেষ্টা শুরু করে। বিকেলবেলায় গোল হয়ে বসে প্রত্যেকে বাড়ির কথা বলে, মনে করে খুঁটিনাটি ঘটনা। প্রতিটা গল্পের জন্যে একটা করে চকোলেট পুরস্কার দেওয়া হয়। শুনতে যতই আজগুবি লাগুক না কেন, এই ধরনের ছোট ছোট এক্সারসাইজ মস্তিষ্ককে শান্ত রাখে, সতেজ রাখে স্নায়ুকে।


ঝড়টা এল সেই দিন দুপুরের দিকে। স্লেজ টেনে এগিয়ে চলেছে তিন জন, এমন সময় ঝোড়ো হাওয়া আর বরফের দাপটে প্রায় অন্ধ হয়ে গেল তারা। এত জোরে বাতাস বইছে যে স্লেজ সহ উড়িয়ে নিয়ে আছড়ে ফেলতে পারে তিন জনকেই, বরফের কুচি সুচের মতো এসে আঘাত করছে গায়ে। হেনরি চিৎকার করে ক্যাম্প খাটানোর নির্দেশ দিল। এই ঝড়ে বাইরে থাকলে মৃত্যু নিশ্চিত। কিন্তু ক্যাম্প খাটানো কি মুখের কথা? হাওয়ার দাপট সামলে তাঁবু খুলে বের করতে করতেই উড়ে যাচ্ছিল গাও আর হেনরি, কোনোরকমে বরফে ক্র্যাম্পন গেঁথে সে যাত্রা রক্ষা পেল তারা। আইস স্ক্রু দিয়ে তাঁবু আটকে যখন তারা ভিতরে এল, কাঁপতে কাঁপতে জ্বর এসে গেছে তিন জনেরই। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। ঝড়ের দাপট ক্রমেই বাড়ছে। 


দু’ দিন ধরে ক্রমাগত সেই ঝড় চলল। বাইরে বেরোনোর প্রশ্নই ওঠে না। ইতিমধ্যে তাঁবুটা শক্ত কর ‘পিচ’ করা হয়েছে, যাতে হাওয়ার গতিবেগ বাড়লে উড়ে না যেতে পারে। মাঝে অবশ্য বার বার উঠে গিয়ে বরফ সরিয়ে আসতে হয়। প্রথম দিন রাত্রে তাঁবুটা চার ফুট বরফের নীচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। বরফ পড়লে নিয়ম হল, অনবরত তাঁবুর ছাদ ঝাঁকিয়ে যেতে হয়। এই খানে অবশ্য সে নিয়ম খুব একটা কাজে আসবে না। বেশি তুষারপাত হলে বরফ চাপা পড়ে একাধিক মানুষ তাঁবুর ভিতরেই দমবন্ধ হয়ে মারা গেছেন, এরকম নজির বড় কম নেই।


ঘাম আর ভেজা মোজার গন্ধের সঙ্গে শুকনো খাবার আর গ্যাস কুকারের গন্ধ মিলেমিশে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, কিন্তু কিছু করার নেই। স্যাকলটন যে স্থান পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এসেছিলেন, সেই জায়গাটা খুব একটা দূরে নয়। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হলে শতবর্ষে রেকর্ড তৈরি করা দূরের কথা, প্রাণ নিয়েও টানাটানি পড়তে পারে। রবার্ট ফাল্কন স্কট আর তার সঙ্গীরা সাপোর্ট ডিপো থেকে মাত্র বারো নটিকাল মাইল দূর মৃত্যুবরণ করেছিলেন, সেই কথাটা কারো অজানা নয়। 

গল্প করে আর আড্ডা দিয়েই দিন কেটে গেল। হেনরি সামরিক বাহিনী থেকে এসেছে, তার ‘সেন্স অফ হিউমার’ তীক্ষ্ণ। নিজেদের আসন্ন মৃত্যু নিয়ে হাসিঠাট্টা করতে শুরু করল সে; প্রথম প্রথম অস্বস্তি বোধ করলেও এক সময় গাও আর অ্যালেকজান্দ্রা হাসতে শুরু করল। তারাও ইয়ার্কি শুরু করে দিল এই বিপদ নিয়ে। বিষম পরিস্থিতি নিয়ে হাসিঠাট্টা করলে বেশ কাজ হয়, এটা হেনরি নানা অপারেশনে গিয়ে দেখেছে। প্রত্যেকের মনেই আশঙ্কা থাকে, কিন্তু সেই আশঙ্কা মানসিক ভাবে প্রভাব ফেলতে পারে না। 

আরো দু’ দিন পর ঝড় থেমেছে বলে জানাল এএলই-র অপারেটর। জিপ খুলে বাইরে বেরোতে গিয়ে হেনরিরা দেখল, তাঁবুর বাইরে বরফের প্রাচীর গড়ে উঠেছে। বরফ খুঁড়ে বেরোতে না পারলে এখানেই বন্দি হয়ে থাকতে হবে। প্রায় ঘণ্টা তিন খোঁড়ার পর খোলা আকাশের নীচে আসতে পারল তিন জন। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল প্রত্যেকেই। পাঁচ ফুট বরফের নীচে চাপা পড়ে আছে তাঁবু, সেটা বের করে আনতে হবে এই বার। হাই ফাইভ করে কাজে লেগে পড়ল সকলে।


 


Recent Comments:

Leave a Comment: