• ২৯ বৈশাখ ১৪২৮, বৃহস্পতিবার
  • 13 May 2021, Thursday
দ্য পোলার কোয়েস্ট ছবি: ইন্টারনেট

দ্য পোলার কোয়েস্ট

সুদীপ চট্টোপাধ্যায়

Updated On: 29 Apr 2021 01:59 am

পর্ব (১২)


আমাদের সমাজ বড় বিচিত্র। কবে কোন মানুষকে নায়কের আসনে বসাবে আর কবে তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। একজন মানুষের জীবনের মূল্য ঠিক করা হয় সাফল্য আর ব্যর্থতার পরিমাণ দেখে, কিন্তু ‘ফাইনাল আউটকম’-এর আগের ইতিহাস জানতে কেউই আগ্রহী হয় না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, ‘আনসাং হিরো’-দের রোমান্টিসিজম নিয়ে আদিখ্যেতা করার ফলে হঠাৎ একজন এসে পপ কালচারে ‘ট্রেন্ড’ করতে শুরু করেন, কিন্তু আগের ব্যক্তিকে সোজা ‘হিরো’ থেকে ‘ভিলেন’ বানিয়ে দেওয়া হয়। দুটোই কাম্য নয়, কিন্তু সংবাদমাধ্যমের পক্ষে সব কিছুই সম্ভব। 


এই খেলাটাই হল রবার্ট ফাল্কন স্কট আর আর্নেস্ট স্যাকলটনকে নিয়ে। ব্রিটিশদের বিজয়ী করতে গিয়ে যে স্কট যুদ্ধক্ষেত্রে (পড়ুন অ্যান্টার্কটিকা) প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন, সেই গল্প চাউর করা হল সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ গেলে পাঠক সমব্যথী হবেন, সেটাই স্বাভাবিক।

পরবর্তী পঞ্চাশ বছর ধরে মেরু অভিযানের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ নায়ক হিসেবে স্কটের নাম প্রচার করা হল, নির্বিবাদে তিনি হয়ে উঠেলেন সেরা অভিযাত্রীদের একজন। অন্য দিকে আর্নেস্ট স্যাকলটনের নাম ক্রমে আবছা হতে শুরু করল লোকজনের মানসপট থেকে। যে ব্যক্তির নামে কোনো উল্লেখযোগ্য রেকর্ড নেই, আর সর্বোপরি যে কিনা সাদাসিধে হার্ট ফেল করে মারা গেছে, তাকে হিরো বললে কাগজ বিকোয় না।

কিন্তু আর্নেস্ট স্যাকলটনের মৃত্যুর প্রায় আশি বছর পর, ১৯৯৯ সালে ট্রাভেল রাইটার পল থেরক্স প্রথম স্কটের কর্মপদ্ধতির আলোচনা করেন তাঁর লেখায়। তিনি লেখেন, “Scott was insecure, dark, panicky, humorless, an enigma to his men, unprepared, and a bungler.” একই সঙ্গে তিনি স্যাকলটনের নেতৃত্ব ক্ষমতার তারিফ করেন দরাজ গলায়। 

এর চার বছর পর, ২০০৩ সালে ইতিহাসবিদ ম্যাক্স জোন্স ‘The Last Great Quest’, লিখে হইচই ফেলে দেন। আর্নেস্ট স্যাকলটন যে সে সময়ের ব্যতিক্রমী লিডার এবং অভিযাত্রী ছিল, সেই নিয়ে বিশদে আলোচনা করেন তিনি। 


এর পর স্যাকলটনকে নিয়ে আগ্রহ বাড়তে শুরু করে। কয়েক জন ইতিহাসবিদ উল্লেখযোগ্য নথিপত্র সংগ্রহ করে জানান যে ১৯০৮ সালের নিমরোড অভিযানেই আর্নেস্ট স্যাকলটন সাউথ পোলে পৌঁছে যেতে পারত, তার সে সামর্থ্যও ছিল। শুধুমাত্র দলের কিছু মানুষের ভগ্নস্বাস্থ্যের কথা ভেবেই সে এগোয়নি। খুব বেশি দেরি হলে খাবারে টান পড়তে পারত ফেরার সময়ে, তাতে প্রাণ বিপন্ন হত তার সঙ্গীদের। একজন অভিযাত্রীর কাছে মানুষের প্রাণের মূল্য একটা রেকর্ডের চেয়ে অনেক বেশি হওয়া উচিত।

এই ঘটনা জনসমক্ষে আসার পর থেকে স্যাকলটনকে নিয়ে রাশি রাশি বই লেখা শুরু হয়ে যায়। একটা সাব-জনরা তৈরি হয়ে যায় এই বইগুলোর যার মধ্যে Leading at the Edge: Leadership Lessons from the Extraordinary Saga of Shackleton’s Antarctic Expedition ও Shackleton: Leadership Lessons from Antarctica প্রকাশ হওয়ামাত্র বেস্টসেলারের তকমা পেয়ে যায়। এই কয়েকটা ঘটনার ফলে নতুন যুগের মেরু-অভিযাত্রীদের কাছে আর্নেস্ট স্যাকলটন একজন রোল-মডেল হয়ে ওঠেন। এদের মধ্যেই একজন ছিলেন হেনরি ওয়ার্সলে।


হ্যাঁ, ইনিই সেই হেনরি ওয়ার্সলে, যাকে নিয়ে এই কাহিনির সুত্রপাত। আমরা হেনরির জীবনে ফিরে যাব ঠিকই, কিন্তু তার আগে এক নজর বুলিয়ে নেওয়া যাক পোলার এক্সপ্লোরেশনের আধুনিক জগতের ওপর। এক শতাব্দীর মধ্যে সব কিছুই বদলে গেছে, আমূল পরিবর্তন হয়েছে এই পোলার এক্সপোলারদের দুনিয়াতেও।

এই একশো বছরের মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর প্রায় সবটাই আবিষ্কৃত হয়ে গেছে। আজকাল তো স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ছবি তুলেই ম্যাপ তৈরি করা যায় কিন্তু এই প্রযুক্তি আসার অনেক আগেই ব্যাপক স্তরে অভিযান শুরু হয়েছিল ম্যাপ মেকিং-এর জন্যে। ১৯৪৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অপারেশন হাইজাম্প লঞ্চ করে। এই বিশাল কর্মকাণ্ড প্রায় পাঁচ হাজার বৈজ্ঞানিক, অভিযাত্রী ও গবেষককে পাঠানো হয় তেরোটা জাহাজ ও সাতাশটা এয়ারক্রাফ্ট সহ। ১৯৬১ সালে অ্যান্টার্কটিক চুক্তি করা হয়, যাতে ঠিক হয় যে এই মহাদেশের ওপর কোনো দেশের অধিকার থাকবে না। বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর কল্যাণমূলক কাজের জন্যে যে কোনো রাষ্ট্র দক্ষিণ মেরুতে আসতে পারবে, ২০১৯ পর্যন্ত চুয়ান্নটা রাষ্ট্র এই চুক্তিতে সাক্ষর করেছে। পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে অ্যান্টার্কটিকায় বেশ কিছু রিসার্চ স্টেশন নির্মিত করা হয়েছে বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে। 

উত্তর মেরুর ক্ষেত্রেও ছবিটা প্রায় একই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউক্লিয়ার সাবমেরিন ইউএসএস স্কেট ১৯৫৯ সালে প্রথম উত্তর মেরুর ভাসমান বরফের স্তর ভেদ করে সমুদ্রপৃষ্ঠে উঠতে সাফল্য পেয়েছিল, তার পর থেকে সেখানে নানান সামরিক ও বৈজ্ঞানিক অভিযান হয়েছে। ১৯৬৯ সালে ওয়ালি হারবার্ট তার দল নিয়ে প্রথম আড়াআড়ি ভাবে উত্তর মেরু অতিক্রম করেন, ব্রিটিশ ট্রান্স আর্কটিক এক্সপিডিশনের এই সাফল্যের পর এ ধরনের আরো কিছু অভিযান হতে থাকে। এদের মধ্যে উইল স্টেজারের নাম উল্লেখযোগ্য, রবার্ট পিয়েরির পর প্রথম তিনিই ১৯৮৬ সালে কুকুরে টানা স্লেজ নিয়ে নর্থ পোলে পৌঁছতে সক্ষম হন। অন্য দিকে ১৯৯৭ সালে বোর্জ অসল্যান্ড প্রথম কোনোরকম সাহায্য ছাড়া অ্যান্টার্কটিক মহাদেশ অতিক্রম করে রেকর্ড সৃষ্টি করেন।

Recent Comments:

Leave a Comment: