• ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, শুক্রবার
  • 27 November 2020, Friday
Bangalalonar Bangalore Brittanto 2 ছবি: লেখক

বঙ্গললনার ব্যাঙ্গালোর বৃত্তান্ত

দেবাঞ্জলি রায়

Updated On: 21 Nov 2020 11:59 pm


যাত্রাপর্ব ১

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

“হ্যাঁ হ্যাঁ, বেরিয়েছি।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, আমিও বেরিয়েছি, এই তো এসে গেছি কাছাকাছি।”

“আমি তো পৌঁছোলুম।”

“অ্যাই তো লাগেজ নামাচ্ছি।”

“এই তো আমি জন আহারের সামনে।”

“স্যার কই?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, স্যার কই, স্যার কই?”

“ও স্যার, স্যার, আপনি কই?”

“আমি যে জলসাঘরে” (গুরুমশাই গোস্বামী সেন্ট লাইভ লোকেশন)

সেইলোকেশন খুলে দেখা গেল সেটা হাওড়া স্টেশনের নিউ কমপ্লেক্সেরই কোথাও একটা। ওদিকে ফুলটুসু সবার আগে পৌঁছে একুশ নম্বর প্ল্যাটফর্মে গিয়ে বসে আছে, মানে যেখান থেকে ট্রেন ছাড়ার কথা। কিন্তু দলের বেশিরভাগ লোক, মানে বিন্তি, ভূতুম, গুবলি, চরকি আর লাটাই জন আহারের সামনেই দাঁড়িয়েছিল। ট্রেন ছাড়বে দুপুর বারোটা চল্লিশে; কিন্তু উত্তেজনায় ফুটতে ফুটতে সব্বাই এগারোটার মধ্যেই স্টেশনে হাজির। গুরুমশাই গোস্বামী প্রথমেই রীতিমত ডিসক্লেমার দিয়ে রেখেছিলেন, ‘মালের দায়িত্ব আরোহীর’কিন্তু প্রত্যেকের মাথাপিছু চারটের কম ব্যাগ সম্ভবপর হয়নি। একটা বড় লাগেজে দশ দিনের জামাকাপড় ও দু’ সেট অপ্রয়োজনীয় জ্যাকেট-টুপি-মোজা (কেন অপ্রয়োজনীয় সে কথায় পরে আসব), পিঠের ব্যাকপ্যাকে ওষুধ আর ফার্স্ট এডের বাক্স, বালিশের টাওয়েল (ডাস্ট অ্যালার্জিক লোকের ব্যথা আপনারা বুঝবেন্না), স্টোল, গায়ে দেওয়ার হালকা সিঙ্গল চাদর, এক্সট্রা এক সেট জামাকাপড় (পরের দিন ট্রেন থেকে নেমে চেঞ্জ করার জন্য), গল্পের বই, নোট লেখার ডায়রি, পোস্টার টাঙানোর জন্য সেলোটেপ, ডবল টেপ, কাঁচি, বোর্ডপিন, ক্যামেরা, টয়লেটের ব্যাগ, সাজের জিনিস, রোজ মাখার ক্রিম, রোজ খাওয়ার ওষুধ; সাইডব্যাগে দরকারি কাগজপত্র, টাকাপয়সার ব্যাগ, সানগ্লাস, ইয়ারফোন, লাগেজের চাবি এবং শেষমেশ, মুদিখানাসম একটি লেজেন্ড খাবারের ঝোলা, যার মধ্যে নানাপ্রকার কেক, বিস্কুট, সন্দেশ, মুড়ির কৌটো, কমলালেবু, আপেল, ডিনারবক্স ইত্যাদি ইত্যাদি। গুরুমশাই গোস্বামী স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে মেয়েদের সঙ্গে ট্র্যাভেল করার মতো সুবিধে আর হয় না। এত খাবার বওয়ার জাস্ট একটাই কারণ, ট্রেনের খাবার-ট্রেনের টয়লেট-খাইখাই স্বভাব-নিজেদের পৌষ্টিকতন্ত্রের কম্বিনেশনকে ট্রাস্ট করা খুবই মুশকিল।


মা’রা সবাই প্রচুর সদুপদেশ দিচ্ছিলেন, খাবার-দাবার সাবধানে খাবি, রোজ অ্যান্টাসিড খাবি, রেগুলার খাওয়ার ওষুধ যেন মিস না হয়, পণ্ডিতি করবি না, স্যারকে জ্বালাবি না, সবাই একসঙ্গে চিপকে থাকবি (এঁরা মেম্বারশিপ ফর্ম জমা দিতে যাওয়ার ডিটেল্ড গপ্পগাছা তখনও জানতেন না), ভালো করে সাজুগুজু করবি, ছবি পাঠাবি, ফোন করবি ইত্যাদি। বাবারা অবশ্য এই সব ব্যাপারে পাত্তা দিচ্ছিলেন না, এমনকী খেয়াল করলে দেখা যেত যে তাঁরা মুখের ওপর আশি ভাগ হাসি ও কুড়ি ভাগ টেনশন চাপা দেওয়া এক উৎকট গাম্ভীর্য টাঙিয়ে রেখেছিলেন।

যাই হোক, এই সব করতে করতেই ইলেকট্রনিক বোর্ডে ট্রেনের অ্যানাউন্সমেন্ট হল; আর সঙ্গে সঙ্গেই গুরুমশাই গোস্বামী আর সরুমশাই চৌধুরীকে আসতে দেখা গেলদেখেই সবাই ‘এই তো, এই তো’ বলে তাঁদের সঙ্গ নিল। প্ল্যাটফর্মের মুখেই দেখা হল ফুলটুসু অ্যান্ড ফ্যামিলির সঙ্গে, তাকেও সবাই মিলে সমস্বরে ‘এই তো, এই তো’ বলে ডেকে নিল। ট্রেনে উঠে আগেই গুরুমশাই গোস্বামী নিজের লাগেজটা দেওয়ালে লাগানো টেবিলের তলায় ঢুকিয়ে চুপচাপ জানলার ধারে বসে পড়লেন; কারণ তাঁর চারটি বাতিকগ্রস্ত ছাত্রীর তিনটিকে তিনি হাড়ে হাড়ে চেনেন। বলাই বাহুল্য, চারটি মেয়ে মিলে এমন কিচিরমিচির লাগিয়ে দিল যে কান পাতা দায়। ওদিকে চরকি আর সরুমশাইয়ের কোচ আলাদা; লাটাই নিজের ব্যাগখানা বিন্তিদের জিম্মায় দিয়ে চলল চরকির বসার জায়গা সরেজমিনে তদারক করে আসতে।


সবার লাগেজ চেন দিয়ে বাঁধা হচ্ছে, ওদিকে বিন্তির ব্ল্যাকহোলসদৃশ ব্যাকপ্যাক গহ্বরে লাগেজ বাঁধার চেনখানি বেমালুম অন্তর্হিত হয়েছে; খুব করে হাতড়ে তাকে অনুভব করা যাচ্ছে কিন্তু ছোঁয়া যাচ্ছে না। বিন্তির বেরসিক বাবাবাবু অগত্যা ফুরুৎ করে গিয়ে এক পিস এক্সট্রা চেন কিনে আনলেন, তবে বিন্তির এক কাকুবাবু, মানে ভূতুমের বাবা ততক্ষণে বিন্তি-ভূতুমের লাগেজকে একটা চেন দিয়ে একসঙ্গে বেঁধে দিয়েছেন। সে যাক, একস্ট্রা চেনটা সঙ্গে রইল, এটা পরে খুব কাজে আসবে; কিন্তু সে কথা, যাকে বলে যথাস্থানে বলব। তারপর লাটাই চরকিকে তার সিটে গ্যারেজ করে ফিরে এসেই সোওওজা আপার বার্থে চড়ে পড়ল। লাগেজ গুটিয়ে সবাই একটু থিতু হল, তারপর বাবা-মা’রা নেমে যাওয়ার মিনিট কয়েকের মধ্যেই ট্রেন আড়মোড়া ভেঙে হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলতে শুরু করল। ওদিকে সুয্যিমামাও তখন সে বছরে শেষ বারের মতো অস্ত যাবেন বলে পশ্চিমে গুটিগুটি পা বাড়ালেন, বিন্তিরা কলকাতাকে টাটা করে, সোনাগলানো দুপুর রোদ্দুরের ছবি দিয়ে ফেসবুকে ‘ট্র্যাভেলিং টু ব্যাঙ্গালোর’ স্ট্যাটাস টাঙিয়ে দিল।

ট্রেন সাঁতরাগাছি ছাড়াতে গুরুমশাই গোস্বামী খুব উদাস করুণ সুর করে বললেন, ‘আহা রে, ঘোঁতনটা এলে ওইটে ওর সিট হত, ঠিক বিন্তির পাশটিতে বসত...’ শুনেই বিন্তি আর ভূতুম হাউহাউ করে স্যারকে ভীষণ বকে দিল। এরপর প্যান্ট্রিকাকু লাঞ্চের অর্ডার নিতে এলে তাকেও ভূতুম ভাগিয়ে দিল, কারণ ভূতুমের মা অ্যাত্ত অ্যাত্ত খাবার প্যাক করে দিয়েছিলেন। বিন্তি আর লাটাই জানিয়ে দিল যে তারা বাড়ি থেকে একপেট ভাত খেয়ে বিরাট আর্লি লাঞ্চ করে এসেছে। লাটাই আপার বার্থে বসে থাকার দরুণ তার নাগাল পাওয়া মুশকিল ছিল, কিন্তু ফুলটুসু জোর করে বিন্তিকে একখানি রুটি খানিক আলুভাজা দিয়ে খাইয়ে দিল। ওদিকে গুরুমশাই গোস্বামীর আপত্তিতে বিন্দুমাত্র কান না দিয়ে ভূতুম তাঁকে একবাক্স ফ্রায়েডরাইস ধরিয়ে দিল। খেয়েদেয়ে টিফিনবাটি আর চামচ ধোয়াধুয়ি করে সবাই ফিরে এলে গুরুমশাই গোস্বামী দুটি ঘোষণা করলেন; এক, যশবন্তপুর আসার আগে ট্রেন থেকে নামলেই কান ধরে থাবড়া মারব এবং দুই, আমি ঘুমোচ্ছি, বেশি ক্যাঁচম্যাচ করে কোনোভাবেই আমার ঘুম ভাঙাবি নাঅগত্যা সবাই বালিশপত্তর নামিয়ে কানে ইয়ারফোন গুঁজে যে যার বার্থে লম্বা হল।

সোয়াচারটেনাগাদ ট্রেনটা বালাসোর পৌঁছোয়। বিন্তি-ফুলটুসু-গুবলি-ভূতুমের ঘুম ভেঙে গেল কিন্তু গুরুমশাই গোস্বামী আর লাটাই যেমন কে তেমন ঘুমোতেই লাগল। এদের দুজনের ঘুম পরবর্তীকালে ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে উঠবে, কিন্তু সে কথা যাক; কারণ বন্ধুগণ, ক্রাইসিস মোমেন্ট সমুপস্থিত। ট্রেন চলাকালীন টাওয়ারের সমস্যা থাকে, কিন্তু বালাসোর স্টেশনে টাওয়ার পেতেই টুংটাং ঠাঁই টঙাস ট্যাঙাস ইত্যাদি শব্দ করে সব্বাইকার ফোনে এসএমএস ইমেল ইত্যাদি এসে উপস্থিত; অস্যার্থ, ‘ইওর অ্যাকোমোডেশন হ্যাজ চেঞ্জড’এই খানে বলে রাখি, আগের অ্যাকোমোডেশনে বিন্তি-ফুলটুসু-গুবলি-ভূতুমের এক হোটেল ছিল, আর চরকি-লাটাইয়ের ছিল অন্য হোটেল। স্যারের হোটেল বরাবর আলাদাই ছিল কারণ সায়েন্স কংগ্রেসওয়ালারা স্যারদের ফ্রি’তে কিছুই দেয় না। নতুন যে অ্যাকোমোডেশনটা এসেছে, সেটা অনুযায়ী বিন্তি-ফুলটুসু-গুবলি-চরকি-লাটাই সবাই এক হোটেলে, কিন্তু ভূতুম একা আলাদা হয়ে গেছে। যদিও ক্যাঁচম্যাচ করে স্যারের ঘুম ভাঙানোয় কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল, কিন্তু এটা সাড়ে সর্বনাশ পরিস্থিতি। আসার আগেই ঠিক করে নেওয়া হয়েছে যে কাউকে একা ছাড়া হবে না, কেউ অন্তত একজনকে সঙ্গে না নিয়ে কোত্থাও যাবে না, আজ্ঞে না টয়লেটেও যাবে না (আরে বাবা দরজার বাইরে দাঁড়াবে, উফ)কাজেই ‘ও স্যার উঠুন উঠুন বাঁচান বাঁচান’ ইত্যাদি করে মেয়েরা সবাই গুরুমশাই গোস্বামীর ফ্রায়েড-রাইসঘুম চটকে দিল। স্যার উঠে সব শুনে-টুনে আবার মুখে চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লেন; অবশ্য তার আগে তিনটে ঘোষণা করলেন।

এক, সায়েন্স কংগ্রেসের অ্যাকোমোডেশন অফিসে হোটেল চেঞ্জ করার দাবি জানিয়ে ভূতুম ইমেল করবে।

দুই, সায়েন্স কংগ্রেসের রণে-বনে-জলে-জঙ্গলে স্যার সবাইকে ঠিক রক্ষা করবেন, কোনো চিন্তা নেই।

তিন, এই খবরটা কেউ এক্ষুনি বাড়িতে হাউমাউ করে পাচার করবে না, এই লাস্ট মোমেন্ট ডিজাস্টার সামলানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির লোকের টেনশনও সামলাতে হলে ক্যাডাভারাস কীর্তি হবে (এই উপদেশটা পরে পদে পদে কাজে লাগবে)।

অতঃপর সবাই মিলে বসে খুব করে মেল ড্রাফট করা হল, ওয়েবসাইট ও পুরোনো ফলোআপ ইমেল ঘেঁটে কয়েকটা ফোননম্বর জোগাড় হল যেখানে অ্যাকোমোডেশন সংক্রান্ত সমস্যায় যোগাযোগ করা যাবে। এদিকে নেটওয়ার্ক আবার যায় যায়, ফলে ফোন করা গেল না। ইতিমধ্যে এত চাপ নিয়ে সবাইকার খুবই চা তেষ্টা পেয়ে গেছে। এই বার বিন্তির খাবারের ঝোলা থেকে কেক বেরুল, গুবলি বের করল বিস্কুট; সবাই মিলে আবার গুরুমশাই গোস্বামীকে কেক ধরিয়ে দিল, আর গুরুমশাই গোস্বামী জানালেন যে বাতিকগ্রস্ত বঙ্গললনারাই সবচেয়ে ভালো ট্র্যাভেল পার্টনার হয়।

বাইরে ওদিকে তখন সন্ধে নেমেছে। দূরে দূরে দেখা যাচ্ছে স্ট্রিটল্যাম্পের আলোর বোকে, কখনো রাস্তা, কখনো বা শুধুই অন্ধকার মাঠ। মাঝে মাঝে এক-একটা ব্রিজ পেরোয়, নীচে নদীর জলে ভাসমান দু-একটা নৌকোর আবছা আলোর বিন্দু দেখা যায়। সবাই খুবই দেখনদারি করে যদিও গল্পের বই-টই খুলে বসেছিল, কিন্তু সব্বাই একসঙ্গে থাকলে যা হয়, গল্পগুজব আর সেলফি তোলাই চলছিল বেশিওদিকে ভূতুম টেনশনে মুখ শুকিয়ে বসেছিল, তাই তার কনসেন্ট্রেশন ঘোরাতে গুরুমশাই গোস্বামী একখানা দারুণ ভয়ের ভূতের গল্প শুনিয়ে দিলেন। ওদিকে লাটাই আপার বার্থ থেকে নেমে জুতো-মোজা পরছিল বলে অন্যরা তাকে ‘মোজা কেন পরছিস’, ‘জুতো কেন পরছিস’, ‘জুতোর ফিতে কেন বাঁধছিস’ বলে খুবই ব্যতিব্যস্ত করে তুলল এবং গুবলি তার রুবিকস কিউব কেড়ে নিল, তার বদলে বিন্তি সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তাকেও এক পিস কেক ধরিয়ে দিল। এরপর গুরুমশাই গোস্বামী চিকেন পকোড়া অর্ডার করলেন, বললেন, ‘তোদের দেব না’; কিন্তু মেয়েরা যেহেতু নিজেদের হজমশক্তির ব্যাপারে খুবই সন্দিহান, সুতরাং তারা বলল, ‘খেতে পারি কিন্তু কেন খাব’ এবং গুরুমশাই গোস্বামী লাটাইকে পকোড়ার ভাগ দিলেন আর বিন্তি-ভূতুম-ফুলটুসু চুপিচুপি সিদ্ধান্ত নিল যে ফেরার সময় সব পুষিয়ে নেওয়া হবে, হুঁ হুঁ!

রাত্রের ডিনারের অর্ডার নিতে এলে লাটাই কিছুতেই বিন্তিদের সঙ্গে খেতে রাজি হল না, আর বিন্তিরা এবারেও গুরুমশাই গোস্বামীকে খাওয়ার অর্ডার দিতে দিল না। লাটাই জানাল যে সে সাড়ে চোদ্দ বছর হোস্টেলে কাটিয়েছে, ট্রেনের খাবার তাকে কাবু করতে পারে না। এখানেই বলে রাখা ভালো, কিছু হলেই লাটাই এই সাড়ে চোদ্দ বছরের হোস্টেল লাইফের প্রসঙ্গ টেনে আনে; ওটা হোস্টেল লাইফ না রামের বনবাস বোঝা যায় না। রাত্রে সবাই তাদের ঝোলা থেকে প্রচুর খবরের কাগজ বের করে সিটের ওপর বিছিয়ে খেতে বসল; ভূতুমের ফ্রায়েড রাইস আলুর দম, বিন্তির রুটি-চিকেনকষা-আলুর তরকারি, ফুলটুসুর রুটি-আলুভাজা, গুবলির রুটি আর পাঁচমিশেলি তরকারি সব মিলিয়ে বিরাট পিকনিক হল। খাওয়া শেষে আবার টিফিন বাক্স আর চামচ ধোয়ার পালা; একজন সাবান ধরবে, একজন এঁটো বাসন ধরবে, একজন বাসন ধোবে অন্যজন ধোয়া বাসন ধরবে---- পুরো ‘সবে মিলে বাসন মাজ’ খেলা। সিটে ফিরে বিছানা পেতে কোচ অ্যাটেনডেন্ট কাকুকে ধরা হল, কারণ ভূতুমের আরেকটা বালিশ চাই আর এদের সিট সংলগ্ন সাইড লোয়ারটা ফাঁকাই যাচ্ছে, অতএব ওটা ফাঁকা থাকলে চরকি বেচারাকে ওই খানে ডেকে নেওয়া হবে। কোচ অ্যাটেনডেন্ট বালিশ তো দিলেনই না; আর বললেন ওই সাইডলোয়ারটা নাকি প্যান্ট্রিকাকুর সিট, বিশাখাপত্তনমে ইনস্পেক্টর আসার আগে কেউ ওতে ঘুমুতে পারবে না, তবে এমনি বসতে চাইলে আপত্তি নেই। বিফল মনোরথ হয়ে বিন্তি-গুবলি-ভূতুম খানিক নাইটক্রিম ঘষে মৌরি মুখে দিয়ে ওই সাইড লোয়ারটাতেই আড্ডা মারতে বসল, ফুলটুসু দরজার দিকের মিডল বার্থটায় শুয়ে তাদের সঙ্গে গল্প করার চেষ্টা করেছিল বটে তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। বাকি তিন জন বসে বাড়ির লোক-পাড়ার লোক-কলেজের বন্ধু-বাসতুতো ক্রাশ-পোষা বেড়াল-রাস্তার গোরু ইত্যাদি প্রভৃতি প্রত্যেকের নামে প্রচুর পিএনপিসি করল। ভূতুম অবশ্য প্রথমটা ‘পিএনপিসিতে খুচরো পাপ বাড়ে, ওগো আমার হোটেলের কী হবে গো’ এসব বলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু গুবলি আর বিন্তি তাকে যথোচিত ধমক ও সাহস দিয়ে স্পয়েল করে দিল। খুব উৎসাহের সঙ্গে গপ্পগাছা চালিয়েও যখন দেখা গেল ঘড়ির বিশ্বাসঘাতকতায় সবেমাত্র এগারোটা বেজেছে আর ট্রেন চিল্কার ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা হলেও এই অন্ধকারে কিচ্ছুটি দেখতে পাওয়ার চান্স নেই, তখন তারা গুটিগুটি আবার যে যার বার্থে চড়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পরেই কে যেন ‘হ্যাপি নিউ ইয়াআআআআররর’ বলে কামরার দরজাটা খটাস করে খুলে দিল, আর তাতে ঠকাং করে ফুলটুসুর মাথা ঠুকে গেল। খুব খানিকটা উফ-আফ করে ফুলটুসু উলটো দিকে মাথা করে শুল। তারপর কে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে কে জানে।

Share via Whatsapp

Recent Comments:

Leave a Comment: