• ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭, বুধবার
  • 03 March 2021, Wednesday
uranchondir-france-bhromon-epi-1 ছবি: লেখিকা

রুকস্যাক

নিবেদিতা হালদার গাঙ্গুলী

Updated On: 20 Feb 2021 08:31 am

উড়নচণ্ডীর ফ্রান্স ভ্রমণ


পর্ব: ১


ফ্রান্স! নামটা শুনলেই কেমন একটা বুকে কাঁপন ধরায়। বাস্তিল, ভার্সেই, লুভ---- এই জায়গাগুলোতে আমি ঘুরছি সেই কোন ছোটবেলা থেকে---- মনে মনে---- এদমন্দ দান্তে, ফারিয়া, দ্যাঁতেগাঁ, অ্যাথস, পর্থস, অ্যারামিস, কার্ডিনাল রিশলু, কার্ডিনাল ম্যাজারিনদের সঙ্গে! সেই ফ্রান্স! আলেক্সান্দ্রে দুমা, জুল ভার্নের ফ্রান্স! ভাবলেই শিরায় শিরায় রোমাঞ্চ অনুভূত হয়। 

এ দেশ ছবির দেশ’, ‘কবিতার দেশপ্রথম কৈশোরের  অ্যাডভেঞ্চারের নেশাকে ছাপিয়ে তখন প্রথম যৌবনের প্রেমের নেশা গ্রাস করেছে হৃদয়কে। সেই সময় প্রতি রবিবার সকালের আশায় সপ্তাহের বাকি দিনগুলো গোনা শুরু হল। কখন রবিবাসরীয় হাতে পাব, কখন আবার ঘুরতে পারব ফ্রান্সের আনাচেকানাচে সুনীল আর মার্গারিতের সঙ্গে। ঘুরতে ঘুরতে শুনতে পাব মার্গারিতের গলায় বোদলেয়ার, হুগো, ভ্যালেরি, রেনের কবিতা। যাদবপুরে ভর্তি হয়ে জাঁ পল সার্ত্র, জোলা, বালজাক, মপাসাঁর লেখা গোগ্রাসে গিলতে শুরু করলাম। এর মধ্যে হাতে এল নারায়ণ সান্যালের প্রবঞ্চক আর লিওনার্দোর ডায়েরি। সেই পরিচয় মোনালিসার সঙ্গে, তাকে দেখতে পাব এবার স্বচক্ষে... ভেবেই রাতের ঘুম উড়ে গেল।


হ্যাঁ, ২০১৭ সালের গরমের ছুটিতে যাওয়ার জন্য ডাক এসেছিল ইউনিভার্সিটি অফ লিল থেকে, উত্তর ফ্রান্সে  নর্মান্ডি প্রদেশে বেলজিয়াম সীমার কাছে এই লিল শহর, প্যারিস থেকে বেশি দূরে না। মন আনন্দে নেচে উঠল, কারণ, দেখা হবে আমার পিসতুতো দিদির সঙ্গে প্যারিসে। কতদিন বাদে ওকে দেখব! ওদিকে পশ্চিম ফ্রান্সে ব্রিটানি প্রদেশে ইংলিশ চ্যানেলের কাছে রেনে শহরে আছে আমার আইআইএমের ব্যাচমেট আশিস। প্যারিস যাব শুনে সে আবদার করে বসল, ইতনি দূর আ রহি হো, তো ভাইকে পাস নেহি আওগি দি?” ব্যস, আমি লম্বা ভ্রমণের পরিকল্পনা করে বসলাম।

যাঁরা জানেন না তাঁদের জন্য জানাই যে, দ্য অ্যাসোসিয়েশন অফ ইওরোপিয়ান অপারেশনাল রিসার্চ সোসাইটি সম্বৎসরের সমস্ত কনফারেন্সের সময়সূচী তাঁদের ওয়েবসাইটে গত বছরেই দিয়ে দেয়। আমি সেই সময়সূচী দেখে দুটি কনফারেন্সে যোগদানের জন্য রিসার্চ পেপার জমা দিই ফেব্রুয়ারি মাসে। প্রথমটি অনুষ্ঠিত হবে ফ্রান্সের লিলে আর পরেরটি হল্যান্ডের আমস্টার্ডামে। দুটি কনফারেন্সের মধ্যে দশ দিনের ব্যবধান। পরিকল্পনা করি ওই দশ দিনের প্রথম পাঁচ দিন রেন শহরে আশিসের কাছে আর শেষ পাঁচ দিন প্যারিসে দিদির কাছে থাকবতা পরিকল্পনা করলেই তো হয় না, আমার পাঠানো পেপার যদি আয়োজকদের ভালো লাগে তবেই তাঁরা আমায় আমন্ত্রণ জানাবেন। অতএব দুরুদুরু বক্ষে শুরু হল অপেক্ষা। মার্চে লিল থেকে আর এপ্রিলে আমস্টার্ডাম থেকে ডাক এল। শুরু হল গোছগাছ---- প্রথম কাজ আমার গ্রান্ট মঞ্জুর করানো। আমার বিশ্ববিদ্যালয় সেটা মঞ্জুর করার পর যে যে কাজগুলি করতে হল সেগুলো হল যথাক্রমে কনফারেন্সের জন্য রেজিস্ট্রেশন, যাতায়াতের ফ্লাইট বুকিং, লিল ও আমস্টার্ডামে হোটেল বুকিং এবং ফ্রান্সের ভিসার জন্য আবেদন। এর মধ্যে জোগাড় করে নিলাম আশিস ও জামাইবাবুর কাছ থেকে নেমন্তন্নের চিঠি এবং আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে অনুমতিপত্র। মানে পুরো মেয়ের বিয়ে দেওয়ার মতো ব্যবস্থাপনা আর কি! এর মধ্যে আবার সেমিস্টার ব্রেকের পরীক্ষায় গার্ড দেওয়া আর তার পর খাতা দেখা আছে। ফ্লাইট ধরার দিন ১০ জুন রাতে, আমার পতিদেব দয়া করে দিল্লি এসে আমার পুত্রকে নিয়ে কলকাতা চলে গেলেন ৫ জুন, আমি প্রায় ক’দিন না ঘুমিয়ে খাতা দেখা শেষ করলাম ৯ জুন সকালে। ওই ক’টা দিন আমি লাগাতার গান শুনেছি আর এক একটা গান এক একজনকে ফেসবুকে উৎসর্গ করেছি। তা সকলের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় খাতা দেখা ফুরোল ভাগ্যিস! নইলে আমায় আর ফ্লাইট ধরতে হত না!


৯ জুন ফিনান্স অফিস থেকে ইওরো জোগাড় করে দুপুরে গেলাম নতুন চশমা আনতে। চল্লিশ পেরোতেই চালশে ধরেছে, প্রোগ্রেসিভ লেন্স বানাতে হয়েছে। চশমার দোকানের উলটো দিকে একটা জুতোর দোকান। মনে পড়ল জুতো ছিঁড়ে গেছে। বিদেশে ছেঁড়া জুতো পরব? কভি নেহি। কিনলাম এক জোড়া নতুন কেতাদুরস্ত হাইহিল জুতো। সন্ধেবেলা ফ্ল্যাটে ফিরে বিছানা থেকে আর উঠতে পারলাম না! একটা কাজ করেছি খালি, পরের দিনের ফ্লাইটের চেকিংটা অনলাইন করে নিয়েছি। পরের দিন ১০ জুন সকালে স্যুটকেস খুলে পড়লাম মহা ফাঁপরে! একে প্যাকিং, তায় আমি একা! চার ঘণ্টার পরিশ্রমে প্যাকিং শেষ করা হল। গাড়ি ডেকে মনে পড়ল যাহ! আশিসের জন্য জলজিরা আর হলদিরামের ভুজিয়া নেওয়া হয়নি! সে বেচারা বিদেশে এসব পায় না, আমাকে কবে থেকে বলে রেখেছে, ছুটলাম সোসাইটির দোকানে। দোকানে হরেক রকমের ভুজিয়ার প্যাকেট। কোনটে নেব ঠিক করতে না পেরে সবরকমের একটা করে নিলাম। তারপর দিদির জন্য কী নেব চিন্তা করতে গিয়ে মনে হল ও রান্না করতে ভালোবাসে যখন ওর জন্য মশলা নিয়ে যাই। বিদেশে ভারতীয় মশলার খুব দাম। এম ডি এইচ কোম্পানির নানারকম মশলার বাক্স নিয়ে নিলাম। এবার ওই ভুজিয়ার প্যাকেটগুলো আর মশলার বাক্সগুলো নেওয়ার জন্য আলাদা একটা ব্যাকপ্যাক নিতে হল। তাহলে স্যুটকেস, ল্যাপটপ ব্যাগ আর ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে মোট লাগেজের সংখ্যা হল চার। তাদের গাড়িতে তুলে নিজে উঠে দিল্লি এয়ারপোর্ট পৌঁছে গেলাম সন্ধে ছ’টায়।

 

(ক্রমশ)

Recent Comments:

Shreemoyee Chattopadhyaya 2021-02-20

চমৎকার। পরের সফরের জন‍্য অপেক্ষায় রইলাম।

Leave a Comment: