• ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭, বুধবার
  • 03 March 2021, Wednesday
ananter-ahwan-epi-28 ছবি: ইন্টারনেট

অনন্তের আহ্বান

গৌরব বিশ্বাস

Updated On: 21 Feb 2021 10:26 am

অষ্টবিংশ পর্ব

দ্বিতীয় ঘটনাটা, সজনীকান্ত বাবুর ইন্টারমিডিয়েট পড়বার সময়কার। সজনীকান্ত তখন বাঁকুড়া কলেজের থেকে ইন্টারমিডিয়েট পড়ছেন। হস্টেলে থাকেন। সেখানেই বন্ধুত্ব হয় কিরণচন্দ্র দত্তের সঙ্গে। দুজনের গলায় গলায় বন্ধুত্ব।

তখন ইন্টারমিডিয়েটের টেস্ট পরীক্ষা আসন্ন। সবাই দিনরাত জেগে জোরকদমে পড়ছে। কিরণ পড়াশুনোয় খুব সিরিয়াস। সারাদিন হয় লজিকের বই কিংবা মেকলের ‘হিস্ট্রি অফ ইংল্যান্ড’ জোরে জোরে চিৎকার করে পড়ছে। তার পড়ার বহর দেখে বন্ধুরা হাসি-ঠাট্টা করতে ছাড়ে না। কিন্তু কিরণের পড়ার কোনো বিরাম নেই। একদিন দুপুরের একটু আগে, মন পড়তে পড়তে কিরণ হঠাৎ গোঁ গোঁ করে অজ্ঞান হয়ে গেল। বন্ধুরা প্রথমে ভাবল, বেশি পড়াশুনোর ফল। কিন্তু সময় যত গড়ায়, অবস্থা বিশেষ ভালো বোধ হয় না। একেবারে টানা সাত দিন অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল কিরণ। একেবারেই জ্ঞান নেই। ডাক্তার-বদ্যির ত্রুটি রাখা হল না। কিন্তু কিরণের জ্ঞান ফেরবার নাম নেই। শুরু হল পালা করে শুশ্রূষা। সজনীকান্ত, কিরণের সেবার ভার প্রায় একা হাতে নিলেন। দ্বিতীয় দিন থেকে কিরণ অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করল। এই কিছুদিন ধরে কিরণ যে মেকলের ইতিহাস পড়েছিল, অজ্ঞান অবস্থাতেই পুরো বইটা অনর্গল মুখস্থ বলতে শুরু করল। কমা-দাঁড়ি কিচ্ছুটি বাদ নেই। এ কী করে সম্ভব! বাঘা বাঘা ছাত্ররাই ও বই খুব বেশি মনে রাখতে পারে না! এমন অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি তার হল ক করে! দিন কয়েক পরে আরো অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। কিরণ একদম শৈশব থেকে একদম বর্তমান জীবনের প্রত্যেকটা ঘটনার পুনরাভিনয় করতে শুরু করল। সাধারণত একদম শৈশবের ঘটনা আমাদের কারও মনে থাকে না। কিন্তু কী আশ্চর্য! কিরণ হবহু সব ঘটনার পুনরাভিনয় করছে। ছোট থেকে বর্তমান সময় অবধি যে যে ব্যক্তির সঙ্গে যা যা কথা হয়েছে সব কথার একদম পুঙ্খানুপুঙ্খ বলে যাচ্ছে সে। গোপন গুহ্য কথাও বাদ থাকছে না। এমনক, যার সঙ্গে যেমন স্বরে কথা বলেছিল, সেটুকুরও নিখুঁত পুনরাভিনয় ঘটে চলেছে। বহু ঘটনার সঙ্গে সজনীকান্ত ও নিতাইয়ের অন্যান্য বন্ধুরাও জড়িয়ে ছিলেন। তাঁরাও অবাক। এমন সব তুচ্ছ ঘটনা, যা হয়ত বন্ধুদেরও মনে ছিল না, নিতাইয়ের কণ্ঠে সে ঘটনার পুনরাভিনয় শুনে হঠাৎ সবার মনে পড়ল। কিরণ ছোটবেলা কাটিয়েছিল বর্ধমানের মেমারিতে। সেই সময়ের সমস্ত ঘটনা তার কণ্ঠে পুনরাভিনয় চলতে লাগল। নিতাই সেই সময় সেখানেও তার সহপাঠী ছিল। সে তো অবাক। কিরণ অজ্ঞান অবস্থায় মেমারির যে সব ঘটনা আওড়ে যাচ্ছে, তা সত্য তো বটেই কিন্তু এত পুঙ্খানুপুঙ্খ তো নিতাইয়েরও মনে ছিল না। কিরণ যেন নাটকের মুখস্থ করা কিছু সংলাপ ক্রমাগত উগড়ে যাচ্ছে। এসব ব্যাপার দেখে সবাই ঘাবড়ে গেল। কিরণের অভিভাবক ছিল তাঁর ভগ্নীপতি শিবুবাবু। তাকে খবর পাঠানো হল। বাঁকুড়ার কোনো ডাক্তার এ রোগ ধরতে পারল না। সে সময়, মেজর বিয়ানী নামক এক বিখ্যাত তুর্কি ডাক্তার বাঁকুড়ায় ছিলেন। তাঁকে অনেক বলে কয়ে নিয়ে আসা হল। ডাক্তার এসে অজ্ঞান কিরণচন্দ্রকে আকন্ঠ গরম জলে চুবিয়ে মাথায় বরফ ঘষতে ঘষতে তার জ্ঞান ফেরালেন। কিরণ এত সব কাণ্ডের কিছুই টের পায়নি।

তুর্কি ডাক্তার কিরণের এই অদ্ভুত আচরণের চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত এক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু সজনীকান্তর তাতে মন ভরেনি। এত সহজ স্থূল জগতের ব্যাখ্যা এ নয়। পরবর্তী কালে ক্যারেল, রাইন, ওয়াকারের মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানী, যাঁরা পরামনোবিজ্ঞানের চর্চায় ঝুঁকেছিলেন তাঁদের লেখা পড়ে, মৃত্যু পরবর্তী অস্তিত্ব সম্পর্কে সজনীকান্তের বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়েছিল। বন্ধু কিরণচন্দ্রের এমন অদ্ভুত ঘটনারও ব্যাখ্যা পেয়েছিলেন, মানুষ বিশেষ বিশেষ অবস্থা যেমন জ্বরের ঘোরে, অসুখে বা তাকে মেসমেরাইজ করলে তাঁরা এমন বিচিত্র সব ক্ষমতার পরিচয় দিতে পারে। তাঁরা সেসময় বহু পূর্বের ঘটনা এমনকি চেষ্টা করলে পূর্বজন্মের ঘটনাও স্মরণ করতে পারেন। সজনীকান্ত লিখেছেন, ‘কিরণের ঘটনায় এই অলৌকিকের প্রত্যক্ষ প্রমাণ আমি পাইয়াছি, ইহা জড় বিজ্ঞান বা ডাক্তারী শাস্ত্রের আয়ত্তে নয়

পরবর্তী কালে মৃত্যু পরবর্তী অস্তিত্বে বিশ্বাস আর দৃঢ় হয়েছে সজনীকান্তের। কী দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে লিখছেন, ‘যাঁহারা এই ভৌতিক দেহ পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছেন---- আমার মেজদাদা, মা, বাবা, বড়দাদা---- তাঁহারা প্রত্যেকেই বর্তমান আছেন, আমি যেমন গতজন্মে বর্তমান ছিলাম এবং পরজন্মে থাকিব।’

সজনীকান্তের কাব্যেও এই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন---- ‘মোদের ভাবনা-ভয় মিছা রে।/মৃত-জীবীতের মাঝে হে বন্ধু, কিসের ব্যবধান,/মৃত্যুরে কে জানিয়েছে, কে পেয়েছে জীবন-সন্ধান?’


১৯৫০ সালে চিত্র পরিচালক ‘সব্যসাচী’-এর নির্দেশনায় মুক্তি পায় বাংলা চলচ্চিত্র ‘মেজদিদি’। সেই চলচ্চিত্রে একটি গান লিখলেন সজনীকান্ত। গাইলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। সজনীকান্তের লেখা সেই গানেও উজ্জ্বল ভাবে বিরাজমান তাঁর মৃত্যু পরবর্তী জীবনের বিশ্বাস---- ‘জনম-মরণ পা-ফেলা আর পা-তোলা তোর ওরে পথিক,/স্মরণ যদি রাখিস তবে পদে পদে ভুলবি না দিক

 

 

(কোনোরকম কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেওয়া এই রচনার উদ্দেশ্য নয়। আশা করা যায়, পাঠক-পাঠিকারাও সংস্কারমুক্ত মনে, শুধুমাত্র পাঠের আনন্দে এই রচনা পাঠ করবেন)

 

উৎসাহী পাঠকের জন্য রইল, ‘মেজদিদি’ চলচ্চিত্রের সেই গান- https://youtu.be/pe9FmGVMSvg

 

Recent Comments:

Sagarika Ray 2021-02-22

খুব ভাল। অদ্ভুত জগতের খোঁজ পাচ্ছি

Leave a Comment: