• ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮, শনিবার
  • 31 July 2021, Saturday
তৃণমূলের দলাদলিতে খুন হয়ে গেলেন দলেরই ২জন ছবি গণশক্তি

তৃণমূলের দলাদলিতে খুন হয়ে গেলেন দলেরই ২জন

ওয়েব ডেস্ক প্রতিনিধি

Updated On: 22 Jul 2021 02:13 pm

শহীদ স্মরণের নামে তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর তাণ্ডব এবং বোমা-গুলির লড়াইয়ে খুন হয়ে গেলেন দু’জন। হাড়োয়া থানার ট্যাংরামারি মেদিয়াপাড়ায় বুধবার দুপুরের এই ঘটনায় নিহতদের একজন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা এবং অপরজন ৩৮ বছরের যুবক। উন্মত্ত গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে আহত হয়েছেন অন্তত ১২জন। তার মধ্যে ৫ জনকে গুরুতর আহত অবস্থায় কলকাতায় আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। 



আহতরা নিজেরাই জানিয়েছেন, তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি যজ্ঞেশ্বর প্রামাণিকের গোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন করে তৃণমূলে যোগ দেওয়া অন্য গোষ্ঠীর কর্মীদের সংঘর্ষ থেকে প্রাণহানি হয়েছে। এলাকায় এলাকায় তৃণমূলের বাহিনীর হাতে যে অস্ত্র মজুত রয়েছে, এদিনের ঘটনায় তা ফের স্পষ্ট হয়েছে। 



প্রবল সংঘর্ষের পরে উত্তেজনায় ফুটতে থাকা গ্রামে পুলিশ গিয়ে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। আহতদের আনা হয় হাড়োয়া ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। তারপরে সেখান থেকে ৫ জনকে পাঠানো হয় আরজি কর হাসপাতালে। পুলিশ প্রশাসন প্রথমে ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দু’জনের মৃত্যুর ঘটনা সামনে চলে আসায় পুলিশ বাধ্য হয়ে তৃণমূলের পনেরো জনের বেশি নেতা ও কর্মীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। গ্রামে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে পরবর্তী হিংসার আশঙ্কায়।



ভোটে যত বড় জয়ই আসুক তৃণমূল যে গোষ্ঠী দ্বন্দ্বেই আছে তার প্রমাণ আবারও মিলল উত্তর ২৪ পরগনার হাড়োয়া থানার অন্তর্গত মিনাখাঁ ব্লকের বাছড়া মোহনপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ট্যাংরামারি মেদিয়াপাড়ায়। চারদিক মেছোঘেরি, মাঝখানে ট্যাংরামারি মেদিয়াপাড়া। মেছোঘেরির দখল নিয়ে তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব লেগেই ছিল। মোহনপুরের তৃণমূলের কর্মীদের ঘরে ঘরে দেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং বোমা মজুত করা আছে বলে গ্রামবাসীদের অভিযোগ। এমনই গ্রামে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ভার্চুয়াল ভাষণ শোনানোর জন্য জায়েন্ট স্ক্রিন লাগিয়ে, মাইক লাগিয়ে, প্যান্ডেল খাটিয়ে গ্রামবাসীদের জড়ো করা হয়েছিল। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ দুই গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বকে স্তিমিত করতে পারেনি। বরং মুখ্যমন্ত্রীর ‘আবার খেলা হবে’ স্লোগানে উজ্জীবিত হয়ে দুই পক্ষই প্রবল উৎসাহে নৃশংস প্রাণঘাতী খেলায় নেমে পড়ে। 



গ্রামবাসীদের থেকে জানা গেছে, দুপুর তিনটে নাগাদ ভার্চুয়াল সভা শেষ হয়ে যাওয়ার পরে জমায়েতের প্যান্ডেলেই খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখানে আড়ালে মদ্যপানের আসরও চলছিল। সভা শেষ হওয়ার পরেই দুই গোষ্ঠীর নেতা কর্মীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি থেকে বচসা শুরু হয়ে যায়। তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি যজ্ঞেশ্বর প্রামাণিকের গোষ্ঠীর বাহিনী ব্যাপক হামলা শুরু করে। আক্রান্তরা পালিয়ে যাওয়ার সময় যজ্ঞেশ্বরের ডানহাত বলে পরিচিত ভাস্কর দাস নিজে দলবল নিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি চালাতে থাকে। বোমার শব্দ আর ধোঁয়ায় চারিদিক ঢেকে যায়। 



গ্রামেরই তৃণমূল নেতা ভবসিন্ধু মণ্ডলের কাকিমা ষাটোর্ধ্ব লক্ষ্মীবালা মণ্ডল ছুটে গিয়েছিলেন হামলা ঠেকাতে, গ্রামবাসীদের বাঁচাতে। তৃণমূলীদের ছোঁড়া গুলি এসে লাগে তাঁর পেটে, তিনি লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। ওদিক ততক্ষণে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তৃণমূল কর্মী ৩৮ বছরের সন্ন্যাসী সর্দার। তিনিও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকেন দীর্ঘক্ষণ। তারমধ্যেই বোমা গুলির সংঘর্ষ চলতে থাকে দু’তরফে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় দুজনের। গ্রামবাসী নেপাল মণ্ডল সহ আহত হন আরও অনেকে। আতঙ্কে অনেকে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন অন্যত্র। 



খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় হাড়োয়া থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। পুলিশ সন্ন্যাসী সর্দার ও লক্ষীবালা মণ্ডলের মৃতদেহ উদ্ধার করে নিয়ে আসে। আহত তৃণমূল কর্মীদের উদ্ধার করে হাড়োয়া হাসপাতালে পাঠায় চিকিৎসার জন্য।



নিজেদেরই দলের কর্মসূচি, দলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ শুনতে জড়ো করা হয়েছিল নিজেদেরই দলের সমর্থকদের, সেখানেও এমন সংঘর্ষ ঘটল কেন? গ্রামবাসীরাই জানাচ্ছেন, ঘটনা আকস্মিক নয়। এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। একদিকে মিনাখাঁর তৃণমূল বিধায়ক উষারানি মণ্ডলের স্বামী এবং দলের ব্লক সভাপতি মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডলের অনুগামী মোহনপুর অঞ্চল সভাপতি যজ্ঞেশ্বর প্রামাণিকের গোষ্ঠী। অন্যদিকে হাড়োয়া বিধানসভার বিধায়ক হাজী নুরুল ইসলামের অনুগামী তপন রায়ের গোষ্ঠী। গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন বাছড়া মোহনপুরের তৃণমূল কর্মীরা। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী উষারানি জয়ী হওয়ার পর মিনাখাঁ ব্লকের অধিকাংশ গ্রামে শুরু হয় তৃণমূলের ব্যাপক সন্ত্রাস। অনেকে ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। 



নির্বাচনোত্তর হিংসা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা হয়। হাইকোর্ট জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দায়িত্ব দেয় তদন্তের। তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়ার পরে বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মীদের ঘরে ফেরানোর তোড়জোড় শুরু হয়। তবে সেটাও নিঃশর্তে নয়। মিনাখাঁয় সংযুক্ত মোর্চার বহু কর্মী এখনও ঘরছাড়া থাকলেও মোহনপুরের বিজেপি কর্মীরা ফিরে আসেন তৃণমূলে। গ্রামেও ফিরতে পারেন তাঁরা। ঘরে এবং দলে ফেরা এই কর্মীদের যজ্ঞেশ্বরের গোষ্ঠী মেনে নিতে পারেনি কারণ তাঁরা তপন রায় গোষ্ঠীতে যুক্ত। নিহত সন্ন্যাসী সর্দারও তৃণমূলে সদ্য ফিরেছিলেন। ছাইচাপা আগুন এদিন বেরিয়ে আসে তৃণমূলের সভা শেষ হতেই। 

ঘটনার পরে তৃণমূল নেতা তপন রায় বলেন, ‘‘যজ্ঞেশ্বর প্রামাণিক বেশ কিছু সমাজবিরোধী নিয়ে এলাকায় তোলাবাজি শুরু করেছিল। আমরা তার প্রতিবাদ করতে গেলেই আমাদের মারধর করত। খুন করার হুমকি দিত। আজকের ঘটনা যজ্ঞেশ্বর প্রামাণিকের নেতৃত্বেই হয়েছে।’’ অন্যদিকে এই অভিযোগ অস্বীকার করে যজ্ঞেশ্বর যাবতীয় দায় চাপিয়েছেন তপন রায়ের গোষ্ঠীর ওপর। তিনি বলেছেন, ‘‘উনি বিজেপি থেকে আসা তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে এলাকায় সন্ত্রাস চালাচ্ছেন। এই নিয়ে আমি ওপর মহলকে বহুবার জানিয়েছিলাম।’


মমতা ব্যানার্জি আছেন ‘আবার খেলা হবে’ স্লোগানে, কিন্তু তৃণমূল আছে তৃণমূলেই, প্রাণঘাতী ‘খেলা’ নিয়ে। যার জেরে প্রাণ চলে গেল দুই গ্রামবাসীর। ঘটনার পর গোটা এলাকা থমথমে, আতঙ্কে সিঁটিয়ে আছে ট্যাংরামারি মেদিয়াপাড়া সহ গোটা বাছড়া মোহনপুর।











অনুদিত গণশক্তি 

Recent Comments:

Leave a Comment: