• ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮, শনিবার
  • 31 July 2021, Saturday
আজও হদিস নেই গায়েব করে দেওয়া ২৬ টি ইনজেকশানের ছবি ইন্টারনেট

আজও হদিস নেই গায়েব করে দেওয়া ২৬ টি ইনজেকশানের

ওয়েব ডেস্ক প্রতিনিধি

Updated On: 13 Jun 2021 08:40 pm

উপসংহার নির্দিষ্ট করেই যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট হয়েছিল আগেই। তার ভিত্তিতেই এবার অভিযুক্ত চিকিৎসককে বদলি করা হলো, আড়াল করা হলো মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ ডাঃ নির্মল মাঝিকে। 


করোনাকালে কোভিড চিকিৎসার অন্যতম মহার্ঘ টসিলিজুমাব ইঞ্জেনশন চুরির ঘটনায় তৃণমূল বিধায়ক নির্মল মাঝি সহ উপরতলার আধিকারিকদের আড়াল করেই স্বাস্থ্য ভবনে জমা পড়েছিল তদন্ত রিপোর্ট। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, এবার তার ভিত্তিতেই ইঞ্জেকশনকাণ্ডে অভিযুক্ত মহিলা চিকিৎসক দেবাংশী সাহাকে কোচবিহারের শীতলকুচি ব্লকের প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বদলি করা হয়েছে। একইসঙ্গে মেডিক্যাল কলেজের সিস্টার ইনচার্জ ও সিসিইউ’র ইনচার্জের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় পদক্ষেপ নেওয়া হতে চলেছে বলে জানা গিয়েছে স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে। 


ভাইরাল হওয়া অডিও ক্লিপিংয়ে ডাঃ দেবাংশী সাহার সঙ্গে সিসিইউ’র সিস্টারের কথোপকথনেই সামনে এসেছিল তৃণমূল বিধায়ক ও মেডিক্যাল কলেজের রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান ডাঃ নির্মল মাঝির প্রসঙ্গ। নির্মল মাঝির কথাতেই হাসপাতাল থেকে ভুয়ো প্রেসক্রিপশনে টসিলিজুমাবের ২৬টি ভায়াল তুলে নিয়েছিলেন বলে ওই কথোককথনে দাবি করেছিলেন তৃণমূল ঘনিষ্ঠ অভিযুক্ত চিকিৎসক দেবাংশী সাহা।


কিন্তু তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দোষী সাব্যস্ত দেবাংশী সাহা তৃণমূল নেতা ডাঃ নির্মল মাঝির কথাতেই বেআইনিভাবে কোভিড চিকিৎসার এই দামি ইঞ্জেকশন তুলে নিলেও একটিবারের জন্য নির্মল মাঝিকে জিজ্ঞাসাবাদ ক‍‌রেনি তদন্ত কমিটি। গত ১ জুন তদন্ত কমিটি তৈরি হওয়ার দিনই স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ‘পক্ষ’ নিয়ে ফেলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। নবান্নে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘‘কে একটা অভিযোগ করলেন, উনি নিজে ঠিক আছেন তো? সব ব্যাপার তদন্ত ছাড়া হয়  না। মেডিক্যাল কলেজ আছে। তারা ব্যাপারটা ভালো বোঝে। কারও একটা কথা শুনে রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে না কি?’’ তদন্ত কমিটির পরিণাম কী হতে চলেছে, সেদিনই ইঙ্গিত মিলেছিল। 


রাজ্যে ভোট প্রক্রিয়া চলাকালীনই গত ২৪ এপ্রিল কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে কোভিডের লড়াইয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, জীবনদায়ী মহার্ঘ টসিলিজুমাব গায়েব হয়েছিল। দেড় মাসের মাথায় যখন সোশাল মিডিয়ায় ইঞ্জেকশন চুরির কথোপকথনের অডিও ক্লিপ ভাইরাল হলো, তারপরেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ না কি জানতে পারে, প্রায় ১১ লক্ষ টাকার এই ইঞ্জেকশন সিসিইউ থেকে গায়েব। তা গায়েব করেছেন হাসপাতালেরই এক মহিলা চিকিৎসক, যিনি শাসক দলের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রে প্রভাবশালী বলেই পরিচিত। সেই তিনি নিজেই আবার ভাইরাল হওয়া অডিও ক্লিপিংয়ে জানিয়েছিলেন, নির্মল মাঝি চেয়েছিলেন বলেই তিনি টসিলিজুমাবের ২৬টি ভায়াল তুলে নিয়েছেন!


দেড় মাস হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য ভবন চুপ থাকার পরে সামাজিক মাধ্যমে তা সামনে আসতেই স্রেফ চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে দু’-দু’টি কমিটি গঠন হয়েছিল! মেডিক্যাল কলেজের হাসপাতালের সুপার সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশে মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করে। দু’টি কমিটির রিপোর্টেই স্পষ্ট, টসিলিজুমাব ইঞ্জেকশন ব্যবহারের যে বিধি রয়েছে, তা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করেই তোলা হয়েছিল একসঙ্গে ২৬টি ভায়াল, যার বাজার মূল্য প্রায় ১১ লক্ষ টাকা। কিন্তু এই ইঞ্জেকশন গায়েবের তদন্তে ‘মাথা’কে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে সযত্নে।


অভিযুক্তকে শাস্তি হিসাবে বদলি করা হলেও সেই গায়েব হওয়া ২৬টি টসিলিজুমাব ইঞ্জেকশন কোথায়, তার হদিশ নেই এখনও। বলতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও। সেই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে নারাজ স্বাস্থ্য ভবনের কর্তারাও।




কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান ছিলেন নির্মল মাঝি। নতুন করে কমিটি গঠন বাকি রয়েছে এখনও। হাসপাতাল জুড়ে তাঁর প্রভাবের কথা জানেন সকলেই। এই ইঞ্জেকশন চাইলেই ব্যবহার করা যায় না। হাসপাতালের ভিতরে এমন দামি ইঞ্জেকশন ব্যবহার করা নিয়েও একাধিক বিধি আছে। শুধুমাত্র চিকিৎসক লিখলেই হবে না। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে উচ্চ আধিকারিকদের অনুমতি প্রয়োজন, তবে মিলবে। রোগীর নাম ও ঠিকানা এবং প্রয়োজন উল্লেখ করে তারপর উচ্চ আধিকারিকের অনুমতির ভিত্তিতে এটি দেওয়া হয়। এই গাইডলাইন যে আদৌ মানা হয়নি, রিপোর্টে তা উল্লেখ করা হয়েছে। তাহলে ইঞ্জেকশন ব্যবহারের সম্মতি কোথা থেকে এসেছিল? নির্মল মাঝির নির্দেশে কেন চিকিৎসক দেবাংশী সাহা ২৬টি ভায়াল তুলে নিয়েছিলেন?




ইঞ্জেকশনকাণ্ডে ভাইরাল হওয়া দু’টি অডিও ক্লিপে শোনা যাচ্ছে, ওই মহিলা চিকিৎসক সিস্টারকে ফোন করে বলছেন— ‘’দিদি আমি দেবাশিস স্যারকে ফোন করেছিলাম। নির্মল মাঝি বলেছিলেন, উনি আমার কাছ থেকে চেয়েছিলেন বলেই তো আমি ওখান থেকে নিয়েছি। তা দেবাশিস স্যার শুনে বললেন, মায়ের নামে তো এগুলো তোলা যায় না। যা-ই হোক, এটা নিয়ে কিছু ভাবতে হবে না। স্যারকে (নির্মল মাঝি) বল, কোনও চাপ নেই, চিন্তা নেই। আমি দেখে নিচ্ছি। তুই সোমবার আয়, আমি দেখছি। দরকার হলে তুই সোমাবর রিসিভ কপি নিবি, না হলে এটা ছিঁড়ে দিবি। আমি দেখে নিচ্ছি...।’’




কোভিড পর্বে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকেরই মিলছে না অক্সিজেন, ওষুধ। হাসপাতালে শয্যা মিলছে না। সঙ্কটের চেহারা। তার মাঝেই ভোটপর্ব চলাকালীন তৃণমূলী বিধায়ক তৃণমূল ঘনিষ্ঠ চিকিৎসককে দিয়ে হাসপাতাল থেকে বেআইনিভাবে ২৬টি ইঞ্জেকশন তুলে নিলেন। সরকারিভাবে একেকটি ভায়ালের দাম ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, খোলা বাজারে যদিও তা বিক্রি হয় দেড় লক্ষ টাকার বেশি দামে। অথচ তারপরেও তদন্ত কমিটির রিপোর্টে এলই না নির্মল মাঝির নাম। বেমালুম রেহাই পেয়ে গেলেন তৃণমূলের এই চিকিৎসক নেতা।

















অনুদিত গণশক্তি

Recent Comments:

Leave a Comment: