• ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮, শনিবার
  • 31 July 2021, Saturday
মুখে মার্কস  মগজে মমতা

মুখে মার্কস মগজে মমতা

ওয়েব ডেস্ক প্রতিনিধি

Updated On: 10 Jun 2021 12:46 am



মুখে মার্কস মগজে মমতা

       -----------------------------------


বিধানসভার নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই দেখা যাচ্ছে আনন্দবাজার  সংবাদমাধ্যম গোষ্ঠী সিপিআই(এম) কে নিয়ে প্রবল চিন্তিত হয়ে পড়েছে।


আচ্ছা সিপি আই(এম), বামফ্রন্ট তো শূন্য। প্রথমে সরকার থেকে সরানো,  তারপর বিরোধী দল থেকে সরানো, তারপর লোকসভার প্রতিনিধি শূন্য, এবার বিধানসভাতেও শূন্য। 


লক্ষ্য পূরণ তো হয়ে গেছে। তাহলে ওদের এত চিন্তা কিসের? 


আছে। চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। বিধানসভায় শূন্য মানে রাস্তাটাও যে প্রতিবাদহীন শূন্যতায় ভরপুর থাকবে তার গ্যারান্টি কোথায়?


তৃণমূলের ২১৩ টা আসন, অনেকেরই স্বপ্ন পূরণ।


কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর কি পেয়ে গেছে বাংলার মানুষ। ১০০ দিনের কাজের মজুরি চুরি -  কাজের খোঁজে ছেলেটাকে ভিন রাজ্যে পাঠিয়ে বুড়ো বাপ চুপ করে আছে গ্রামের শাসক দলের পঞ্চায়েতের পান্ডাদের ডান্ডার ভয়ে। কি গ্যারান্টি আছে - বাপ ব্যাটা কোনও দিন ক্ষেপে রাস্তায় নামবে না? 


বুড়ো-বুড়ি, তপশিলি জাতি-উপজাতি, কন্যাশ্রীর অনেককেই ভাতার টাকার অর্ধেক তুলে দিতে হয় ডান্ডাধারী শাসক দলের কেষ্ট বিষ্টুদের। গ্যারান্টি আছে ২১৩-র ভয়ে চিরকাল এরা চুপ থাকবে?


গ্রামের সরকারি স্কুলে মাস্টার নেই, কে জি স্কুলে ছেলেমেয়েদের পড়ানোর সামর্থ্য নেই। কি করবে ক্ষেতমজুর বাপ?


জলের লাইন পাচ্ছে না, কারণ শাসক দলের মাতব্বরদের খুশি  করার টাকা দিতে পারেনি। এই তৃষ্ণার্ত চিরদিন চুপ থাকবে, এটা নিশ্চিত কি?


কারখানা বন্ধ শাসক দলের তোলাবাজিতে। পেটপিঠ এক হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের ২১৩ র ধমকে চিরদিন চুপ করিয়ে রাখা যাবে?


রাজ্যের বেকার যুবকের কাজ, শ্রমিকের মজুরি, চাষীর ফসলের দাম, ক্ষেত মজুরের মজুরি বৃদ্ধি এসবই তো 'খেলা হবে' আর 'সোনার বাংলা' গড়ার গল্পগাথায়  ডুবিয়ে রাখা গেছিল। কিন্তু এইসব মৌলিক শ্রেণী ভিত্তিক দাবিগুলো তো কবরে চলে যায়নি। সেগুলো যদি ভুঁই ফুড়ে ওঠে! 


দেশে লকডাউন। মানুষ কাজ হারাচ্ছে। মরছে না খেতে পেয়ে। অথচ আদানি-আম্বানির মুনাফা বাড়ার সত্যিটা কতদিন আম জনতার কাছে গোপন রাখা যাবে? মোদি-দিদি দুজনেই এদের আশীর্বাদ ধন্য - এই সত্য আর কতদিন চেপে রাখা যাবে, সংবাদমাধ্যম দখলে রেখে? সন্দেহ ওদের থেকেই যাচ্ছে।


পেট্রোল-ডিজেলের ওপর কর বাড়তে বাড়তে এখন লাগামছাড়া। মোদিজি-র করনীতি যদি ৬০% দায়ী হয়, তাহলে দিদিমণিও ৪০% দায়ী।  একইভাবে তিনিও কর বাড়িয়েই চলেছেন। দাদা-দিদির এই যৌথ কার্যক্রম যদি সামনে এসে যায় - তাহলে কি হবে?'লেসার এভিল'-র তত্ব আউড়ে কতদিন এই সত্যকে অস্বীকার করতে পারবে?


দেশজোড়া কৃষক আন্দোলনের পাশে নাকি নেত্রী। ২০১৪/১৭  সালেই মোদির রেপ্লিকা আইন এই রাজ্যে চালু হয়ে গেছে। এটা ২১৩ দিয়ে চাপা রাখা যাবে, এর গ্যারান্টি আছে?


হাসপাতালে বেড না পেয়ে, ১৪হাজার টাকায় কালোবাজারি হওয়া অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনেও, নিজের মা'কে বাঁচাতে না পারা ছেলেটার চোখের জলে আগুন লাগার সম্ভাবনা তো রয়েই যাচ্ছে। 


তৃণমূলের জন্ম বিজেপির কোলে, বেড়ে ওঠা বিজেপির হাত ধরে,  তারাই বিশ্বাসযোগ্য মিত্র - অনেক কষ্টে কবর চাপা দেওয়া এইসব কথা, আবার যদি মাটি ফুঁড়ে উঠে আসে? তৃণমূলের ১০ বছরে বিজেপি শূন্য থেকে ৭৭, আর বামফ্রন্টের ৩৪ বছরে শূন্যই ছিল বিজেপি। কিন্তু বামফ্রন্ট নয়, জাপটে ধরো তৃণমূলকেই, বিজেপিকে আটকাতে। এই তো ছিল কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমের প্রচার! আটকানো তো গেলনা। 


এই সব প্রশ্ন যদি থেকে থাকে মানুষের মনে, আর বিধানসভায় শূন্য হলেও, রাস্তায় যদি বামদের শূন্য করা না যায় তাহলে আগামীর প্রশস্ত রাজপথে কিছু কাঁটা থেকেই যাবে। 


তাই রাস্তায় বামপন্থীদের শূন্য করার মরণপণ লড়াইয়ে নেমেছে, শাসকের চিরসখা এই সংবাদমাধ্যম গোষ্ঠী। 


কিন্তু কেমনভাবে হবে এই কাজ? 


এমন 'বামপন্থী' শক্তিদের আনতে হবে, যারা শাসকের পথে কাঁটা হবে না। স্পনসর্ড বামপন্থী তৈরি করাই এদের মূল লক্ষ্য এখন। 


তাই যাদের মুখে মার্কস মগজে মমতা, তাদের সবাইকে জড়ো করতে তৎপর এখন  কর্পোরেট দুনিয়া। 


কর্পোরেট সংবাদ মাধ্যমের হঠাৎ এতো বামপ্রেম জেগে উঠলো কেন? এই সব সংবাদপত্রে কোনোদিন প্রমোদ দাশগুপ্ত, জ্যোতি বসু, সরোজ মুখার্জি, অনিল বিশ্বাস, বিমান বসু, সূর্য মিশ্র এদের কারোর কোনও নিবন্ধ/প্রবন্ধ  ছেপেছে কস্মিনকালে, এমন অভিযোগ কেউ করতে পারবে না। 


এক দশক ধরে ইয়ংই রইল, ম্যাচিওর্ড হয়ে উঠে যারা একটা পৌরসভা বা পঞ্চায়েতের আসনে প্রার্থী দিতে পারলো না, তারা ডাক দিচ্ছে বিকল্প বামফ্রন্টের! যারা নিজেরা ১২টা আসনে লড়ে একটাতেও ১% এর বেশি ভোট পায়নি, তারা আত্মবিশ্লেষণ না করে, কেন সিপি আই(এম) ও বামফ্রন্টের শূন্য হলো,  তার পাতাজোড়া বিশ্লেষণ করছেন কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে। বাহঃ! স্পনসর্ড বামপন্থী কারে কয়!!


যে সংবাদ মাধ্যম ২০১৬ সালের পর থেকে বাম ও সিপিআই(এম) সম্পর্কে - ছুঁয়োনা ছুঁয়ো না ছিঃ, ও যে চন্ডালীনীর ঝি, এই নীতি নিয়ে চলেছে, তারা পাতা জোড়া লেখা ছাপছে বামপন্থীদের মঙ্গল চেয়ে? 


সিপি আই (এম) ও বামফ্রন্টকে অবশ্যই বর্তমান এই কানাগলি থেকে বেরোবার রাস্তা খুঁজে বের করতেই হবে। শূন্য হওয়ার দায় মানুষের নয়, নীচ থেকে ওপর পর্যন্ত সব সংগঠকদেরই, বিশেষত নেতৃত্বেরই। এই ধ্রুব সত্য মেনে নিয়েই দল - দলের সাধারণ কর্মী সমর্থক, সবার কথা ধৈর্য্য ধরে শুনতে হবে। তাতে যদি ২/৩ মাসও সময় লাগে লাগুক।যদি ২/৩ বার করে আলোচনা করতে হয়, হোক। 


এছাড়াও সাহায্য নিতে হবে বহু চিন্তাবিদদের যারা সত্যি ব্যথিত এবং মর্মাহত বামপন্থীদের এই বিপর্যয়ে। যেমন অমর্ত্য সেন চিন্তা ব্যাক্ত করেছেন বামপন্থীদের এই বিপর্যয়ে। যেমন প্রভাত পট্টনায়ক বলেছিলেন - বামপন্থীদের পরাজয়ে তাদের কি ক্ষতি হবে জানি না, কিন্তু দেশের ভবিষ্যৎ নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতেই হবে - আর এই লড়াই বামপন্থীদেরই করতে হবে ঐক্যবদ্ধ ভাবে।


সমালোচনা শুনতে হবে অগণিত বাম মনস্ক মানুষের, যারা এই অন্ধকার চিরে বেরোবার রাস্তায় বামপন্থীদের সাথেই আছেন। এমনকি অতীতে বা সাম্প্রতিক অতীতে  কোনও কারণে দুঃখে- অভিমানে - যন্ত্রণায় বামদের হাত ছেড়েছেন সঙ্গত বা অসঙ্গত কোনও কারণে,  তাঁদেরও দরকার।   


এখন সময়টা বাম আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ রাখার, ভাঙার নয়। এই সত্যটা আমাদের সবাইকেই উপলব্ধি করতে হবে। কর্পোরেটের যাঁতাকলে পিষ্ট সবহারা মানুগুলো লড়বার পতাকাগুলোকে একসাথে দেখতে চায়। 


তাই পারস্পরিক আলোচনা প্রতিটি বাম দলকেই খোলা মনে আরও অনেক অনেক বেশি করতেই হবে। দায়িত্ব সব বাম দলেরই। কে ছোট কে বড় এসব প্রশ্ন এখন অবান্তর। 


কিন্তু কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে পাতাজুড়ে এই আলোচনা হতে পারেনা। ঘন্টাখানেক বা ৯ থেকে ২৪ নানা সংখ্যার কর্পোরেট টিভির টকশোতেও এই কানাগলি থেকে বেরোবার রাস্তা বেরোবে না। 


এখন সব কটা লাল পতাকাকে একজোট হয়ে লড়তেই হবে। কিন্তু কর্পোরেট পোষিত হয়ে মুখে মার্কস মগজে মমতা, এই আত্মহননের রাস্তায়  চললে, ঝান্ডার লাল রঙ ফিকে হয়। কর্পোরেটের যোগান দেওয়া রঙে কাপড় লাল করা যায়, কিন্তু লড়াইয়ে ঝড়া রক্তে রাঙানো ঝান্ডা আজ না হোক কাল মানুষ ঠিক খুঁজে নেবে।


শমীক লাহিড়ী 

৯জুন, ২০২১






সূত্র 

সোশ্যাল মিডিয়া 

Recent Comments:

Leave a Comment: