• ১ বৈশাখ ১৪২৮, বৃহস্পতিবার
  • 15 April 2021, Thursday
সংযুক্ত মোর্চাই প্রথম শক্তি হবে রাজ্যে ★ মহঃ সেলিম মহঃ সেলিম

সংযুক্ত মোর্চাই প্রথম শক্তি হবে রাজ্যে ★ মহঃ সেলিম

ওয়েব ডেস্ক প্রতিনিধি

Updated On: 08 Apr 2021 02:38 am

প্রশ্ন: তিন দফার নির্বাচন শেষ। নির্বাচন যখন শুরু হয়েছিল আর এখনকার পরিস্থিতির মধ্যে কোন পার্থক্য আছে? 


মহম্মদ সেলিম: নিশ্চয়ই আছে। প্রথমে প্রচার ছিল দুটি শক্তি আছে ভোটের ময়দানে— তৃণমূল আর বিজেপি। এখন যতদিন যাচ্ছে সংযুক্ত মোর্চাই প্রথম শক্তি হিসাবে উঠে আসছে। নন্দীগ্রামে কী হলো? প্রথমে প্রচার হলো— সেখানে দু’জন হাইভোল্টেজ প্রার্থী। আর কেউ নেই। যত মীনাক্ষী মুখার্জির প্রচার এগতে লাগলো, যত সংযুক্ত মোর্চার কর্মীরা এগতে লাগলেন, তত সেই প্রচার হারিয়ে যেতে লাগল। মানুষ সাহস পেতে শুরু করলেন। মানুষ ছন্দে ফিরছেন। সারা রাজ্যেই তাই। প্রতিটি দফাতে সংযুক্ত মোর্চা এগচ্ছে। 


প্রশ্ন: মমতা ব্যানার্জির দাবি বাংলা তাঁকেই চায়। কী বলবেন? 


মহম্মদ সেলিম: একটি উদাহরণের দিকে তাকানো যাক। মাদার ডেয়ারি। ধুঁকছে। বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে মাদার ডেয়ারি নতুন আকারে গড়ে ওঠে। তৃণমূলের সরকার তাকে রুগ্‌ণ করে দিল। গত দশ বছরে রাজ্যে একটিও শিল্প হয়নি। এখন সিঙ্গুরে মমতা ব্যানার্জি সর্ষে ছড়িয়ে এসেছিলেন। সেখানকার মানুষ বুঝছেন তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে। তাঁরা শিল্প চাইছেন। এমন উদাহরণ আরও আছে। রাজ্যে কাজ নেই। যুবকরা ভিন রাজ্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন কাজের জন্য। গত দশ বছরে রাজ্যকে ধ্বংস করেছেন মমতা ব্যানার্জি। মানুষ নিজের ভোটটা পর্যন্ত দিতে পারেননি। পঞ্চায়েত, পৌরসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গেলে মহিলা প্রার্থীরাও তৃণমূলের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন। সেই দলের নেত্রীকে বাংলা চাইতে পারে? কখনও না। 


প্রশ্ন: সংযুক্ত মোর্চার শরিক ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট(আইএসএফ) নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন মমতা ব্যানার্জি, বিজেপি। কী মনে হচ্ছে?


মহম্মদ সেলিম: আইএসএফ’কে সমালোচনা করার আগে মমতা ব্যানার্জি আয়নায় নিজের মুখ দেখুন। রেল মন্ত্রী থাকাকালীন ফুরফুরা শরিফ নিয়ে রাজনীতি তো উনিই করেছিলেন। আইএসএফ কী? সেখানে অনেকগুলি সংগঠন আছে। আদিবাসীরা আছেন, তফসিলিরা আছেন। যারা বঞ্চিত তাদের একটি ফ্রন্ট আইএসএফ। এতে মমতা ব্যানার্জির এতো রাগ কেন? পিকে-অমিত শাহের ছক ভেঙে গেছে। তাই আইএসএফ’কে আক্রমণ।


প্রশ্ন: নির্বাচনী প্রচারে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের এমন মারাত্মক চেষ্টা আগে দেখা যায়নি। অনেকেই এ’ কথা বলছেন। কী বলবেন?


মহম্মদ সেলিম: যতদিন যাচ্ছে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ বাড়ানোর চেষ্টা করছে তৃণমূল, বিজেপি। আমরা বলছি কর্মসংস্থান, ওরা বলছে ধর্মস্থান। আমরা বলছি কামকাজ, বিজেপি বলছে রামরাজ। তৃণমূলও পিছিয়ে নেই। তারাও ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। মানুষ অভিজ্ঞতায় বুঝছেন। আমাদের কাছে মানুষ নির্বাচকমণ্ডলী। আর তৃণমূল, বিজেপি’র কাছে মানুষ হলেন ভোট ব্যাঙ্ক— আলাদা আলাদা ভোট ব্যাঙ্ক। কিন্তু তাঁরা যত ভাগের চেষ্টা করবেন, তত তাঁরা কমবেন। 


প্রশ্ন: মানুষের অভিজ্ঞতা বলতে আপনি কোনও প্রসঙ্গের কথা বলতে চাইছেন?


মহম্মদ সেলিম: অনেক দূরে যাওয়ার দরকার নেই। আমরা আমফান দেখলাম। করোনা সংক্রমণের সময় দেখলাম। দেখলাম লকডাউন। আমফানে রাজ্য বিপর্যস্ত, মানুষ দুর্দশায়। তখন বামপন্থীরা ত্রাণ নিয়ে ছুটে গেছেন গ্রামে, শহরে, পাড়ায়। আর রাজ্যের শাসক দলের নেতারা কী করেছে? তারা চাল চুরি করছে, ত্রিপল চুরি করছে। লকডাউনে কী দেখলাম? প্রধানমন্ত্রী লকডাউন ঘোষণা করে দিলেন। একবারও কেন্দ্রীয় সরকার চিন্তা করলো না এই অসহায় মানুষের কী হবে। রাজ্য সরকারও তেমনই। যে পরিবারগুলির বাড়ির সদস্যের বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় অস্থির দিন কাটাচ্ছিলেন, তাঁরা শুনলেন মুখ্যমন্ত্রী ভিন রাজ্য থেকে বাড়ির দিকে আসা প্রিয়জনের ট্রেনকে করোনা এক্সপ্রেস বলে দিলেন। লকডাউনে আটকে থাকা মানুষ বিজেপি, তৃণমূলের সাংসদদের ফোন করে সহায়তা পাননি। এলাকার তৃণমূল নেতা, বিধায়ক, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদের সদস্যদের ফোন করেছেন সাহায্যের আশায়। কিন্তু পেয়েছেন অবহেলা। সেই মানুষ পাশে পেয়েছেন বামপন্থীদের। এখন মানুষ তাই বলছেন,‘যাদের দরকারে পাই/ তাদের সরকারে চাই।’


প্রশ্ন: বিজেপি বলছে ‘আসল পরিবর্তন’ আনবে তারা। তার জন্য ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’ চাই। এই প্রসঙ্গে আপনার কী বক্তব্য?


মহম্মদ সেলিম: ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার কী তা ত্রিপুরায় দেখা গেল। উত্তরপ্রদেশে দেখলাম। আসামেও। আসামে বিজেপি’র  হাল খারাপ। ত্রিপুরায় মানুষ বিক্ষুব্ধ। উত্তরপ্রদেশে নারী নির্যাতন, দলিত-সংখ্যালঘুসহ সাধারণ মানুষের উপর হামলায় রেকর্ড করেছে বিজেপি’র সরকার। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদী কী বলেছিলেন কলকাতায় এসে? মমতা ব্যানার্জিকে দেখিয়ে বাংলার মানুষকে দুই হাতে দুই লাড্ডু দেওয়ার লোভ দেখাননি? এখন যে ডবল ইঞ্জিনের সরকারের লোভ দেখাচ্ছেন, সেটাও তেমনই। মোদীর সরকার কী করেছে? পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়িয়ে সব জিনিসেরই দাম বাড়িয়েছেন। প্রবীণদের সঞ্চয়ের উপরে সুদে কোপ মারছে, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেচে দিচ্ছে। এই তো বিজেপি’র পরিবর্তন— যাকে প্রধানমন্ত্রী ‘আসোল পরিবর্তন’ বলছেন। কোল বেস্‌ড মিথেন প্রকল্পের কথা ছিল রাজ্যে। কোথায়? গ্যাস গ্রিড হওয়ার কথা ছিল। তাতে জ্বালানির খরচ কমত। করেনি। আমরা দেখলাম গ্যাসের দাম ১০০০ টাকায় পৌঁছে দিল মোদী-সরকার। গভীর সমুদ্র বন্দরের উদ্যোগ বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে নেওয়া। বিজেপি’র মুখে সেই কথা নেই। মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে নতুন নতুন নামের গভীর সমুদ্র বন্দরের কথা বলেছিলেন। একটাও হয়নি। জ্বালানির দামবৃদ্ধিতে গরিব মৎস্যজীবীরা ভয়ঙ্করভাবে আক্রান্ত। রাজ্য সরকারের থেকে যে সহায়তা মৎস্যজীবীদের পাওয়ার কথা, সেখানেও তাঁরা বঞ্চিত। তাঁদের প্রকল্পেও দুর্নীতি হয়েছে রাজ্যে। যে লোকগুলো বাংলাকে দশ বছরে ধসিয়ে দিয়েছে, তাদের দলে নিয়ে নরেন্দ্র মোদী আনবেন ‘আসল পরিবর্তন?’ এটা বিশ্বাসযোগ্য? ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’ একটি ভাঁওতা। 


প্রশ্ন: সংযুক্ত মোর্চা বলছে তৃণমূল, বিজেপি মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ — বিজেমূল। অন্যদিকে তৃণমূল আর বিজেপি একে অপরকে প্রচারে আক্রমণ করছে। বিষয়টি কী?


মহম্মদ সেলিম: অভিনয় করছেন দুই দলের নেতারা। তবে সেই অভিনয় ধরা পড়ে গেছে। তৃণমূলের প্রাক্তনীদের প্রার্থী করে ভোটে লড়ছে বিজেপি। মমতা ব্যানার্জি নিজেই প্রকাশ্যে বলেছেন যে, ভোটে জিতে তাঁর দলের কিছু বিধায়ক বিজেপি’তে চলে যাবেন। এখন প্রধানমন্ত্রী সিঙ্গুর নিয়ে তৃণমূলকে দোষারোপ করছেন। কিন্তু সিঙ্গুর থেকে শিল্প তাড়ানোর তথাকথিত আন্দোলন যখন মমতা ব্যানার্জি করছিলেন, তখন তৃণমূলের পাশে কে ছিল? বিজেপি’র রাজনাথ সিং এসে মমতা ব্যানার্জির কানে কানে কী বলে গিয়েছিলেন? পশ্চিমবঙ্গ থেকে সেই গাড়ির কারখানা গুজরাটে চলে গিয়েছিল। লাভ হয়েছিল গুজরাটের। এখন মমতা ব্যানার্জি বলছেন, গুজরাট বাংলা চালাবে? এসব মানুষকে ভুল বোঝানোর জন্য। গুজরাটের স্বার্থেই তো তিনি কাজ করেছেন। ফলে এখন তারা যা বলছেন তা স্রেফ অভিনয়।


প্রশ্ন: বাংলা তাহলে কী চাইছে?


মহম্মদ সেলিম: সংযুক্ত মোর্চার সরকার হবে। সেই সরকারে বামপন্থীরা থাকবে। কেন বাংলার এটাই মনের কথা? কারণ — সম্প্রীতি, মিলে মিশে থাকা আমাদের বাংলার সংস্কৃতি। এর মাধ্যমেই বাংলার মানুষ বিশ্ব নাগরিক হয়ে ওঠেন যাবতীয় সীমানা পেরিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায়,‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর, আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী, বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি...।’ এটাই বাংলা। আমাদের সংস্কৃতি হলো মুক্ত জ্ঞান, মুক্ত মেধা, সম্প্রীতির বাঁধনে থেকে মুক্ত মন গড়ে তোলার। আমাদের এই সংস্কৃতিকে গত দশ বছরে ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়েছে তৃণমূল। আর তাদের বিভাজনের রাজনীতির সুযোগে রাজ্যে মাথা তুলতে পেরেছে বিজেপি। কিন্তু বিজেপি সম্প্রীতি, মুক্ত মন-মেধা মানে না। তারা বাংলার ইতিহাস জানে না। বিকৃত করাই তাদের কাজ। বাংলা কাজ চায়। ফসলের দাম চায়। খেতমজুরের মজুরি বৃদ্ধি চায়। মহিলাদের নিরাপত্তা চায়। এটা প্রমাণিত তৃণমূল এবং বিজেপি সেই আশা পূরণ করতে পারেনি, পারবে না। সংযুক্ত মোর্চার সরকারই শুধু সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে। বাংলা তাই বলছে — ‘হাল ফেরাও/ লাল ফেরাও।’





(সংগৃহীত)  কৃতজ্ঞতা    গণশক্তি 

Recent Comments:

Leave a Comment: