• ১ বৈশাখ ১৪২৮, বৃহস্পতিবার
  • 15 April 2021, Thursday
মেজাজ প্রতিরোধেরই প্রতিরোধের ভোট

মেজাজ প্রতিরোধেরই

ওয়েব ডেস্ক প্রতিনিধি

Updated On: 07 Apr 2021 01:07 am

রাজ্য​

দুষ্কৃতী দাপট, মেজাজ প্রতিরোধেরই  

কলকাতা, ৬ এপ্রিল— ‘জোর যার মুলুক তার’ ভঙ্গিতে কেন্দ্র এবং রাজ্যের শাসক দল তৃতীয় দফার ভোটগ্রহণে শক্তি প্রদর্শন করে গেল। অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের আশ্বাসকে খাতায় কলমে তুলে রেখে দিয়ে নির্বাচন কমিশন সারা দিন প্রায় চোখ বুজেই কাটিয়ে দিল। মঙ্গলবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হুগলী এবং হাওড়ার মোট ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটগ্রহণে কোথাও তৃণমূল, কোথাও বিজেপি’র দুষ্কৃতীবাহিনী দাপট দেখানোর চেষ্টা করেছে। নিষ্ক্রিয় করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে। বুথ থেকে সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থীদের এজেন্টকে মেরে বের করে দেওয়া, রাস্তায় ভোটারদের পথ আটকে হুমকি দেওয়া, মারধর, দিনভর এইসব ঘটনাবলীর মধ্যেও এবার ফয়সালা করে নেওয়ার জেদী মনোভাব নিয়ে মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে দেখা গেছে। প্রতিরোধের স্পষ্ট মেজাজ দেখা গেছে। ফলে বিকাল পাঁচটার মধ্যেই ভোট পড়েছে ৭৭.৬৮ শতাংশ। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৭৬.৬৮ শতাংশ, হুগলীতে ৭৯.৩৬ শতাংশ এবং হাওড়ায় ৭৭.৯৩শতাংশ ভোট পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।


তৃতীয় দফার ভোটগ্রহণে হিংসাত্মক আক্রমণ ও অবাধ ভোটগ্রহণে বাধা সৃষ্টির জন্য তৃণমূল এবং বিজেপি’র বিরুদ্ধে একগুচ্ছ অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের কাছে জানিয়েছেন সংযুক্ত মোর্চার নেতৃবৃন্দ। বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বহু বুথে ভোটার ও সংযুক্ত মোর্চার পোলিং এজেন্টদের ওপরে আক্রমণ করা হয়েছে বলে তাঁরা লিখিতভাবে কমিশনকে জানিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তাতে যথাযথ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে হস্তক্ষেপ করেনি বলে তাঁরা জানিয়েছেন। 


তবে শেষপর্যন্ত দশ বছর অবাধে ভোট দিতে না পারা ক্ষিপ্ত মানুষের জেদের কাছে বেশিরভাগ জায়গাতেই পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে দুষ্কৃতীরা। ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্র জুড়ে সংযুক্ত মোর্চার কর্মী, সমর্থকরা তৃণমূলের ভোটলুটেরা বাহিনীর বিরুদ্ধে এমন প্রতিরোধ গড়ে তোলেন যে গত নির্বাচনে প্রায় দেড় লক্ষ ভোটের ব্যবধানে জেতা তৃণমূল বিধায়ক তথা এবারের তৃণমূল প্রার্থী সওকত মোল্লা রাস্তায় বসে অবস্থান শুরু করেন। ১০ বছর ভোট দিতে পারেননি বিষ্ণুপুর বিধানসভা কেন্দ্রের পানাকুয়া ১২৩ নম্বর বুথের এক গৃহবধূ। এদিনও তিনি ভোট দিতে গেলে রাস্তায় তাঁকে বাধা দেয় এক তৃণমূলী দুষ্কৃতী। ওই তৃণমূল দুষ্কৃতীর চোখে চোখ রেখে তিনি বলেন, ‘ভোট দেবই। যা করার করে নিস।’ এই ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ায় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে বিষ্ণুপুর থানার পুলিশ অভিযুক্ত ওই দুষ্কৃতীকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয়েছে। 


ব্যাপক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে অবাধ ভোটের কথা কমিশনের পক্ষ থেকে বারে বারে বলা হলেও এদিন তৃণমূল এবং বিজেপি’র দুষ্কৃতীবাহিনী কী করে দাপট দেখাতে পারল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তৃণমূলের ঢঙেই বিজেপি’ও বেশ কিছু এলাকা বেছে নিয়ে ভোটলুটে নামায় দুইপক্ষের বাহিনীর মধ্যে বেশ কিছু এলাকায় অশান্তির ঘটনাও ঘটেছে। এদিন উলুবেড়িয়া দক্ষিণ কেন্দ্রের আইমা গোবর্দহ গ্রামে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। আহতদের উলুবেড়িয়া হাসপাতালে আনার পরে দুই পক্ষের সমর্থকরা হাসপাতালেও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। ব্যাপক মারামারি শুরু করে হাসপাতালের মধ্যেই। আতঙ্কে অন্যান্য রোগীদের আত্মীয়রা ছোটাছুটি শুরু করে দেন। তৃণমূলকর্মীরা উলুবেড়িয়া কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী পাপিয়া অধিকারীকে সরাসরি আক্রমণ করে তাঁকে ঘুষি মারে পুলিশের সামনেই। 


এদিন ভোটারদের প্রভাবিত করতে গিয়ে উলুবেড়িয়ার মুক্তিরচকে গ্রামবাসীদের ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে পড়েন তৃণমূল প্রার্থী নির্মল মাজি। এই মুক্তিরচকে সিপিআই(এম) করার অপরাধে একই পরিবারের দুই গৃহবধূকে ধর্ষণ করেছিল তৃণমূল নেতারা। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, এলাকায় এসে হুমকি দিচ্ছিলেন তৃণমূল প্রার্থী। মুক্তিরচকে ধর্ষিতার স্বামীকে উদ্দেশ্য করেও কটূক্তি করতে থাকেন তিনি। এরপরই গ্রামবাসীরা খেপে গিয়ে নির্মল মাজিকে তাড়া করলে তিনি পালান। তাঁর নিরাপত্তা রক্ষীর মাথা ফেটেছে বলে অভিযোগ। অন্যদিকে, এদিন ভোরেই আমতার চন্দ্রপুরে দক্ষিণ হরিশপুর গ্রামের দুলেপাড়ায় সিপিআই(এম) নেত্রী মাধবী মালিকের বাড়ি পুড়িয়ে দেয় তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা। পরে ঘটনাস্থলে যান সিপিআই(এম) প্রার্থী অশোক দলুই, মাধবী মালিক। এদিন ভোটগ্রহণ ছিল হাওড়া গ্রামীণের শ্যামপুর, বাগনান, আমতা, উদয়নারায়ণপুর, উলুবেড়িয়া দক্ষিণ, উলুবেড়িয়া উত্তর ও জগৎবল্লভপুর কেন্দ্রের। বিক্ষিপ্ত ঘটনাগুলি ছাড়া ভোটগ্রহণ মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে। আমতার ভাটোরা, জগৎবল্লভপুরের হাটাল, উলুবেড়িয়া উত্তরের চন্দ্রপুর কিছু বুথে সংযুক্ত মোর্চার পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া, ছাপ্পা ও বুথ জ্যামের অভিযোগ ওঠে। অনেকগুলি কেন্দ্রে ভোটারদের আটকানো, বাইক বাহিনীর দাপট, হুমকির অভিযোগ ওঠে তৃণমূলীদের বিরুদ্ধে। হাওড়া জেলা বামফ্রন্টের আহ্বায়ক বিপ্লব মজুমদার বলেন, তৃণমূল মরিয়া হয়ে শেষ কামড় দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু মানুষ অভূতপূর্ব জেদে ভোট দিয়েছেন। 


তৃণমূলের সন্ত্রাস, চোখ রাঙানির বিরুদ্ধে লড়াই করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় ১৬টি বিধানসভা কেন্দ্রে মঙ্গলবার ভোট দিয়েছেন ভোটাররা। ক্যানিং পূর্ব, ক্যানিং পশ্চিম, বাসন্তী, বিষ্ণুপুর, ফলতা, ডায়মন্ডহারবার, মগরাহাট পূর্ব, মগরাহাট পশ্চিম, মন্দিরবাজার, সাতগাছিয়া কেন্দ্রের বিভিন্ন জায়গার ভোটাররা দশবছর ধরে ভোট দিতে না পারার যন্ত্রণা বুকে নিয়ে এদিন তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। তৃণমূলের ভোট লুটেরাদের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছেন সংযুক্ত মোর্চার কর্মী, সমর্থকরাও। এদিন বারুইপুর, ক্যানিং, বাসন্তী ও ডায়মন্ডহারবারের বিভিন্ন ভোট গ্রহণ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এসএসবি’র আইজি শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও সিআরপিএফ’র আইজি প্রদীপকুমার সাউ। দিল্লি থেকে হেলিকপ্টারে তাঁরা প্রথমে বারুইপুরে আসেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ভোটগ্রহণ কেন্দ্র পরিদর্শনের শেষে তাঁরা আবার হেলিকপ্টারে দিল্লি ফিরে যান। 


ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রের দুর্গাপুর, শকুন্তলায় আইএসএফ কর্মীদের ওপর হামলা চালায় তৃণমূলী দুষ্কৃতীরা। এখানকার ১২৭ নম্বর বুথে এজেন্ট ঢুকতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে। ঘুমরি ৪৭, ৪৮ নম্বর বুথেও আইএসএফ প্রার্থীর এজেন্টদের বসতে বাধা দেয় তৃণমূল। মন্দিরবাজার কেন্দ্রের নিশাপুর অঞ্চলে সোমবার রাত থেকে ব্যাপক বোমাবাজি করে তৃণমূলী দুষ্কৃতীরা। ভোটারদের ভয় দেখায়। ডায়মন্ডহারবারের বাসুলডাঙ্গায় তৃণমূলীদের হামলায় ২জন সংযুক্ত মোর্চা কর্মী জখম হয়েছেন। মগরাহাট পশ্চিম কেন্দ্রের নেতড়া হাই মাদ্রাসার বুথে আইএসএফ প্রার্থী মইদুল ইসলামকে ঢুকতে বাধা দিলে তিনি বুথের সামনে ধরনায় বসেন। ফলতায় বিজেপি প্রার্থীর গাড়ি ভাঙচুর করে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা। বাসন্তীর ঢুড়ি অঞ্চলের ৫৫ নম্বর বুথের আরএসপি প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট মুর্তজা মোল্লাকে মারধর করে মাথা ফাটিয়ে দেয় তারা। তাঁর মোটরবাইক ভাঙচুর করে পুকুরের জলে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। বাসন্তীর হেদিয়ায় সকালে তৃণমূলী দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে বোমা, গুলি ছোঁড়ার অভিযোগ উঠেছে। এদিকে এদিন সন্ধ্যায় বাসন্তীর ভাঙনখালি অঞ্চলের ৮৪ নম্বর বুথে প্রক্সিভোট দিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ৩ তৃণমূল কর্মী।


ভোটের বাজারে উত্তেজনা তৈরি করতে সোমবার রাতে হুগলীর গোঘাটে এক মহিলার অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ঘিরে অপপ্রচার করেন বিজেপি নেতারা। আবার মঙ্গলবার সকালে গোঘাটেই সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধের হৃদরোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুকে ঘিরে পালটা অপপ্রচার করেছেন তৃণমূল নেতারা। 


হুগলি জেলার আটটি কেন্দ্র জাঙ্গিপাড়া, হরিপাল, ধনিয়াখালি, তারকেশ্বর, পুরশুড়া, আরামবাগ, গোঘাট ও খানাকুল কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়েছে। এদিন ভোরেই হরিপাল কেন্দ্রের আশুতোষ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার কৃষ্ণপুর মালপাড়া আইসিডিএস কেন্দ্রের ১৫৪ নং বুথে আইএসএফ প্রার্থী সিমল সরেনের এজেন্ট প্রবীর ঘোষকে তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা মারধর করে। খবর পেয়ে প্রার্থী সিমল সরেন সেখানে গিয়ে পুলিশের হস্তক্ষেপ দাবি করলে দুষ্কৃতীরা পালিয়ে যায়। দুপুরে পাঁটরার সিপাইগাছিতে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে কয়েক জন আহত হন। তারকেশ্বরের চাঁপাডাঙ্গা পঞ্চায়েতের কাছারিপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১১৮নং বুথে বিজেপি দুষ্কৃতীরা বুথ দখলের চেষ্টা করে। আরামবাগ কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সুজাতা মণ্ডল খাঁ আরন্ডি ১ গ্রাম পঞ্চায়েতের এক গরিব পাড়ায় গিয়ে ভোটারদের হুমকি দিলে সংঘর্ষ বেধে যায়। এতে ক্ষিপ্ত গ্রামবাসীরা লাঠিসোটা নিয়ে তাঁকে এমন তাড়া করে যে তিনি মাঠের আলপথ ধরে ছুটে পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ গ্রামবাসীদের হাত থেকে প্রার্থীকে উদ্ধার করে। 


খানাকুলের হিরাপুরের গ্রামবাসীদের অভিযোগ, ভোটারদেরকে ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা দিয়েছে তৃণমূল। এতে স্থানীয় মানুষজন বেশ কিছু জায়গায় বিক্ষোভ দেখান। খানাকুলের ৪০, ৪১ ও ৪২ নং বুথে দুষ্কৃতীরা ভোটারদের তাড়িয়ে দিয়ে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করে। এছাড়া বেশ কিছু বুথে গোলমাল করে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। গোঘাটের কৃষ্ণগঞ্জ বাজারে তৃণমূল ও বিজেপি'র মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে খুশিগঞ্জ গ্রামেও।





(সংগৃহীত)  কৃতজ্ঞতা  গণশক্তি 

Recent Comments:

Leave a Comment: