• ৩০ বৈশাখ ১৪২৮, শুক্রবার
  • 14 May 2021, Friday
অথ নক্ষত্র কথা ছবি: ইন্টারনেট

অথ নক্ষত্র কথা

সুপর্ণা চ্যাটার্জী ঘোষাল

Updated On: 29 Apr 2021 01:49 am

হাইড্রা


আকাশের তারামণ্ডলদের মধ্যে দীর্ঘতম হল এই হাইড্রা তারামণ্ডল। মিথুন রাশির ক্যাস্টর আর পোলক্সকে কাল্পনিকে রেখা দিয়ে যুক্ত করে তা আরো দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এগিয়ে দিলে একটা উজ্জ্বল কমলা রঙের তারার কাছে পৌঁছায়। এর নাম অ্যালফার্ড। এটা হাইড্রার হৃদপিণ্ডের তারা। এর কাছাকাছি আর কোনো উজ্জ্বল প্রভার তারা নেই বলে সহজেই এটাকে দেখতে পাওয়া যায়। মার্চের শেষ সপ্তাহে রাত ন'টা নাগাদ এটিকে গোটা আকাশ জুড়ে দেখতে পাওয়া যায়। এই তারামণ্ডল এতটাই বড় যে আকাশে সম্পূর্ণ উদয় হতে এর লেগে যায় প্রায় ছ' ঘণ্টা। পশ্চিমে কর্কটের ঠিক নীচ থেকে শুরু হয়ে পূর্বে তুলা পর্যন্ত হাইড্রার বিস্তৃতি।  

ব্যাবিলনীয় মহাকাব্য এনুমা এলিসে বলা হয়েছে, ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আগে যখন সূর্য, চন্দ্র, পৃথিবীরও কোনো অস্তিত্ব ছিল না, তখন এখানে শুধুমাত্র ছিল মিষ্টি জলের দেবতা আপসু আর লবনাক্ত জল তথা সমুদ্রের দেবী তিয়ামাত। এই তিয়ামাত আসলে ড্রাগন দেবী। তাদের মিলনে জলের কিনারায় পলি থেকে জন্ম নিল লাহমু আর লাহামু। তারা দুজনে জন্ম দিল তিন দেবতা। আংক্সার, কিসার এবং আনু। দেবতাদের এই প্রজন্ম থেকে জন্ম নেয় ইয়া এবং তার অসংখ্য ভাই। এরা ছিল দুর্ধর্ষ প্রকৃতির। ক্রমে তারা দিন, রাত ও জল দখল করে ফেলল। তাদের অবিরাম অত্যাচারে আপসু বা তিয়ামাতের মনে কোনো শান্তি ছিল না। তারা দেবতাদের অনুরোধ করে যেন তারা কোমলভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবহার করে। কিন্তু শক্তিশালী ইয়া তাদের কথা কানেও তোলে না। শান্তি পাওয়ার একটাই রাস্তা খোলা ছিল আপসুর কাছে। ইয়া আর তার ভাইদের বিনাশ। সেই মতো সে প্রথম প্রজন্মের দেবতাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে করতে বসে। কিন্তু ইয়া তার এই অভিসন্ধির কাথা জানতে পেরে প্রথমে তাকেই হত্যা করে। এই ভাবে দেবতাদের মধ্যেই গৃহযুদ্ধের সূচনা হল। স্বামীর মৃত্যুর খবরে ক্ষুব্ধ তিয়ামাত, ইয়া আর তার ভাইদের হত্যার জন্য শক্তিশালী দানব, বিষধর সাপ, ড্রাগন সৃষ্টি করে। জন্ম দেয় স্পিংক্স, বৃশ্চিক মানব এদেরও। এদের সকলের দলনেতা কিংগু, আপসুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে তিয়ামাতের সৈন্যদলকে ইয়ার বিরুদ্ধে স্বর্গে নিয়ে যায়। এদিকে ইতিমধ্যে ইয়া আর দেবী দামকিনা নির্মাণ করে ফেলে এক শক্তিশালী দেবতার। তার নাম মারদুক। তার দৃষ্টিতে বজ্রপাত হয়, নিঃশ্বাসে বের হয় আগুন। সে ছিল প্রবল পরাক্রমী। দেবতারা তার কাছে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করে তিয়ামাতের সৈন্যকে ধ্বংস করার। একটা শর্তে মারদুক রাজি হয়। যুদ্ধের শেষে সেই হবে পরম দেবতা, ব্রহ্মাণ্ডের শাসনকর্তা। দেবতারা রাজি হয়ে গেল।

মারদুক তখন যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে। প্রথমেই সে চারটি বাতাসকে ডেকে তিয়ামাতের কাছ অবধি পৌঁছানোর পথ পরিষ্কার করে। চারটে দুর্ধর্ষ ঘোড়ায় টানা সোনার রথে চেপে তির-ধনুক আর মহান বজ্র হাতে সে যুদ্ধক্ষেত্রে এসে দাঁড়ায়। মারদুকের সেই ভয়ংকর রূপ দেখে তিয়ামাতের সেনাবাহিনী ভয়ে পিছিয়ে গেলে তিয়ামাত স্বয়ং এক প্রলয়ঙ্করী ড্রাগনের রূপ ধারণ করে মারদুকের সামনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু তিয়ামাত কোনো রকম আক্রমণ করার আগেই মারদুক তাকে অস্ত্রের আঘাতে দু' টুকরো করে ফেলল। মারদুক তার শরীরের একটা অংশ দিয়ে পায়ের নীচে সৃষ্টি করে পৃথিবী আর মাথার উপরে সৃষ্টি করল আকাশ। তিয়ামাতের লম্বা লেজ সেই আকশের বুকে ছায়াপথ হয়ে জেগে রইল। আর মারদুক হল সূর্যের পুত্র (মারদুক শব্দটি এসেছে 'অমর উতু' থেকে, যার অর্থ উতু বা সূর্যের পুত্র) বৃহস্পতি। 

হিন্দু পুরাণেও সর্পরূপী বৃত্রাসুরকে বধ করার ঘটনা প্রচলিত আছে। প্রাচীন সূর্য-দেবতা ইন্দ্র, অন্ধকার বৃত্রাসুরকে বধ করে সূর্যকে মুক্ত করেছিল পৃথিবীর মানুষের জন্য। তাদের যুদ্ধ চলেছিল মকর সংক্রান্তি থেকে কর্কট সংক্রান্তি পর্যন্ত। জ্যোতির্বিজ্ঞানের সামান্য ধারণা থাকলেই বোঝা যাবে, এই সমস্ত গল্প জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক-একটা ঘটনাকেই ব্যাখ্যা করে।

আবার গ্রিক পুরাণে রয়েছে, হারকিউলিসের বারোটা কাজের মধ্যে অন্যতম ছিল বহুমাথাওয়ালা সাপ হাইড্রাকে বধ করা।

আর্গোস থেকে কিছু দূরে অবস্থিত ছিল শস্যশ্যামল এক দেশ লারনা। কিন্তু দেশটা অপার সৌন্দর্যে ভরা থাকলেও সেখানে কোনো মানুষ বাস করত না বা বলা যায় বাস করতে পারত না। কারণ লারনার হ্রদে বাস করত এক জীবন্ত বিভীষিকা। নয়টি মাথাওয়ালা এক ভয়ংকর দানবী সাপ হাইড্রা। গ্রিক দানবদের প্রধান তাইফন ও একিডনার সন্তান হলেও হাইড্রাকে পালন করেছিলেন দেবরাজ জিউসের স্ত্রী হেরা। হাইড্রাকে দিয়ে হারকিউলিসকে বধ করানোই ছিল হেরার আসল উদ্দেশ্য।     


ইউরিসথেউসের আদেশের হারকিউলিসের বারোটি অভিযানের দ্বিতীয় অভিযান হল এই হাইড্রাকে বধ করা। জিউসের ছেলে হারকিউলিস যতই বীর হোক না কেন, হাইড্রাকে একা বধ করা যে তার পক্ষে সম্ভব নয় তা অলিম্পাস পর্বতে বসবাসকারী দেবতারা ভালোই জানতেন। তাই এবার হারকিউলিসকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলেন দেবী এথেনা। এথেনার আশীর্বাদ পেয়ে হারকিউলিস তার ভাইপো তথা সারথি আইয়োলাস্কে নিয়ে লারনার জলাভূমিতে গিয়ে আগুনের তির ছুড়ে হাইড্রাকে উত্তেজিত করে বের করে আনে তার গুহা অ্যামিমোন থেকে। ক্রুদ্ধ হাইড্রা নিজের নটি মাথা আন্দোলিত করতে করতে ধেয়ে এল হারকিউলিসের দিকে। হারকিউলিস তার মুগুরের এক আঘাতে থেঁতো করে ফেলল হাইড্রার একটা মাথা, আর বাকি রইল আটটি। কিন্তু কী আশ্চর্য! হারকিউলিস অবাক হয়ে দেখল হাইড্রার গুঁড়ো হয়ে যাওয়া মাথায় পাশ থেকে গজিয়ে উঠল আরো দুটো মাথা। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে হারকিউলিস তাকিয়েই রইল হাইড্রার দিকে। এমন অদ্ভুত প্রাণী সে এর আগে দেখেনি। পৃথিবীর কোনো জীবের মাথা কেটে ফেললে সেখান থেকে নতুন মাথা জন্মাতে পারে এই ধারণাও ছিল না হারকিউলিসের। হারকিউলিসের এই বিহ্বল অবস্থা দেখে তার চিরশত্রু দেবী হেরা এক বিশাল কাঁকড়াকে পাঠালেন হারকিউলিসকে হত্যা করার জন্য। কিন্তু বীর যোদ্ধা হারকিউলিসের পায়ের পাতায় কামড় বসাতেই তার পায়ের চাপে সেই কাঁকড়া তক্ষুনি মারা গেল। সংবিৎ ফিরে পেয়েই হারকিউলিস আবার হাইড্রাকে আঘাত করতে ছুটে গেল। দেবী এথেনায় পরামর্শে হারকিউলিস হাইড্রার একটা করে মাথা কাটে আর হারকিউলিসের ভাইপো আইয়োলাস সেই ক্ষতস্থান পুড়িয়ে দিতে থাকে। ফলে সেখান থেকে আর নতুন মাথা গজাতে পারে না। এই ভাবে আটটি মাথা কাটা হয়ে গেলে আর একটা মাত্র বাকি থাকে। এই মাথাটি প্রায় অমর এবং অন্যান্য মাথার তুলনায় এই মাথার বিষ ছিল সর্বাপেক্ষা তীব্র। হাইড্রার এই মাথার একটা অংশ ছিল সোনার। এথেনার বুদ্ধিতে হারকিউলিস এথেনার দেওয়া সোনার তলোয়ার দিয়ে হাইড্রার মাথার সেই সোনার অংশটিতে আঘাত করে ধর থেকে মাথাটিকে আলাদা করে দিয়ে একটা ভারী পাথর চাপা দিয়ে রেখে দেয়। হাইড্রার প্রকাণ্ড শরীর নিষ্প্রাণ অবস্থায় এলিয়ে পড়ে মাটিতে। 

হাইড্রার এই জীবন ত্যাগকে মনে রাখতে দেবী হেরা হাইড্রাকে স্থাপন করেন আকাশে। 


Recent Comments:

Leave a Comment: