• ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮, শনিবার
  • 31 July 2021, Saturday
ঘেঁটু ফুলের জোসনা ছবি: কৃষ্ণেন্দু মণ্ডল

ঘেঁটু ফুলের জোসনা

সায়ন্তন ঠাকুর

Updated On: 11 Jul 2021 09:17 am

পর্ব: ৪৫



তোমাকে খুব পত্র লিখতে ইচ্ছে করে। হাতে তৈরি খসখসে কাগজে কালো মোটা কালির কলম দিয়ে লিখব। কোনো সম্বোধন ছাড়া হঠাৎ শুরু করার কী যে মজা। সুন্দর পুরু সাদা রঙের খাম থাকবে, তার ওপর বড় বড় করে লিখে দেব, ‘কোনো এক ডিসেম্বরের সন্ধ্যায়...’। কতদিন হাতে কিছু লিখি না। হলুদ টেবিল ল্যাম্পের আলোর নীচে বসে পত্র লিখব। দু’ পাতা চার পাতা। লিখব, এই যে আমার বাড়ির নীচে মাটির ঘর সাজানোর জিনিস মাথায় ঝুড়ি করে বিক্রি করতে এসেছে তার কথা। দরদাম করছে ফ্ল্যাটবাড়ির মেয়ে বউরা। ছেলেটি ভারী আনাড়ি। মোটেও দরদাম করতে পারে না! ছেঁকে ধরেছে মেয়ে মহল! 

—অ্যাই, এইটুকু ঘোড়ার দাম তিনশো? একশো-তে দিয়ে যাও!

ছেলেটা হাসছে। ওই মন ভালো করা হাসির ওপর ঝলমল করছে মফস্‌সলের রোদ্দুর। কার বাড়িতে ডালের ফোড়ন চাপিয়েছে যেন, ভেসে আসছে সুবাতাস। ছেলেটা বলছে

—অঙের দাম দিন দিন বাড়সি। দুকান যাসি, বলসি পাঁচ টাকা দাম বাড়সি। দুসো কুড়ির কম পারবু না গো দিদিভাই


এসব লিখব চিঠিতে কেমন? ওই ছেলেটার বাড়ির গল্প, সেই কোন বেলা গড়িয়ে হাসনাবাদ পার হয়ে চকডাঙা গ্রামে বাড়ি ফিরবে, সূর্য নিস্তেজ হয়ে পড়েছ তখন কুয়াশায়। হিম বাতাস চরাচরে। মাফলারটা গলায় কানে ভালো করে জড়িয়ে নিয়েছে। দুপুরে বিরাটি স্টেশনে একচালা ভাতের হোটেলে কি খেয়েছে? নাকি শুকনো মুড়ি জল কাঁচা লঙ্কা পেঁয়াজ দিয়েই সেরে নিয়েছে দুপুরের খাবার? এই না-জানা প্রশ্ন লিখব চিঠি জুড়ে। দু-একটা বিষণ্ণ গরিব শীতবিকেল জুড়ে দেব চালচিত্রে। পাখি দরকার তোমার? একটা ধনেশকে তাহলে রাজাভাতখাওয়ার সেই রুদ্রাক্ষ গাছের মাথা থেকে উড়িয়ে আনব। 


তোমাকে নিমন্ত্রণ করব ওই চিঠির পাতায়। ভোরবেলা উঠে বাজার করব। খোসা ওঠা নতুন আলু, বাচ্চা মটরশুঁটি, ডাঁটো যুবতি বেগুন, জমাট ফুলকপি। সব কিনব। ছোটফিঙা গ্রামের বদন শেখের কাছ থেকে নেব কামরাঙা। কামরাঙা কি আর মিলবে এখন? বাচ্চু মণ্ডলের কাছে পাব বড় বড় দিশি পাবদা। তুমি কি পাবদা ভালোবাসো? কালোজিরে ধনেপাতা কাঁচালঙ্কা ছিঁড়ে পাবদার পাতলা ঝোল! না কি চিংড়ি? নারকেলের দুধ বের করে মালাইকারি? জানিও কী পছন্দ! ওহ, তোমার তো শুয়োরের মাংস পছন্দ। বেশ, ঝাল ঝাল শুয়োরের মাংস রাঁধব। কুচো রসুন ফোড়নে দিতে হবে। অল্প পেঁয়াজকলি। একদম শুকনো শুকনো ভাজা। একটু ডাল করি? মুসুর ডাল! লাউয়ের খোসা পোস্ত ছড়িয়ে ভাজার সঙ্গে প্রথম পাতে। পালং শাক বেগুন আলু দিয়ে তরকারি। ঘরের কলাই ডালের বড়ি ভেঙে দেব। আলুপোস্ত খাবে? শিম-সর্ষেও ভালো। ধনেপাতা বাটা ঝাল ঝাল। আমাদের রাঢ়দেশের একটা পদ খেতেই হবে। আলু-বড়ি-বেগুন-কচুর তেঁতুলের টক! 


এসো তাড়াতাড়ি দুপুর গড়ানোর আগেই! জানলায় সাদা পর্দা টাঙাব। গোলাপ পাপড়ি ভেজানো জল রাখব মাটির সরায়। ফুলকাটা আসন। সামান্য ফুল। একটু হিনা আতর। 


এসো তাড়াতাড়ি! তোমাকে পত্র লিখতে ইচ্ছে করে খুব। সাদা খাম। খসখসে মোটা কাগজ। কালো কালি। 


আসলে নিজেকেই লিখতে ইচ্ছে করে। নিজেকেই লিখি। নিজেকেই খেতে দি যত্ন করে। স্নান করাই। পরিপাটি পাঞ্জাবি পরাই নিজেকে। আসন পেতে দি। কাঁসার গ্লাসে জল গড়িয়ে দি। যদি কখনো ভেতরে খুঁজতে খুঁজতে সেই তাঁকে পাই। আমার ভালোবাসার কৃপাময়কে।

Recent Comments:

Leave a Comment: