• ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮, শনিবার
  • 31 July 2021, Saturday
ঘেঁটু ফুলের জোসনা ছবি: কৃষ্ণেন্দু মণ্ডল

ঘেঁটু ফুলের জোসনা

সায়ন্তন ঠাকুর

Updated On: 12 Jun 2021 11:59 pm

পর্ব: ৪১




কত মানুষের সঙ্গে আলাপ হল। সেই উনিশ-কুড়ি বছর বয়স থেকে একা একা বাস করি এই অদ্ভুত শহরে। সন্ধ্যার মুখে আজও অতীত কথা মনে ঘাই মারে, তখন পুরাতন এক আষাঢ় মাস, অমৃত, আমারই এক বন্ধু, তার সঙ্গে চলেছি ওদের দেশের বাড়ি। বাদকুল্লা। শেষ আপ কৃষ্ণনগর লোকাল, রাণাঘাট পার হতেই প্রায় ফাঁকা কামরা। বৃষ্টি হয়েই চলেছে। জানলার কাচ নামানো। ঝাপসা চারপাশ। মাঝে মাঝেই বাজ পড়ছে, সেই রুপোলি আলোয় চমকে উঠছে অন্ধকার রাত্রি। অমৃতদের বাড়ি স্টেশন থেকে একটু দূরে, অঞ্জনা নদীর কণ্ঠলগ্না, সেই খঞ্জ বোষ্টুমি তার কিনারায় গান গায় কিনা জানি না, তবে একটি বাঁশের মাচা বাঁধা আছে শুনেছি অমৃতের মুখে।


ট্রেন থেকে যখন আমরা নামলাম, গোটা গ্রামে অন্ধকার থইথই, একটিও জনপ্রাণী নাই কোথাও, নিরালম্ব কুয়াশার মতো শুধু জেগে আছে রেল ইস্টিশান, সেদিকে তাকালে অকারণেই বুকের ভেতর ছমছম বাজনা ওঠে। প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে ডাইনে একটু এগোলেই বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পথ, টর্চের আলোয় দুজনে সাবধানে পার হয়ে চলেছি। বৃষ্টি ধরে এসেছে, আকাশ যদিও ঘন কালো। ব্যাঙ ডেকে চলেছে গলা ফুলিয়ে। বড় জামতলার নীচে ভেজা বাতাসের ঝাপটায় জাম পড়ে আছে অগুনতি। মেঘের গর্জন কানে ভেসে আসছে। ওদের বাড়িতে কেউ নাই আজ, আমরা পৌঁছে রান্না চাপাব। নিশুত রাতে এসব গ্রামদেশ শ্মশানভূমির মতোই থমথমে, সামনে অমৃত, পেছনে আমি, মাঝে মাঝে মুখ ফিরিয়ে সে বলছে, সাবধানে আসো, পড়ে য্যাও না! 


একেকবার মনে হচ্ছে এমন বাদুলে দিনে না এলেই হত, অচেনা বাড়ি, অমৃতের সঙ্গে আলাপও অল্পদিনের, মাস দুয়েক হল, তারপর ওর মুখেই শুনেছি ভিটায় কীসব যেন গোলমাল রয়েছে, পরক্ষণেই আবার ভাবছি কী আর হবে, কথায় বলে, কোথায় যাও গোপাল/সঙ্গে যায় কপাল, যা লেখা আছে তাই ঘটবে।


দু’ পাশে নিদ্রামগ্ন পাড়া, তবে কেমন যেন ছাড়া ছাড়া, মাটির ছোট বাড়ি, অন্ধকার চালে কৃষ্ণসর্পের মতো শুয়ে রয়েছে লতাপাতা, পুঁই কি কুমড়া হবে, অনেক দূরে কাদের ঘরে ক্ষীণ একখানি পাণ্ডুর আলো জ্বলছে, বাঁশডোবার জমা জলে সরসর করে কীসব শব্দ, অমৃতকে শুধোই, ও কীসের শব্দ রে? 

খুকখুক করে হেসে বলে,

----ও কিচু না, হ্যালা সাপ টাপ হবে!

----ও, তা আর কতদূর?

----আসেই পড়চি গো, আর খানিক গেলেই নদীর কলকল শব্দ শুনতি পাবা!

----অনেক রাত হল!

আবার বুড়ো মানুষের মতো খুকখুক করে হাসে অমৃত,

----দমদমে বলচিলাম, কাল সকালে আসলিই পারতা!

তখন যৌবনকাল, ও কথায় আমার আহত অহং উত্তর দেয়,

----না, না! কী এমন রাত! চল চল! 

দু-এক মুহূর্ত পর অমৃত জিজ্ঞাসা করে,

----ভয় লাগচি নাকি?

ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামে আবার, বাঁশবনখানি যেন অনন্ত, শেষই আর হয় না, পুবদেশ থেকে নিঝুম রাত্রে ডাকিনী বাতাসের নাও ছেড়েছে, তারই দোলায় বাঁশে বাঁশ ঘষা লেগে বিচিত্র শব্দ ভেসে আসছে, এই স্থানে রাত্রি সম্পূর্ণ নিথর, ঝিল্লিরব নাই, ভেকদল কোনো অজ্ঞাত কারণে নিশ্চুপ, হঠাৎ নিস্পন্দ বাঁশবনের উপর টর্চবাতির আলো ফেলে অমৃত আমার দিকে ফিরে বলে,

----দ্যাকচো?

কী আর দেখব, জলে চুপচুপে বাঁশঝাড়, আলো পড়তেই সাদা একখানি প্যাঁচা ডানা ঝাপটে আরো গভীর আঁধারের দিকে উড়ে গেল, একটু অবাক হয়েই শুধোলাম,

----কী দেখব?

সেই খুকখুক হাসি আবার, আশ্চর্য কলকাতায় তো সে এমন সুরে হাসে না, এ আবার কী! হাসি থামিয়ে অমৃত জিজ্ঞাসা করে,

----বাঁশবন দ্যাকচো তো?

----হ্যাঁ! আবার কী দেখব!

----রাতে বাঁশবন আর সকাল হলি দ্যাকবা একানে একটা তেঁতুল গাচ!

প্রচণ্ড অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করি,

----মানে?

বৃষ্টি সহসা যৌবনবতী হয়ে উঠেছে, কারোর উঠানে মনে হয় কাঠচাঁপা ফুটেছে, ক্ষীণ অস্পষ্ট সুবাস ভেসে আসছে, ছাতা খুলে এগোতে এগোতে অমৃত সহজ গলায় বলে,

----কতদিন তো হল না, মেঘ জল হলি এ জিনিস ছোট তেকে দেকে আসচি, বুজলা! সকালে তেঁতুল গাচ, বেশ ঝাঁকামুকো গাচ, কাল সকাল হলি দেকতে পাবা আর রাতে আসো, নাই!

----আশ্চর্য! 

----বটেই তো! তবে একটা কতা ভাবচি

----কী কথা?

----এতদিন জানতাম আমিই শুদু দেকি, আজ তাই তোমায় শুধোলাম! আগে যতবার শুদিয়েচি, ভাই বলো বন্দু বলো, জল বাতাসের রাতেও শুদিয়েচি, তারা কিন্তু বাঁশবনের মাজে তেঁতুল গাচও দেকতে পায়! শুদু তুমিই... আমার মতো দেকতে পেলা না! 

----সবাই দেখেছে?

বিস্মিত গলায় বেজে ওঠে অমৃত,

----হাঁ, সবাই দেকচে! আমার কতা কেউ বিশ্বাসই করেনি! ভাইকে পরে শুদিও! 

কেউ কোনো কথা বলে পথ চলতে থাকি, থমথমে রাত্রি রহস্যময়ীর আঁখির মতো জেগে উঠেছে, আমার মনে সদ্য নিদ্রা থেকে জেগে উঠেছেন পরমা প্রকৃতি, চঞ্চলা ক্রীড়াময়ীর এ কী আশ্চর্য কৌতুক, কেউ দেখতে পায় না, শুধু অমৃত দেখে আর আজ আমি দেখলাম! 

দু-এক মুহূর্ত পর অমৃত একটু চিন্তিত গলায় আপনমনে কথা বলার মতো করে বলে,

----তাইলে কি ও জিনিসও তুমি শুনতে পাবা! কী জানি!

----কী জিনিস অমৃত? কী শোনার কথা বলছিস তুই?

সহসা দূরে অঞ্জনা নদীর দিক থেকে মৃদু জলতরঙ্গের মতো রিণরিণে এক শব্দ, শব্দ বললে ভুল হয় আসলে যেন আনন্দময়ীর কণ্ঠ, যেন নিরবিচ্ছিন্ন ধীর এক স্রোতধারা, উত্থান নাই পতন নাই, চৈত্রের সুদূর আকাশে ডানা মেলে ভেসে থাকা অপরাহ্ন আলোর মতো, নির্ভার কুসুমকোমল। জগতে আর কোনো শব্দ নাই শুধু সুরধুনির মতো বয়ে চলেছে সে। কিন্তু কী আশ্চর্য, ওই সুর কোনো ভয় জাগাল না, বরং আগল খোলা দাওয়া পার হয়ে এই ঘন রাত্রি বাঁশবন ক্ষুদ্র পল্লীদেশ সব পার হয়ে আমার কোন দূর দেশের কথা মনে পড়ল। কী যে মনে পড়ল তা আজ আর স্পষ্ট করে বলতে পারব না তবে সে-দেশে কেউ যেন আমার পথ চেয়ে বসে আছে কত জন্ম, এমন একটি ভাব ক্ষণিকের জন্য জেগে উঠেছিল।


আজও ওই কথা মাঝে মাঝে সন্ধ্যার মুখে মনে পড়ে, কী জানি কেন সেদিন অঞ্জনা নদীতীরে জলতরঙ্গ শুনেছিলাম, কতদিন হয়ে গেল অমৃতের সঙ্গেও আর কোনো যোগাযোগ নাই, জলরাত্রে তেঁতুল গাছ এখনও ধু ধু বাঁশবনে মুছে যায় কিনা তাও জানি না! থাক, সব জেনেই বা কী করব! সব বুঝে ফেলার চেষ্টা আসলে নিজের ক্ষুদ্র অহংকে তৃপ্ত করার কৌশল বৈ অধিক কিছু তো নয়!

Recent Comments:

Leave a Comment: