• ১ বৈশাখ ১৪২৮, বৃহস্পতিবার
  • 15 April 2021, Thursday
ঘেঁটু ফুলের জোসনা ছবি: কৃষ্ণেন্দু মণ্ডল

ঘেঁটু ফুলের জোসনা

সায়ন্তন ঠাকুর

Updated On: 04 Apr 2021 08:00 am

পর্ব: ৩৩

এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী আসেন পাড়ায়, ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে ভাঙা গলায় খঞ্জনি বাজিয়ে গেয়ে ওঠেন কৃষ্ণনাম, তারপর গান শেষ হলে করুণ গলায় ডাকেন, মা!

ইচ্ছা হলে কেউ বেরিয়ে এসে পাঁচ-দশ টাকা দেন। আজকাল তো সিধে দেওয়ার চল নাই, আগে আমাদের দেশ গাঁয়ে দেখেছি বেতের ধামায় চাল, আলু পটল বেগুন, যেমন যা জুটত দু' হাতে করে নিয়ে এসে সাপিতে ঢেলে দিতেন গৃহলক্ষ্মী। তা সেই যুগ অচল কড়ির মতোই তামাদি হয়ে হারিয়ে গেছে কালগর্ভে।


সন্ন্যাসী আসেন এই রকম দুপুর গড়িয়ে, লোকজন যে যার কাজে আপিসে দোকানে বেরিয়ে গেছে, নির্জন গৃহ, কোনো বাড়ির তরুণী বধূটি হয়তো সবে স্নান সেরে দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে, রাস্তা থেকে তার দিকে মুখে তুলে তাকিয়ে সন্ন্যাসী বলে ওঠেন, মা, রাদামাদবের সেবায়...

কথা আর শেষ হয় না, মুখ তুলে অল্প হাসেন, বয়স হয়েছে, সামনের পাটির দুটি দাঁত নাই! দ্বিপ্রহরের খর রৌদ্র ঝমঝম করে বাজছে ভুবনডাঙায়, ফিরিওয়ালার হাঁক ভেসে আসছে গলির রাস্তায়, ওদিকে মজা পুকুর পারে সজনে গাছে কতগুলি শালিখ কী হুটোপুটিই না শুরু করেছে, রাধামাধবের জন্য ভিক্ষা চাইছেন এক বৃদ্ধ। পরনে মলিন ধুতি আর ফতুয়া, মুখ বলিরেখার দাগ, কপালে শুকনো রসকলি। তরুণীটি দু' আঙুল কপালে ঠেকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কেউ আবার দেয় দু-চার টাকা, কেউ ভাবে কাজের নাম নাই---- এই ভিক্ষা করে করেই দেশটা উচ্ছন্নে গেল! যার যেমন সংস্কার।


আমার সঙ্গে বেশ মুখচেনা হয়ে গেছিল তাঁর, আমরা দুজনেই ভিক্ষাজীবী কিনা! আমি পরিবারের জন্য ভিক্ষান্ন জোগাড় করে আনি তিনি রাধামাধবের জন্য বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। বংশীধারীই ওঁর পরিবার। 

কাছেই একটি গ্রামে বাড়ি, তা প্রায় মাইল দুয়েক হবে, ভিক্ষা করে যা হয় তাই দিয়ে কোনওক্রমে পেট চলে যায়। দুটি তো মাত্র পেট, বৃদ্ধ আর রাধামাধব!


একেকদিন জিগ্যেস করলাম, 

—এই বয়সে এতদূর হেঁটে আসেন, অনেক সময় লাগে তো?

—তা লাগে বাবা!

—কষ্ট হয় না?

কথা শুনে আমার দিকে তাকিয়ে হাসেন সন্ন্যাসী। এদিকে রোদের তাত তেমন নাই, দূরে নিমফুলগুলি তিরতির করে বাতাসে দুলছে, আকাশে কয়েকখণ্ড ঘোড়ামুখো মেঘ অলস গতিতে পুবদিকে ভেসে চলেছে। দু-এক মুহূর্ত পর বলেন,

—কী করব বাবা, আসতি হয়।

—তা আপনাদের ওদিকে যান না কেন ? তাহলে আর এতটা পথ হাঁটতে হয় না।

—ওদিকে সব ফেলাটবাড়ি বাবা, কেউ দ্যায় না কিচু!

চুপ করে থাকি। কী আর বলব! নিজের মনে বৃদ্ধ বলে ওঠেন,

—সুদু এদিকে আসলে

—কী? 

—ফিরে ভোগ চাপাতে দেরী হয়ি যায় বাবা!

—হ্যাঁ, তা তো হবেই! এতটা পথ হেঁটে ফেরা!

—দুপুর, কোনদিন বিকেল হয়ি যায!

আমি নরম গলায় জিগ্যেস করি,

—খিদে পায় না?

পথের ধূলা উড়ে আসে, কেমন পায়ের নুপুর বাজিয়ে চঞ্চলা বালিকার মতো খেলা করছে ফাল্গুনের মধু বাতাস। সন্ন্যাসী অলস চোখে সেদিকে চেয়ে আছেন, কার কথা যেন মনে পড়েছে তাঁর, করুণ কণ্ঠে বলেন,

—আমার অব্যেস আচে বাবা, তার খিদা লাগে, খিদা লাগে!

বলতে বলতে গলা ভারী হয়ে আসে, আমি একটু অবাক হই, ভাবি বোষ্টুমীর কথা বলছেন হয়তো, শুধোই

—কে, আপনার বোষ্টুমি ?

—বোসটুমি তো নাই বাবা!

—তাহলে ?

এবার হঠাৎ লজ্জা পান সন্ন্যাসী, চোখ নামিয়ে বলেন,

—রাদামাদব আচে না ঘরে! 

কয়েকমুহূর্ত পর ফের বলে ওঠেন,

—খিদা লাগে তার! বেলা হলি খিদা লাগে! মুক শুকায় বসি থাকে!

দূরে কী একটা পাখি ডেকে ওঠে, রাস্তায় লোকজন তেমন নাই, কাদের বাড়ি থেকে শুকনো লঙ্কা ফোড়নের ঝাঁজ ভেসে আসছে, আমি বৃদ্ধর দিকে চেয়ে থাকি। গ্রামের একফালি ঘরে একলা রেখে এসেছেন তাঁর প্রেমিকাকে, সেই কখন ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বাড়ি ফিরবেন, রান্না হবে তারপর সামান্য দুটি অন্ন বেড়ে দেবেন তাঁকে। কী আর হয়, ওই সেদ্ধ ভাত খুব বেশি হলে পাঁচমেশালি একটি তরকারি। ক্ষুধায় ওই যুবতি প্রেমিকার মুখখানি কেমন মলিন, স্নান করে নাই, চুল বাঁধে নাই, নিধুবনের কুসুম সাজ কবেই হারিয়ে গেছে যমুনার জলে! হতদরিদ্র ভিখারির প্রেমিকা, এর বেশি আর কীই বা পাবে!


আজ অনেকদিন পর দেখি রাস্তা দিয়ে আসছেন সেই সন্ন্যাসী, শরীরটি আরও শীর্ণ, চোখদুটি যেন কোটরে ঢুকে গেছে, তবে মুখের হাসিখা নি আজও অমলিন। রাস্তা জনমানবশূন্য, গত ক’দিন সবজি নিয়ে বসতো যারা তাদেরও তুলে দিয়েছে, মাঝে মাঝেই টহল দিচ্ছে পুলিশের গাড়ি। বাঁশ দিয়ে গলির মুখ বন্ধ, বৃদ্ধ কোনোমতে বাঁশের তলা দিয়ে নীচু হয়ে বেরিয়ে আসছেন, আমাদের এখানে আসার আগেই একটি বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে অভ্যাসমতো গেয়ে উঠলেন কৃষ্ণনাম।


দরজা খুলে অগ্নিশর্মা হয়ে এক তরুণী বেরিয়ে এলেন, তাঁকে দেখে বৃদ্ধ একমুখ হেসে বলে উঠলেন, মা রাদামাদব

—নিকুচি করেছে রাধামাধব! লজ্জা লাগে না এসময় ভিক্ষা করতে?

বৃদ্ধ থতমত খেয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে মলিন গলায় বললেন,

—মা, তিনদিন তাকে কিচু খেতি দিতি 

—বেরোও, ছোটলোক কোথাকার! এদের জন্যই রোগ ছড়ায়! এত করে বলছে, ঘরে থাকো, ঘরে থাকো, কথা কানে যায় না তোমাদের?

—মা, আমার রাদামাদবেরে খেতি দিতি... তাই...

—রাধামাধব! মরুক তোমার রাধামাধব! 


মাথা নীচু করে ফিরে যাচ্ছেন বৃদ্ধ। পেছন থেকে তরুণীর গলা ভেসে আসছে, সম্ভবত স্বামীকে বলছেন, দেখেছ, এদের মেরে পুলিশে দেওয়া উচিত! এসবের জন্যই রোগ আটকানো যাচ্ছে না! ভিক্ষা করতে এসেছে! রাধামাধব, করোনার সময় রাধামাধব দেখাচ্ছে।


আজ আকাশে অল্প মেঘ, মৃদু মৃদু বাতাস বইছে, হয়তো সব বাড়িতেই মানুষজন এমন করে তাড়িয়ে দেবে তাঁকে। ওদিকে কে যেন অপরাহ্ন আলোর আঁচল বিছিয়ে দিয়েছে চরাচরে, একপেট ক্ষুধা নিয়ে বৃদ্ধের পথ চেয়ে বসে আছেন রাধামাধব, বাড়ি কী বলবেন তাঁকে বৃদ্ধ? হয়তো করুণ অক্ষম দুটি চোখ তুলে চেয়ে থাকবেন। আজও তাঁদের দুজনের হয়তো উপবাস। কদমকুসুম আজ ফোটে নাই ভুবনডাঙায়।


Recent Comments:

Leave a Comment: