• ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮, শনিবার
  • 31 July 2021, Saturday
অনন্তের আহ্বান ছবি: ইন্টারনেট

অনন্তের আহ্বান

গৌরব বিশ্বাস

Updated On: 17 Jul 2021 12:26 am

আটল্লিশ পর্ব

 

 

রাস্কিন বন্ডের ব্যক্তিগত ভূতের অভিজ্ঞতা কিছু নেই। উনি নিজে তেমনই দাবি করেন। তবে দুটো অদ্ভুত ঘটনার কথা বলা যায়। প্রথম ঘটনাটি ভুতুড়ে নয়। অদ্ভুত। আর দ্বিতীয় ঘটনাটি উনি শুনেছিলেন ওঁর এক বন্ধুর কাছে।

বেশ কয়েক বছর আগে এ ক্যালক্যাটা লিটেরারি মিটে এ শহরে এসেছিলেন সাহিত্যিক রাস্কিন বন্ড। সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম আমিও। রাস্কিন বন্ডের ভূতের গপ্প নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল সেদিন। এক দর্শক ওঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনি কি নিজে কোনোদিন ভূত দেখেছেন? বা কোনো অলৌকিক ঘটনার সম্মুখীন হ্যেছেন তিনি?” রাস্কিন বন্ড সেদিন বলেছিলেন একটি ঘটনা। সেটি তারাশঙ্করের ভূতের ঘটনার মতোই ইন্দ্রিয় ভ্রমের ফসল। ঘটনাটা ছোট করে বলি। একবার রাস্কিন বন্ডের পাশের বাড়ির এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। মৃত্যুর খবর পেয়ে বন্ড সাহেব উপস্থিত হয়েছেন সেখানে। হঠাৎ বন্ড সাহেবের মনে হল মৃতদেহটি দাঁত বার করে হাসছে। এমন দৃশ্য দেখে তিনি তো রীতিমতো আতঙ্কিত। পরে বোঝা গেল, বৃদ্ধ মৃত ব্যক্তিটি নকল দাঁতের পাটি ব্যবহার করতেন। তিনি যখন মারা গেছিলেন, নকল দাঁতের পাটি মুখের ভিতরেই ছিল। রিগর মর্টিস বা মরণ সংকোচনের ফলে সেই নকল দাঁতের পাটি বাইরে বেরিয়ে এসেছে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি উনি শুনেছেন, ওঁর এক প্রতিবেশী বন্ধুর কাছে।

ওঁর বাড়ির পিছনের কটেজে যে বৃদ্ধ থাকেন, ওঁর নাম মিস্টার জেকব। কম বয়সে স্থানীয় মিশন হাসপাতালের মর্গের আ্যটেনডেন্ট ছিলেন। পাহাড়ের উপরে একটা আউট হাউসকে সেসময় মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হত। মিষ্টার জ্যাকবকে কতবার দেখাতে বলেছি সে বাড়িখানা। মিষ্টার জেকব ভয়ে শিউরে উঠেছেন। কী হয়েছিল তাঁর সঙ্গে? অনেক সাধ্যসাধনার পর মিষ্টার জেকব শুনিয়েছেন সে গপ্প, “সেসময় আমার কাঁচা বয়স। ভয়ডর নেই বললেই চলে। মর্গের অ্যাটেনডেন্টের চাকরি নিলাম। তাও আবার নাইট ডিউটি।

“একদিন সন্ধ্যায় সবে এসেছি ডিউটিতে, পুলিশের লোকেরা একটা মড়া নিয়ে এল। একটা যুবকের লাশ। ল্যান্ডেরের নদীতে মিলেছে। লাশ ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। এতরকম মড়া দেখেছি আগে, এসব দেখে আর ভয়টয় করে না। মর্গের টেবিলে মড়া তুলে কাপড় মুড়ে রেখে বেশ যুত করে বসলাম বেঞ্চিতে। রাত আর কাটে না কিছুতে। আমার এক বন্ধুকে বলে রেখেছিলাম। ও রাতে আসবে। গল্পগুজব করে কেটে যাবে রাতটা। কিন্তু তারও আসার নাম নেই। কিছুক্ষণ গুনগুন করে গান ভাজতে ভাজতে এদিক ওদিক পায়চারি করলাম। বিরক্ত লাগছে বড়। আবার এসে বসলাম বেঞ্চিতে। অন্যদিনের থেকে সেদিনের রাত যেন বড় বেশি নিঝুম। একটা শিরশিরানি ভাব বাতাসে। মাথায় কতরকম বিচিত্র চিন্তা আসতে লাগল। একটু আগেই যে ছেলেটার লাশ টেবিলে রেখে এলাম, কেন সে এমন কাজ করল। কী দুঃখ তার? ঘণ্টাখানেক আগেও তো বুকের ভিতরের যন্ত্রখানা ধুকপুক করছিল! শরীরটা গরম ছিল। আর এখন সব নিস্তব্ধ। ওই শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে এখন। ভয় ঠিক না। কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। যে সময়ের কথা বলছি সেসময় মর্গে তখনও ইলেকট্রিসিটি আসেনি। কেরোসিন ল্যাম্পই ভরসা। সেটাও দপদপ করছে। একটু বাদে সেটা নিভে গেল। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। উঠে গিয়ে পকেট থেকে দেশলাই বার করে সেটা জ্বালালাম। বেঞ্চে এসে সবে বসেছি ওমনি আবার নিভে গেল ল্যাম্পটা! ঠিক সেই মুহূর্তেই মনে হল একটা ছায়ামূর্তি স্যাৎ করে সরে গেল আমার পাশ থেকে। এক তীব্র আতঙ্ক চেপে বসল আমায়। সাহসী বলে যে মিথ্যে অহংকার ছিল আমার, কর্পূরের মতো এক মুহূর্তে তা উবে গেল। মৃদু এক পায়ের শব্দ পেলাম। সেই অন্ধকারে মেঝের উপর কেউ যেন খালি পায়ে চলে বেড়াচ্ছে। আতঙ্কে আমার কলজে যেন ফেটে বেরিয়ে আসবে। দু’ পা অস্বাভাবিক রকমের ভারী হয়ে উঠেছে। চিৎকার করতে গেলাম।গলা থেকে স্বর বেরোচ্ছে না। ঠিক সেই সময় একটা হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম কাঁধের উপর। হিমশীতল বরফ ঠান্ডা স্পর্শ। এতদিনের মড়া ঘাটার অভিজ্ঞতায় জানি, এ স্পর্শ কোনো জীবিত মানুষের হতে পারে না। একটু করে সে স্পর্শ কাঁধ ছাড়িয়ে উঠে আসছে গলায়, তারপর মুখে... তারপর কিছু মনে নেই আর।

“জ্ঞান ফিরে দেখি মেঝেতে শুয়ে আমি। আমার বন্ধুটি চিন্তাগ্রস্ত মুখে শুশ্রষা করছে আমার। লাশ রয়েছে টেবিলেই। ভাবলাম মনের ভুল। কিন্তু কাঁধের উপর চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম। কাঁধের জামার উপর পাঁচ আঙুলের ভেজা ভেজা দাগ। ভেজা ভেজা পায়ের দাগ মেঝের এদিক-ওদিক ছড়িয়ে। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, জলে ডোবা ছেলেটির লাশের সঙ্গে সে পায়ের ছাপের আকার হবহু মিলে যায়।”

এ ঘটনার পর মিস্টার জ্যাকব মর্গের নাইট ডিউটি ছেড়ে দেন।

 

Recent Comments:

Leave a Comment: