• ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮, শনিবার
  • 31 July 2021, Saturday
অনন্তের আহ্বান ছবি: ইন্টারনেট

অনন্তের আহ্বান

গৌরব বিশ্বাস

Updated On: 10 Jul 2021 01:47 am

সাতল্লিশ পর্ব

 

গ্রন্থের তো কতরকম উৎসর্গপত্র হয়। সাহিত্যিক গ্রন্থ উৎসর্গ করেন বন্ধুকে, পত্নী, প্রেমিকা, অগ্রজ বা অনুজকে। যিনি কবি বা সাহিত্যিকের অন্তরতম, উৎসর্গ পত্রে স্থান তাঁরই। উৎসর্গ পত্রে উল্লিখিত ব্যক্তিটি হতে পারেন জীবিত। পরলোকগত হলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। অনেক সাহিত্যিকই বই উৎসর্গ করেন তাঁর স্বর্গীয় বাবা-মাকে। কিন্তু যে উৎসর্গ পত্রের কাহিনি বলতে বসা, সেই উৎসর্গ পত্রের উদ্দিষ্ট ভদ্রলোকটি ইহলোকের বাসিন্দা নন। গ্রন্থ লেখকের সঙ্গে উৎসর্গিত ব্যক্তির যখন আলাপ, ততদিনে তিনি পরলোকের অধিবাসী। সূক্ষ্ম শরীরে বিরাজমান। ব্যাপারটা ভাবতেই কেমন একটু গা শিরশির করে। একটু গুছিয়ে বলি ব্যাপারটা।

রাজকৃষ্ণ মিত্রের আদি বাড়ি পূর্ববঙ্গে। বেশ সুখেই কাটছিল দিন। কিন্তু সুখ বেশিদিন রয় না। হঠাৎই পরিবারে নেমে এল মৃত্যুশোক। কলেরায় পরিবারের নিকট আত্মীয়েরা একে একে চলে গেলে। অল্প সময়ের ব্যবধানে একের পর এক নিকট আত্মীয়কে হারিয়ে রাজকৃষ্ণ শোকে বিহ্বল। ঠিক এই সময়েই তাঁর সঙ্গে আলাপ অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক শিশির কুমার ঘোষের। শিশির কুমারও তখন নিজের পারিবারিক মৃত্যুশোকে মুহ্যমান। মৃত্যুশোক ভুলতে ঝুঁকেছেন পরলোক চর্চায়। পরলোক চর্চার গুরু হিসেবে মেনেছেন সাহিত্যিক প্যারীচাঁদ মিত্রকে। প্রেত চক্রে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছেন পরলোক প্রাপ্ত আত্মীয়দের সঙ্গে। সফলও হয়েছেন। রাজকৃষ্ণকে শিশির কুমার নিজেদের দলে নিয়ে এলেন। রাজকৃষ্ণ অনুভব করলেন- মৃত্যু, সে তো জীবনেরই এক অংশ। জীবন থেকে মৃত্যু এ যেন শুধু বাড়ি বদল। আসলে বদলায় না কিচ্ছুটি। তারপর প্রায় কুড়ি বছর সময়কাল ধরে নিরবিচ্ছিন্ন পরলোক চর্চা। এর মধ্যে রুটিরুজির টানে রাজকৃষ্ণ চলে এসেছেন এ শহরে। তখন এ শহরে বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ বোরিগনি সাহেবের খুব রমরমা। সাহেব শুধু প্রখ্যাত ডাক্তারই নন, দুর্দান্ত এক স্পিরিচুয়ালিস্ট। বোরিগনির সান্নিধ্যে রাজকৃষ্ণ হোমিওপ্যাথ শিখলেন। সেই সঙ্গে লাভ করলেন পরলোক সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান। বছর খানেক বাদে রাজকৃষ্ণ নিজের বাড়িতেই হোমিওপ্যাথির চেম্বার খুলে বসলেন। সম্ভবত আপার সার্কুলার রোডে। সেই সঙ্গে চলতে থাকল পরলোক চর্চা। সপ্তাহ অন্তে বসত প্রেত চক্র। কোনোদিন নিজের বাড়িতে। কোনোদিন প্যারীচাঁদ মিত্রের বাড়ি। কখনো ডাঃ বোরিগনির চেম্বার। কখনো মিউগেন সাহেবের অফিস। এভাবেই এ শহরের বিভিন্ন বাড়িতে বসতে থাকে প্রেত চক্র।

যে সময়ের কথা বলছি, সেটা ধরে নিন ১৮৬০ থেকে ১৮৮০ এর মধ্যে। বাঙালির আধ্যাত্মিক দর্শন তখন নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিলিতের তাবড় তাবড় সব পরলোক বিশারদের সঙ্গে চিঠিপত্রে চলছে মতামতের আদান-প্রদান। এ শহরের বুকে গড়ে উঠেছে থিওসফিক্যাল সোসাইটি। প্যারীচাঁদ মিত্ররা কয়েকজন সমমনস্ক বন্ধুতে মিলে গড়ে তুললেন ক্যালকাটা স্পিরিচুয়ালিস্ট সোসাইটি। প্যারীচাঁদ মিত্র, পূর্ণচন্দ্র মুখুজ্জে, ইন্ডিয়ান মিররের সম্পাদক নরেন্দ্রনাথ সেন, ব্যারিস্টার সি. দত্ত সেকালের এ শহরের সমাজের গণ্যমান্য সব ব্যক্তি। আর থাকতেন ডাঃ বোরিগনি এবং মিউগেন সাহেব। সেসময়, কলকাতার রামবাগান অঞ্চলে ব্যারিস্টার সি. দত্তের একটা বাগানবাড়ি ছিল। এক বিকেলে সে বাড়িতেই বসল প্রেত চক্রের আসর। ডাঃ রাজকৃষ্ণ মিত্র সঙ্গে করে নিয়ে এলেন তাঁরই এক পেশেন্টকে। ভদ্রলোকের নাম নিত্যরঞ্জন ঘোষ। ভালো মিডিয়াম। শুরু হল প্রেত চক্র। দরজা-জানালা সব বন্ধ। সবাই চোখ বুজে স্মরণ করছেন কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির আত্মাকে। হঠাৎই গন্ডগোল। মিডিয়াম নিত্যরঞ্জন গোঁ গোঁ শব্দ করে দুম করে পড়ে গেল মাটিতে। তারপর উদ্‌ভ্রান্তের মতো ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেল। একটু বাদে সবাই ধরাধরি করে এনে শুইয়ে দিল নিত্যরঞ্জকে। নিত্যরঞ্জনের তখন যায় যায় অবস্থা। প্রেত চক্রে উপস্থিত সকলে বুঝল, কোথাও কোনো গোলমাল হয়ে গেছে। নিত্যরঞ্জনের উপর যিনি ভর করেছেন তিনি কোনো দুষ্টু প্ৰকৃতির নিম্ন শ্রেণীর আত্মা। নিত্যরঞ্জন একটু স্থির হলে, ক্রমে নিত্যরঞ্জনের উপর ভারপ্রাপ্ত আত্মা বলা শুরু করল তাঁর জীবন কাহিনি। সে আত্মা স্বর্গীয় ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়ের। জীবদ্দশায় ভোলানাথ বাবু খুব সুবিধের লোক ছিলেন না। তাই মৃত্যুর পর তার আত্মা নিম্ন শ্রেণীর আত্মা রূপে প্রেতযোনি প্রাপ্ত হয়েছে। এই প্রেত চক্রে ভুল ক্রমে এসে পড়েছেন তিনি। ব্যাপারটা তখনকার মতো মিটলেও ভোলানাথ বাবুর আত্মা সহজে পিছু ছাড়ল না। মাঝে মাঝেই তিনি হাজির হন প্রেত চক্রে। কিন্তু প্রেত চক্রে উপস্থিত মহৎ হৃদয়ের মানুষদের সংস্পর্শে, ক্রমে তাঁর মতি বদলাল। চক্রে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে দিব্যি তিনি গল্প জুড়ে দেন। প্যারীচাঁদ বাবুরাও মাঝেমধ্যে তাঁকে ব্রাহ্মসঙ্গীত গেয়ে শোনান। তাতে ভোলানাথের আত্মার উন্নতি সাধন হয়। ক্রমে তিনি উচ্চ শ্রেণীর আত্মায় পরিণত হন। যে ভোলানাথ জীবদ্দশায় মানুষ হিসেবে মোটে ভালো ছিলেন না, বিদেহী দশায় তিনি হয়ে ওঠেন পরোপকারী। চক্রে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ বা তাঁর পরিবারের কেউ কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে ভোলানাথ দিব্যি তাঁকে সুস্থ করে দেন। একবার শিশির কুমার ঘোষ কঠিন কলেরায় আক্রান্ত হলেন। ভোলানাথের আত্মা তাঁকে সুস্থ করে তুললেন। আরেকবার প্রেত চক্রে এক দুষ্টু আত্মা খুব জ্বালাতন শুরু করল। ভোলানাথের আত্মা তাঁকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করল। এভাবেই ভোলানাথের আত্মা হয়ে উঠল প্যারীবাবুদের চক্রের অবিচ্ছিন্ন অতিথি। রাজকৃষ্ণ মিত্র তাঁর পরলোক চর্চার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে রচনা করলেন ‘শোক বিজয়’। আর সে বই উৎসর্গ করলেন বিদেহী ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়কে।

Recent Comments:

Leave a Comment: