• ২৯ বৈশাখ ১৪২৮, বৃহস্পতিবার
  • 13 May 2021, Thursday
অনন্তের আহ্বান ছবি: ইন্টারনেট

অনন্তের আহ্বান

গৌরব বিশ্বাস

Updated On: 01 May 2021 12:15 am

আটত্রিশ পর্ব  


যে সময়ের কথা বলতে বসেছি, এ বাংলায় তখন বোমা বারুদের যুগ। বাংলার বাতাসের বারুদের গন্ধ। বাংলার বিপ্লবীরা একজোট হয়েছেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে। এ শহরের বুকে গোপনে গড়ে উঠেছে বিল্পবীদের আস্তানা। গোপনে চলছে সাহেব নিধনের কৌশল। 

১৯০৮ সাল। ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকীর উপর দায়িত্ব পড়ল কিংসফোর্ড নিধনের। ব্রিটিশ সরকার আন্দাজ করেছিলেন, কিংসফোর্ডের প্রাণহানির শঙ্কা আছে। তাই তাঁকে বদলি করে দেওয়া হল বিহারের মজঃফরপুরে। বাংলার বিপ্লবীদের হাত থেকে বাঁচা ওত সহজ নয়। বারিন ঘোষ ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকীকে পাঠালেন মজঃফরপুরে। দুজনের সঙ্গে রিভলবার আর উল্লাসকর দত্তের হাতে গড়া বোম।

মজঃফরপুর পৌঁছে দুজনে কয়েকদিন রেইকি করে নিলেন কিংসফোর্ডের আবাসস্থল। নজরে রাখলেন সাহেবের গতিবিধি। তারপর এল সেই দিন। ৩০ এপ্রিল। এই সন্ধ্যায় সাহেবকে নিকেশ করতে হবে। কিংসফোর্ডের বাড়ির সামনে এক গাছের পিছনে দুজনে লুকিয়ে রইলেন। ক্ষুদিরামরা জানেন সাহেব রাত সাড়ে আটটা নাগাদ সাহেবের ঘোড়ার গাড়ি এই পথ ধরে ফেরে। সেই মুহূর্তেরই প্রতীক্ষা। নির্দিষ্ট সময়েই একটা ঘোড়ার গাড়িকে আসতে দেখা গেল। ক্ষুদিরাম আর দেরি না করে ছুড়লেন বোম। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ। কিন্তু বিপ্লবীদের দুর্ভাগ্য। সে গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না। ছিলেন মিসেস কেনেডি ও তাঁর কন্যা। তাঁরা মারা পড়লেন। ঠিক একই ধরনের ঘোড়ার গাড়িতে কিংসফোর্ড আসছিলেন পিছনেই। সৌভাগ্যবশত বেঁচে গেলেন কিংসফোর্ড। এ ঘটনা তো আমরা প্রায় প্রত্যেকেই ইতিহাস বইতে পড়েছি। 


ক্ষুদিরাম তো ধরা পড়লেন। প্রফুল্ল চাকী আত্মহত্যা করলেন। ব্রিটিশ সরকার জানত, এত বড় ষড়যন্ত্র শুধুমাত্র দুই বিপ্লবীর কাজ নয়। এর পিছনে গোটা একটি বিপ্লবী দল রয়েছে। এত গুলি বন্দুক বা বারুদের জোগানই বা হচ্ছে কোথা থেকে? 

পয়লা মে। ক্ষুদিরাম প্রফুল্ল চাকীর নিষ্ফল প্রয়াসের ঠিক পরের দিন। আশ্চর্যজনক, এই ধারাবাহিকের এই পর্বটি এই তারিখেই লিখছি। অদ্ভুত এক শিহরণ জাগছে। এই দিনই কলকাতায় বসে অরবিন্দ ঘোষ খবর পেলেন মজঃফরপুরের কাণ্ডের। অরবিন্দ লিখছেন, "১৯০৮ সনের শুক্রবার ১ মে আমি 'বন্দেমাতরম্' অফিসে বসিয়াছিলাম, তখন শ্রীযুক্ত শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী আমার হাতে মজঃফরপুরের একটি টেলিগ্রাম দিলেন। পড়িয়া দেখিলাম মজঃফরপুরে বোমা ফাতিয়াছে, দুটী য়ুরোপীয়ান স্ত্রীলোক হত। সেদিনের 'এম্পায়ার' কাগজে আরও পড়িলাম, পুলিশ কমিশনার বলিয়াছেন আমরা জানি কে কে এই হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত এবং তাহারা শীঘ্র গ্রেপ্তার হইবে। জানিতাম না তখনও যে আমি এই সন্দেহের মুখ্য লক্ষ্যস্থল, আমিই পুলিসের বিবেচনায় প্রধান হত্যাকারী, রাষ্ট্রবিপ্লবপ্রয়াসী যুবকদলের মন্ত্রদাতা ও গুপ্ত নেতা"।


পরের দিন অর্থাৎ ২ মে ভোরবেলা কলকাতার ৪২ গ্রে স্ট্রীটের বাড়ি থেকে অরবিন্দ গ্রেপ্তার হলেন। সেই দিনই কলকাতার ৩২ নম্বর মুরারিপুকুরের বাড়ি রেইড করে ব্রিটিশ পুলিশ প্রচুর বোম বানাবার, আগ্নেয়াস্ত্র বানাবার সরঞ্জাম উদ্ধার করল। গ্রেপ্তার হলেন বারীন ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত ও অন্যান্য বিপ্লবীরা।

৩ মে মোকামা স্টেশনে ধরা পড়ার আগেই আত্মহত্যা করলেন। 

এদিকে কলকাতা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া অরবিন্দ সহ অন্যান্য বিপ্লবীদের ঠাঁই হল আলিপুর জেলে। সেসময় আলিপুর কোর্টের সেসন জাজ ছিলেন বীচক্রফট। বীচক্রফট আর অরবিন্দ দুজনে একই সঙ্গে সিভিল সার্ভিস পাশ করেছিলেন। পরীক্ষায়  বীচক্রফটের উপরে  স্থান পেয়েছিলেন অরবিন্দ।  এই  বীচক্রফটের এজলাসেই  উঠল এ মামলা। শুরু হল 'আলিপুর বোমা মামলা'। অরবিন্দদের পক্ষে নিয়োজিত হলেন সেসময়কার বিখ্যাত ব্যারিস্টার ব্যোমকেশ চক্রবর্তী। মামলা চলতে থাকল। 

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস সেসময় থাকেন কলকাতার রসা রোডে। এই মামলার সঙ্গে তখনও তাঁর কোনোরকম সম্পর্ক নেই। কিন্তু তিনি তো স্বদেশ প্রেমী। দেশবন্ধু। নানান ভাবে বিভিন্ন সময়ে বিপ্লবীদের পরোক্ষ ভাবে সাহায্য করেছেন। তাই  এ মামলা নিয়ে নিয়মিত খোঁজখবর নেন। মামলার ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিচলিত হয়ে পড়েন। কী হবে মামলার ফল? এই অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতেই এক সন্ধ্যায় আশ্চর্য কাণ্ড করলেন চিত্তরঞ্জন। রসা রোডের বাড়িতেই সেই সন্ধ্যায় প্রেত চক্রের আসর বসালেন। চক্রে প্রেতকে বরং এ মামলার ফলাফল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। তবে চিত্তরঞ্জনের এমন সিদ্ধান্ত কিন্তু হঠাৎ খামখেয়ালি নয়। সেসময় বেশ কিছুদিন নিরবিচ্ছিন্ন পরলোকচর্চায় মেতে ছিলেন চিত্তরঞ্জন।  চিত্তরঞ্জন কন্যা অপর্ণা দেবী লিখছেন,  'এই সময় তিনি খুব পরলোক তত্ত্ব আলোচনা করতেন, এবং প্রায়ই রাত্রে আমাদের রসা রোডের বাড়ীতে আত্মা আনয়ণ করবার জন্যে চক্রে বসতেন। আমরা ছেলেমেয়েরা ঘুরে ফিরে এদরজা ওদরজা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারতাম।'


সেই সন্ধ্যাতেও চিত্তরঞ্জন আয়োজন করলেন প্রেত বৈঠকের। কলকাতার রসা রোডের বাড়িতেই। সমকালীন থ্যাকার্স ডিরেক্টরি খুঁজলে দেখা যাবে,  ১৪৮ নম্বর রসা রোডে থাকতেন ব্যারিস্টার-ইন-ল চিত্তরঞ্জন দাস।

এ বাড়ি এখনও আছে কিনা পাঠক-পাঠিকারা খুঁজে দেখতে পারেন। 

যাই হোক, চক্রের আয়োজন তো করা হল। কিন্তু ডাকা হবে কাকে? প্রাসঙ্গিক পরলোকগত ব্যক্তির আনয়ন করাই নিয়ম। ডাকা হল সদ্য প্রয়াত ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়কে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের আত্মা হাজির হলেন চক্রে। চিত্তরঞ্জন  অরবিন্দের মামলার ব্যাপারে ব্রহ্মবান্ধবের আত্মাকে জিজ্ঞেস করলেন। প্ল্যানচেট বোর্ডের পেনসিলে খসখস করে লেখা ফুটে উঠল,  'you must defend Aurobindo'.


চিত্তরঞ্জন উত্তেজিত। ব্যারিস্টার বি. সি. চ্যাটার্জিকে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, 'তুমি দেখে নিও বিজয়, এ মামলা আমার কাছে আসবেই।' পরলোকতত্ত্বের প্রতি এতটাই তাঁর জোরালো বিশ্বাস! কিন্তু বাস্তবে কি তা সম্ভব?  প্রথম থেকেই এ মামলা লড়ার ইচ্ছে আছে চিত্তরঞ্জনের।  কিন্তু মামলা তো তখন লড়ছেন ব্যোমকেশ চক্রবর্তী। সে মামলা চিত্তরঞ্জনের হাতে কী করে আসবে?

কিন্তু  ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের আত্মার ভবিষ্যৎবাণী ভুল হওয়ার নয়। কিছুদিনের মধ্যে মামলা চিত্তরঞ্জনের কাছেই এল। মামলার জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন। অর্থ প্রায় নিঃশেষিত। তাই ব্যোমকেশ চক্রবর্তীর মতো ব্যারিস্টারকে নিয়োজিত রাখা আর সম্ভব হল না। তখন অরবিন্দের তরফ থেকে 'বন্দেমাতরম' এর কর্মীরা চিত্তরঞ্জনকে এ মামলার ভার গ্রহণের জন্য অনুরোধ করলেন। অরবিন্দ বলেছেন, 'আমার পক্ষ সমর্থনের যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল সহসা তা পরিবর্ত্তিত হয়ে গেল, দেখলাম আর একজন কাউন্সেল আমার পক্ষ সমর্থন করবার জন্যে দন্ডায়মান হয়েছেন। তিনি অপ্রত্যাশিত ভাবে এলেন, তিনি আমার একজন বন্ধু, কিন্তু আমি জানতাম না যে তিনি আসছেন। আপনারা সকলেই তাঁর নাম শুনেছেন, তিনি তাঁর অন্য সকল ভাবনা সরিয়ে ফেললেন, তাঁর সমস্ত প্র্যাকটিস পরিত্যাগ করলেন, তিনি আমাকে রক্ষা করবার জন্যে মাসের পর মাস ধরে অর্দ্ধরাত্রি বিনিদ্র কাটালেন, এবং নিজের স্বাস্থ্য ভঙ্গ করলেন,-তিনি শ্রীযুক্ত চিত্তরঞ্জন দাশ।' 

তারপরের ইতিহাস তো আমাদের সকলেরই জানা।


ঋণ স্বীকারঃ মানুষ চিত্তরঞ্জন, অপর্ণা দেবী


                    কারাকাহিনী , শ্রীঅরবিন্দ


(কোনোরকম কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেওয়া এই রচনার উদ্দেশ্য নয়। আশা করা যায়, পাঠক পাঠিকারাও সংস্কার মুক্ত মনে, শুধুমাত্র পাঠের আনন্দে এই রচনা পাঠ করবেন) 


 


 


 


 


                                              


Recent Comments:

Leave a Comment: