• ১ বৈশাখ ১৪২৮, বৃহস্পতিবার
  • 15 April 2021, Thursday
ananter-ahwan-epi-34

অনন্তের আহ্বান

গৌরব বিশ্বাস

Updated On: 04 Apr 2021 08:00 am

চৌত্রিশ পর্ব

 

এ শহরের অলি গলির ঠিকানায় কতসব আজব কাহিনি বন্দি থাকে! আমাদের আজকের কাহিনি এ শহরের খুব পরিচিত ঠিকানাকে ঘিরে। যে সন্ধের ঘটনার কথা বলতে বসেছি, তার বয়স একশো বছরেরও বেশি

কাহিনি শুরু করবার আগে এর কলাকুশলীদের সঙ্গে আগে আলাপ করিয়ে দিই। সেই সন্ধের ঘটনার মূল কলাকুশলী চারজন। সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, অধ্যাপক অজিত কুমার চক্রবর্তী এবং সতীশ চন্দ্র রায়। এছাড়াও আরো দুজন রয়েছেন, সাহিত্যিক চারু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। এ কাহিনিতে এদের ভূমিকা খুব বেশি নয়। এতজন কলাকুশলীর মধ্যে সকলেই রক্তমাংসের স্বাভাবিক মানুষ। বুকের বাঁ দিকটা ধুকপুক করে। এদের মধ্যে ব্যতিক্রম কেবল একজনই, সতীশ চন্দ্র রায়। তিনি কী তবে? পাবেন। যথা সময়ে উত্তর পাবেন।

সৌরীন্দ্রমোহন পেশায় উকিল, সেই সঙ্গে সাহিত্য সাধক। সৌরীন্দ্রমোহনের আরো একটি পরিচয় আছে। তিনি রবীন্দ্রসংগীত সাধিকা সুচিত্রা মিত্রের বাবা। মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় শিশু সাহিত্যিক। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জামাতা।  সৌরীন্দ্রমোহন, মণিলাল ও তাঁদের বন্ধু বান্ধবদের এই দলটি রবীন্দ্র বলয়ের মধ্যে থাকতেন। এঁরা রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ উভয়েরই স্নেহধন্য ছিলেন।

যে সময়ের ঘটনা বলতে বসেছি, স্বর্ণকুমারী দেবী তখন ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদনার ভার নিয়েছেন। সৌরীন্দ্রমোহন ‘ভারতী’র নানা কাজে স্বর্ণকুমারী দেবীকে সাহায্য করেন। হিসেব করতে গেলে, সময়টা ১৯১০-এর আশেপাশে।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, চারু বন্দ্যোপাধ্যায় এঁরা তখন সাহিত্য জগতে নাম পেয়েছেন।


মণিলাল তখন একটা প্রেস চালান। নাম, কান্তিক প্রেস। এই প্রেসকে ঘিরেই আমাদের ঘটনা। সেই সময় কান্তিক প্রেসের ঠিকানা ছিল ২০, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট। এখনকার বিধান সরণী। পরে কান্তিক প্রেস ২২ নম্বর সুকিয়া স্ট্রিটে উঠে যায়। সেই প্রসঙ্গ এখানে অপ্রাসঙ্গিক। আমাদের কাহিনি ২০, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট এই ঠিকানা ঘিরে। এ বাড়ির একতলার এক অংশে প্রেস, দোতলার দক্ষিণের বড় ঘরে মণিলালের অফিস।

এই অফিস ঘরেই সন্ধের পর জমত বন্ধুদের আড্ডা। বিশেষ করে সপ্তাহ অন্তে। সৌরীন্দ্রমোহন, মণিলাল, চারুচন্দ্র আর সত্যেন্দ্রনাথ মূলত এই চার জন। অজিত চক্রবর্তী তখন শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনা করেন। সবসময় তো এ আড্ডায় যোগ দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু যখন তিনি কলকাতায় থাকতেন, মাতিয়ে তুলতেন আড্ডা।

এক সন্ধেয় অজিত আড্ডা মারতে মারতে বললেন, আজকাল যেন থেকে থেকে মনে হয়, পৃথিবীর রূপ-রস-আলো সব ক্ষীণ হয়ে আসছে। মানুষের জীবন বড় অনিশ্চিত। কখন আছে, কখন নেই…

সকলে এই কথা শুনে মশকরা করলেন, সে কী হে! এই বয়সেই এমন ভাব! সন্ন্যাস নিচ্ছ নাকি?

কেউ জিজ্ঞেস করলেন, কবি (রবীন্দ্রনাথ)কে এসব কথা বলেছ?

অজিত মাথা নাড়লেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিলেন, না… বললে, তিনি ঠাট্টা করবেন।

আরো নানান কথায় কিছুটা সময় কাটল। অজিত হঠাৎ বললেন, আজ প্ল্যানচেট করলে কেমন হয়? আমার কিছু প্রশ্ন আছে। সেসব আমি আজ জিজ্ঞ্রেস করতে চাই।

এমন প্রস্তাবে সকলে চমকে উঠল। সৌরীন্দ্রমোহন, মণিলালদের এই বন্ধুদের দলটি শখের বশে পরলোক চর্চাও করত। মাঝে মধ্যে প্ল্যানচেটের আসরও বসান। কিন্তু তা বলে, ভর সন্ধেয় প্ল্যানচেটের প্রস্তাব!

কিন্তু অজিত নাছোড়বান্দা। তিনি ক্রমাগত পীড়াপিড়ি করতে থাকলেন। শেষ কালে প্ল্যানচেটের আয়োজন করা হল।

আয়োজন বিশেষ কিছু নয়। মণিলালের অফিসের আলমারিতে একটি প্ল্যানচেট বোর্ড ছিলই। সেটা বার করে, ঘরের আলো নিভিয়ে বসে গেলেন সবাই। কিন্তু কাকে ডাকা হবে?


ঠিক হল, সতীশচন্দ্র রায়কে ডাকা হোক। তরুণ সাহিত্যসেবী সতীশচন্দ্র তখন বছর কয়েক মারা গেছেন। তাঁর অকস্মাৎ প্রয়াণে রবীন্দ্রনাথ বড় আঘাত পেয়েছিলেন। সতীশচন্দ্র, অজিত কুমার চক্রবর্তী, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তেরও অন্তরঙ্গ বন্ধু। সুতরাং তাঁকেই ডাকা হোক। বেশি ডাকতে হল না। কিছুক্ষণ বাদেই প্ল্যানচেটে উপস্থিত হলেন সতীশচন্দ্রের আত্মা। দু-একটা প্রশ্ন করার পর, সতীশচন্দ্রর আত্মাকে জিজ্ঞেস করা হল, অজিতের মনের ভাব এমন কেন?

জবাব দিল সতীশচন্দ্রের আত্মা, জীবনের প্রতি নিঃস্পৃতা জেগেছে অজিতের। তাই এমন মনোভাব। অজিতের আয়ু বড়জোর সাত-আট বছর। এই আসরে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে সবার আগে ইহলোকের মায়া কাটাবে অজিত।

আতঙ্কের একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল সবার মধ্যে। আর অজিত চক্রবর্তীর মনের ভাব সহজেই অনুমেয়। প্ল্যানচেটের চক্র তাড়াতাড়ি ভেঙে দেওয়া হল। ঘরের পরিবেশ থমথমে। গুমোট ভাবটা কাটাবার জন্য চারুচন্দ্র একটু জোর করে হেসে বললেন, ধুস, তোমাদের এসব কাজকারবারের কিছু বুঝি না বাপু। চলো চলো, সবাই ময়দানে হাওয়া খেয়ে আসি। কী যে সব তোমরা করো…

জীবনের কলকাকলির মাঝে সেই সন্ধের এ ঘটনা একসময় প্রায় সবাই ভুলেই গেল। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। কলকাতার ঘরে ঘরে তখন ইনফ্লুয়েঞ্জার বাড়বাড়ন্ত। অজিতও ইনফ্লুয়েঞ্জায় পড়লেন। এত বছর পর, বন্ধুদের মনে সেই সন্ধের কথা আবার খচখচ করতে লাগল। তবে কী… আশঙ্কা সত্যি হল। ইনফ্লুয়েঞ্জায় ভুগে মারা গেলেন অজিত চক্রবর্তী। তখন ১৯১৮ সাল। সেই সন্ধের আট বছর বাদে।



বিধান সরণি ধরে যারা প্রতিদিন যাতায়াত করেন, বিদ্যাসাগর কলেজের দিকে ট্রামরাস্তা ধরে হাঁটলে বাঁ হাতেই পড়বে ২০ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিট। এখন ২০ নম্বর বিধান সরণি। ওই ঠিকানায় এখন মেয়েদের স্কুল বসে, আর্য্যকন্যা মহাবিদ্যালয়।

 

ছবি: আর্য্যকন্যা মহাবিদ্যালয়, অজিত কুমার চক্রবর্তী, সতীশচন্দ্র রায়ের ছবি তুলেছেন লেখক

সমকালীন ক্যালকাটা ডিরেক্টরিতে ২০ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে কান্তিক প্রেসের উল্লেখ।

 

 

 

 

Recent Comments:

Leave a Comment: