• ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, শুক্রবার
  • 27 November 2020, Friday
মডেল?

মডেল?

ওয়েব ডেস্ক প্রতিনিধি

Updated On: 19 Nov 2020 11:36 pm

২০১৪-এর লোকসভা নির্বাচনে 'বিকাশ পুরুষ' হয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। গুজরাটের 'উন্নয়ন' নিয়ে বিজেপির চোখধাঁধানো, ঝটিকা প্রচারে সমানতালে সুর মিলিয়েছিলেন একশ্রেণির অর্থনীতিবিদ। সংবাদমাধ্যমের খবরে ও সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় ভরে উঠেছিল 'গুজরাট মডেল' এর উচ্চকিত কীর্তনে। তার মধ্যে কিছু সত্য ছিল বটে অর্ধসত্য--- যাকে মিথ্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর বলা হয়--- তা কিছু কম ছিল না। আজ স্বাধীন ভারতের প্রথম মন্দার দিনে, সেই অর্থনীতিবিদ এবং সম্পাদকীয় স্তম্ভের লেখকদের তেমন করে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ওই প্রবল মনমাতানো লেখায়, বক্তৃতায় যে সত্যটি হারিয়ে যায় তা হল, গুজরাটে শিল্পোন্নয়নের এক দীর্ঘ ইতিহাস আছে। তার সব কৃতিত্ব মোদীর নয়। দুই, গুজরাট আসলে নানা উন্নয়ন সূচকে একটি মধ্যমানের রাজ্য। কল-কারখানা, কৃষিজমিতে, স্বাস্থ্যে, সামাজিক প্রকল্পে বহু অন্ধকার ছড়িয়ে রয়েছে। 


বিগত একযুগ ধরে গুজরাতই একমাত্র রাজ্য যেখানে বিধিবদ্ধ সুরক্ষিত চাকরি বেশি বেশি করে কমছে। গ্রামীণ কিংবা শহরে শ্রমিকদের মজুরির হার ২০টি প্রধান রাজ্যের মধ্যে নীচের দিকের সারিতে। হিরে, পাওয়ার লুম, এমব্রয়ডারি, জরি নানা শিল্পে চলে আসছে কুখ্যাত চুক্তিপ্রথা। অসংগঠিত শিল্পের শ্রমিকরা সারা দেশেই কোনো আইন দ্বারাই সুরক্ষিত নন। কিন্তু, একটি 'মডেল' রাজ্যে কেন শ্রমিকরা চূড়ান্ত অবহেলার শিকার হবেন? অন্যদিকে, বৃহৎ শিল্পে পুঁজিনির্ভরতা ও সুদক্ষকর্মী, অত্যাধুনিক যন্ত্র, রোবট নির্ভরশীলতা এমন স্তরে পৌঁছেছে যে, শিল্পপতিরা অন্যান্য কাজে অধিকারহীন ঠিকা শ্রমিক নিয়োগের উপর জোর দিয়ে চলেছেন। তাঁদের মজুরি, বাসস্থান, কাজের সময় কোথাও কোনো সুষ্ঠু নিয়মনীতি নেই। এনএসএসও ২০১৭-১৮ অনুযায়ী গুজরাটে অসংগঠিত শ্রমিক হলেন মোট শ্রমিকের ৯৪ শতাংশ। দেশে প্রায় ৮০ শতাংশ।


এই উন্নয়নী মডেলটি কতটা ফাঁপা তা প্রমাণিত হয় বেশ কয়েকটি সমীক্ষায়। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে গুজরাট তার এসডিপির মাত্র ১ শতাংশ ব্যয় করে। টাকার হিসেবে মাথা পিছু ব্যয় ২,৩২৯ টাকা বা ৬.৩৮ টাকা। জেলা ও ব্লক স্তরে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পদ খালি। অঙ্গনওয়ারি, অন্তঃস্বত্ত্বা মহিলা, মিড ডে মিলের বরাদ্দের মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডেক্স বা শিশু উন্নয়ন সূচকে ২০০৫-০৬ সালে গুজরাট ছিল প্রধান ২০টি রাজ্যের মধ্যে ১৪তম। ২০১৩-১৪ সালে তা নেমে যায় ১৫তম স্থানে। মডেলই বটে। এখানেই শেষ নয়, মানব উন্নয়ন সূচকে, মাল্টি ডাইমেনশনাল পভার্টি ইন্ডেক্সে (এমপিআই), কম্পোজিট ডেভেলপমেন্ট ইন্ডেক্সে গুজরাটের স্থান নবম। আবার এই এমপিআই-এর পারফরমেন্স ইন্ডেক্সে--- যেখানে টানা কয়েক বছর সমীক্ষা করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের উন্নয়ন সূচক তৈরি হয়--- সেখানে গুজরাট নবম থেকে দ্বাদশে নেমে আসে।


সাম্প্রতিক বিহার নির্বাচনেও দেখা গিয়েছে, ১৫ বছরের বিজেপি-জেড(ইউ) এনডিএ সরকার চাকরি, স্বাস্থ্য, শিক্ষার প্রশ্নে কতটা ল্যাজেগোবরে হয়েছে। বিহারের একচুলের ব্যবধানে জয় এবং তথাকথিত গুজরাট মডেল নিয়ে উৎসাহিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলায় দারিদ্র্য, চাকরি, দুর্নীতি, গণতন্ত্র নির্বাচনের বিষয় হয়ে উঠতেই পারে তবে তার সঙ্গে অতি দরিদ্র বিহার কিংবা মধ্যমানের গুজরাতের সঙ্গে তুলনা হাস্যকর হবে। আর গণতন্ত্রের প্রশ্নে, একের পর এক গণহত্যা, সংসদে গা-জোয়ারি ভাবে কৃষি বিল পাশের কারিগররা কোন তাস খেলে তাও আগামী বিধানসভা নির্বাচনে দেখার বিষয় হয়ে উঠবে। গণতন্ত্র অবশ্যই গুজরাট কিংবা দিল্লির কাছে শিক্ষণীয় নয়।

Share via Whatsapp

Recent Comments:

Leave a Comment: