• ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, শুক্রবার
  • 27 November 2020, Friday
gonotontro-jindabaad ছবি: ইন্টারনেট

গণতন্ত্র জিন্দাবাদ

সোমক বসু

Updated On: 19 Nov 2020 11:36 pm

সালটা ১৯৬৮| মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় অ্যামফিথিয়েটারে প্রতি চার বছরের মতো এবারও ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশন বসেছে| উদ্দেশ্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির তরফ থেকে নতুন প্রেসিডেনশিয়াল ক্যান্ডিডেট মনোনীত করা যা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি লিন্ডন বি. জনসন চাইছেন না

উনি রি-ইলেকশন প্রত্যাহার করার দাবি রেখে নিজেকে প্রতিযোগিতার আসন থেকে সরিয়ে আনেন| ডেমোক্র্যাটিক দলের হুবার্ট হামফ্রী (সহ-রাষ্ট্রপতি এবং প্রাথমিক দাবিদার) এবং ইউজিন মেককার্থি ও জর্জ মেকগভার্ন এর মধ্যে চলল নির্বাচনের লড়াই| সহ-রাষ্ট্রপতির আসনেও প্রাথমিক দাবিদার ছিলেন হুবার্টের সহযোদ্ধা এডমন্ড মাস্কি|

সেনেটর রবার্ট কেনেডির মৃত্যু, মার্টিন লুথার কিংয়ের হত্যা, ঘটমান ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিবিধ কারণে বিপর্যস্ত দেশের পরিস্থিতির কারণেই জনসনের এমন অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত এবং তার মধ্যে দেশজুড়ে চলছে যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ মিছিল ও জনসভা|

ঠিক এরকমই একটি অহিংস জনসভা বসেছিল কনভেনশান সেন্টারে যাতে হাজারে হাজারে মানুষ যোগদান করেছিলেন এবং তার মধ্যে সর্বাধিক ছিল কলেজ পড়ুয়া|  কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ক্রমে এই অহিংস জনসভা পরিণত হয় উদাম এক রণভূমিতে| তৎকালীন নগরাধ্যক্ষ রিচার্ড ডেইলি তাঁর ল-অ্যান্ড-অর্ডার এর অধিকার প্রয়োগ করে বেটন-বাহক, কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপকারী রাষ্ট্রসুরক্ষা বাহিনী নামিয়ে দিলেন| পরিসংখ্যান বলে এতে নিযুক্ত ছিলেন প্রায় ১২,০০০ শিকাগো পুলিশ অফিসার, ৫৬০০ ইলিনয় (শিকাগো যার অধীনস্থ) ন্যাশনাল গার্ড আর অবিশ্বাস্য হলেও ৫০০০ ইউ. এস. আর্মি সৈনিক|

১২ মাস পর আইনি ট্রায়ালে ৮ জন অভিযুক্ত রইলেন সংঘবদ্ধ এবং তাঁদের আইনজীবী হিসেবে উপস্থাপন করেন উইলিয়াম কানস্টলার এবং তাঁর সহযোগী লেনার্ড ওয়াইনগ্লাস| ৮ জন অভিযুক্তের মধ্যে ৭ জন ছিলেন কাউন্টারকালচার অ্যাকটিভিস্ট অ্যাবি হফম্যান, জেরি রুবিন, ১৫০ প্রতিষ্ঠানকে ঐক্যবদ্ধ করা একটি যুদ্ধবিরোধী লিবারাল সংস্থাপন এস. বি. এস এর প্রতিষ্ঠাতাদ্বয় টম হেডেন এবং রেনি ডেভিস, যুদ্ধ উপসংহারী একটি মোবিলাইজেশন প্রতিষ্ঠানের দলপতি ডেভিড ডেলিঞ্জার, অধ্যাপকদ্বয় জন ফ্রয়েন্স এবং লি উইনার যাঁরা অভিযুক্ত ছিলেন শিকাগোর সমস্ত ঘটনাটির পরিকল্পনার প্রেক্ষিতে কিন্তু আসলে এঁদের বিরুদ্ধাচরণ করা হয়েছিল বাকি সকল শিক্ষাবিদদের সাবধান করার জন্য|

ববি সীল ছিলেন শিকাগো প্যান্থার্সের মুখ্য সচিব, যেটি একটি বর্ণ-বৈষম্য নিয়ে বিরোধরত সংস্থা যতই যুদ্ধ চলুক আর রাষ্ট্রসীমায় সৈনিকেরা প্রাণ হারাক, বর্ণবৈষম্য আমেরিকার সমাদৃত অনুশীলনই হয়ে থাকে|

সবকিছু পুনর্বিন্যস্ত করা যাক এবার| অ্যান্টি-ভিয়েতনাম হোক অ্যান্টি-CAA| মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার হোক ভারত সরকার| শিকাগো দাঙ্গা হোক দিল্লির দাঙ্গা| শিকাগো পুলিশিয় বর্বরতা হোক দিল্লি-পুলিশিয় বর্বরতা| শিকাগো 7 অর্থাৎ মুখ্য সাত অভিযুক্ত হোক জে. এন. ইউ ছাত্রনেতা| আর শেষমেশ বর্ণ-বৈষম্যের প্রতি আনুকূল্য সাদৃশ্য টানুক ধর্ম-বৈষম্যের স্বেচ্ছাচারিতায়| আমেরিকায় এই চিত্রনাট্যের সেরকম অবস্থান্তর হয়নি| আমরাও কি তবে এত লালসার পর আজ এক রকম আমেরিকা হয়ে উঠিনি?

পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার আরন সর্কিন (দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্কএর মতো এক অভূতপূর্ব চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকারও তিনি) সবসময় বলেন একটি সিনেমা অন্য যে কোনো কিছু হয়ে ওঠার আগে হবে প্রাসঙ্গিক আর সর্বোপরি গুরুর্ত্বপূর্ণ| বলা হয়, সর্কিন ২০০৭ সালেই এই চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন আর এটি পরিচালনা করার কথা ছিল পরম প্রতিভাবান স্টিভেন স্পিলবার্গের| কিন্তু ভাগ্যের ফেরে সর্কিনের নিজের হাতের পরিচালনার ছোঁয়াতেই ‘The Trial of Chicago 7’ এক বিস্ময়কর এবং পরিণত চলচ্চিত্রের রূপ পেল|

হেডেনের চরিত্রে এডি রেডমেইন এবং কানস্টলার এর চরিত্রে মার্ক রাইলান্সের মতো দুই চূড়ান্ত অভিজ্ঞ এবং প্রতিভাশীল অভিনেতার যথোপযোগী অভিনয় ছাড়াও যা সবচেয়ে বেশি টানে তা হল অ্যাবি হফম্যানের ভূমিকায় সাচা ব্যারন কোহেনের কাজ,  যা আজ অবধি সম্ভাব্য সেরা কাজ| আগামী অস্কারে পার্শ্বচরিত্রে জেতার তীব্র দাবিদার হয়ে থাকল এই অভিনয়টা| এক রোমহর্ষক দৃশ্যে যখন কাঠগড়ায় উপবিষ্ট কোহেন প্রসিকিউশনের আইনজীবী রিচার্ড সাল্টজের (যে ভূমিকায় সংক্ষিপ্তের মধ্যেও অসামান্য অভিনয় করে গেছেন জোসেফ গর্ডন-লিভাই) সঙ্গে ট্রায়ালে লিপ্ত, তখন তাঁর হাবভাব ও সংলাপ বলার ভঙ্গিমা দর্শকদের মুগ্ধ করে|

আজকের দিনে যা বহুলপ্রচলিত একটি বিষয় এবং জিজ্ঞাস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি কি নিজের সরকারকে নিয়ে অবজ্ঞা পুষে রেখেছেন, এই হুবহু প্রশ্নটিই যখন সাল্টজ, হফমানকে করেন তখন যে প্রত্যয়ের সঙ্গে কোহেন উত্তর দেন "I think the institutions of our democracy are wonderful things, that right now are populated by some terrible people." সেই নিদর্শন আগামী দিনেও নিজের চেতনা থেকে মুছে ফেলা দুরূহ| এর চেয়ে কূট এবং একইসঙ্গে প্রাসঙ্গিক উত্তর হয়তো হয় না|

ট্রায়ালের ৫২ বছর পর, এই সিনেমাটি আজও এটাই বর্তায় যে গণতন্ত্রের অঙ্গীভূত হওয়ার দরুণ জনসাধারণ কী চূড়ান্ত ক্ষমতার অধীন আর সেই ক্ষমতা কীভাবে প্রতিবাদের মাধ্যমে প্রদর্শন করে স্বৈরাচারী ক্ষমতাকে বিপর্যস্ত করা যায়, অবশেষে বিনাশও| রেনি ডেভিস স্মৃতিচারণ করে জানান যে কীভাবে তাঁরা ট্রায়াল চলাকালীন প্রতিদিন গড়ে ৩০ টা করে খুন হবার হুমকি পেতেন আর অবশেষে ১০ বছরের কারাগার ভোগের শাস্তিও, কিন্তু এত সবের মধ্যেও তাঁরা এক মুহূর্তের জন্য ভোলেননি তাঁরা কেবল একটা কারণেই সেখানে (ট্রায়ালে) উপস্থিত ছিলেন আর সেটা হল ভিয়েতনামের যুদ্ধের বিরুদ্ধাচার| তাই সরকার তাঁদের নয়, সরকারকেই তাঁরা ট্রায়ালে তুলেছেন একরকম|  ট্রায়ালের শেষে অভিযুক্তদের শাস্তি ঘোষণা করার পর তাঁদের পক্ষ থেকে কোনো ক্লোজিং স্টেটমেন্ট চাওয়া হলে তারপর যা হয়, সেটা দেখলে চোখে জল চলে আসে| সরকার আয়োজিত পলিটিকাল ট্রায়ালে হেরে গিয়েও সেদিন গণতন্ত্রই জিতেছিল| আর যতদিন প্রতিবাদের ভাষা উজ্জীবিত থাকবে, গণতন্ত্রই জিতবে|

Share via Whatsapp

Recent Comments:

Leave a Comment: