• ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮, শনিবার
  • 31 July 2021, Saturday
সেই ফুলের দল ছবি: ইন্টারনেট

সেই ফুলের দল

অভীক মুখোপাধ্যায়

Updated On: 16 Jul 2021 12:32 am

পর্ব: ৪৯

 

’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক জমিকে শক্ত করে তুলেছিল। তাঁর জনমোহিনী পদক্ষেপ তাঁর জনপ্রিয়তাকে বাড়িয়েই চলেছিল। লোকসভা নির্বাচনের জয় তো ছিলই। এই সবকিছু অটল বিহারী বাজপেয়ীকে দারুণ ভাবে প্রভাবিত করছিল। বছর তিন-চার ধরে যখন বাজপেয়ী নিজের হাতে জনসঙ্ঘের রাশ ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন এই সব পরিস্থিতি তাঁকে ক্রমাগত পুনর্বিচার করতে বাধ্য করছিল সঙ্ঘ আর জনসঙ্ঘের নীতিগুলোকে নিয়ে---- সঙ্ঘের আদর্শ আর জনসঙ্ঘের রাজনৈতিক বিজয়কে কি এক সেতুতে বাঁধা সম্ভব? তাঁর মনের মন্থনে যে সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসবে সেই সুতো ধরেই পরবর্তী তিন দশক ধরে হাঁটবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ।

১৯৭১ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরে একটি ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্রে সঙ্ঘের জনৈক স্বয়ংসেবকের একটি লেখা প্রকাশিত হল। হইচই পড়ে গেল সেই লেখাটিকে দেখার পর। বলা হয়েছিল, সঙ্ঘ আর জনসঙ্ঘের সামনের এখন দুটো পথ খোলা রয়েছে। তারা তাদের আদি নীতিতে অটল থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে সশক্ত বিরোধীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলটির ওপরে চাপ সৃষ্টি করা যাবে। অন্য পথ ধরতে হলে তাদের পুরোনো আদর্শের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে, তবেই ক্ষমতায় আসা সম্ভব।

কে লিখেছিলেন এই নিবন্ধ?

স্বয়ং অটল বিহারী বাজপেয়ীজি।

নাগপুর থেকে ডাক এল। অটলজিকে ডেকে পাঠালেন গুরুজি গোলওয়ালকর। নিজের মতের ব্যাখ্যা দিতে বলা হল। বাজপেয়ী বললেন যে, হিন্দুরা আদপে নরমপন্থী। কোনো কট্টরপন্থাকে তারা গ্রহণ করবে না। সঙ্ঘের বহু জন অটল বিহারীর কথার বিরোধ করলেন। এসব আলোচনার মধ্যে দুপুরের খাওয়া হল। ভোজন শেষ করে আবার পর্ব শুরু হল। গুরুজি বললেন, ‘আমি অটলজির সঙ্গে এ ব্যাপারে সহমত যে পুরোনো আদর্শ নিয়ে চলতে থাকলে ক্ষমতায় আসা কঠিন। কিন্তু একথাও বলব না যে, কখনোই ক্ষমতায় আশা সম্ভব হবে না।’ রাজনীতির জ্ঞানে ধনী গুরুজি ইংল্যান্ডের লেবার পার্টির প্রসঙ্গ টেনে আনলেন। স্পষ্ট উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে ছাড়লেন, কনজারভেটিভদের তৈরি করা ওয়েস্ট মিনিস্টার সিস্টেমেও কীভাবে তারা জয়ী হয়েছে। তবে সেই দিনে, সেই মুহূর্তে গুরুজি তথা সঙ্ঘ বাজপেয়ীর নেতৃত্বে আদর্শে ফেরবদল করে রাজনৈতিক বিজয়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছিলেন।


সম্ভবত বাজপেয়ীজির চিনে নেওয়া পথ ঠিকই ছিল। সেদিনের সেই অলিখিত চুক্তির ডানায় ভর করে পরের প্রায় তিরিশ বছর ধরে হিন্দুর রাজনৈতিক চিন্তা ও হিন্দুত্বের রাজনীতি সমান্তরাল ভাবে চললেও মিলেমিশে যাবে না। নীরবে এক অদ্ভুত মঝঝিম পন্থার জন্ম হল। হিন্দুত্বের রাজনীতি পার্টির ক্যাডারদের উদ্বুদ্ধ করবে, আর হিন্দুর রাজনৈতিক চিন্তা আনবে দলগত জয়। বহুবার রাজনৈতিক দল রূপে জনসঙ্ঘ কিংবা ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে সঙ্ঘ ও ভিএইচপি-এর মতানৈক্য ঘটবে, কিন্তু কখনোই রাজনৈতিক ফ্রন্টকে জলাঞ্জলি দিয়ে আদর্শের কট্টর খুঁটি আঁকড়ে ধরে থাকবেন না সঙ্ঘ বা ভিএইচপি-এর শীর্ষ নেতৃত্ব। অটল বিহারীর তর্ক মেনে চলতে চলতে এক সময় পদ্ম ফুটবে বটে, সেই পদ্ম মূর্ছাও যাবে। ২০০২ সালে আবার এক নতুন মহারথীর হাত ধরে ফিরে আসবে গুরুজি গোলওয়ালকরের বক্তব্যের শেষ পঙ্‌ক্তি, ‘...কিন্তু একথাও বলব না যে, কখনোই ক্ষমতায় আশা সম্ভব হবে না।’ গোধরা দাঙ্গা পরবর্তী বিধানসভা ভোটে জিতে গুজরাতের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রমাণ করে দেবেন গুরুজির বলা কথাও ভুল ছিল না।

*

ভবিষ্যতে যা হওয়ার তা হবে, আমরা ফিরে যাচ্ছি সেই ’৭১ সাল নাগাদ সময়টাতে। তখন গুরুজি যেহেতু অটল বিহারীর হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মিলিয়ে দিলেন, সেহেতু বলরাজ মাঢোকের বেশ রাগ জন্মাল। আগে থেকেই একটা দড়ি টানাটানি চলছিল। অটল বিহারী তদ্দিনে নিজের গুণমুগ্ধ ভাবশিষ্য আডবানিকে নিজের সঙ্গী করে তুলেছেন। মাঢোক এবার ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে চলে গেলেন।

গুরুজির কাছে মাঢোক নালিশ করলেন অটল বিহারীর জীবনের নারীসঙ্গ নিয়ে। গুরুজি স্পষ্ট বলে দিলেন, ‘আমি ওঁর দুর্বলতার ব্যাপারে সব জানি, কিন্তু একটা সংগঠন চালাতে গেলে সবাইকে নিয়ে চলতে হয়। প্রতিদিন ভগবান শিবের মতো হলাহল পান করতে হয় আমাকে।’

মাঢোকের অভিযোগ দিনে দিনে বেড়েই চলেছিল----  বাজপেয়ী কীভাবে তর্কে জিতে যাচ্ছেন? পাশাপাশি বেড়েই চলেছিল বাজপেয়ীর অনুগামীদের সংখ্যা। জটিল ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব তুলে ধরতে ভালোবাসা মাঢোকের তুলনায় সোজা ভাবে কথা বলা বাজপেয়ী অনেক বেশি মানুষের পছন্দের ব্যক্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন। দলের সকল শ্রেণীর মধ্যে এমনকী বিরোধী দলেও তাঁর একটা সর্বজনমান্য ছবি তৈরি হচ্ছিল। বাজপেয়ী জানতেন নিজেকে প্রেস-মিডিয়ার সামনে কীভাবে মেলে ধরতে হয়, আর সেটা একদমই পারতেন না বলরাজ মাঢোক। সঙ্ঘের যত পত্রপত্রিকা ছিল, তাদের সম্পাদকদের সঙ্গে সখ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় সঙ্ঘের যে কোনো অনুষ্ঠানে গেলে মিডিয়া কভারেজ নিয়ে বাজপেয়ীকে দুবার ভাবতে হত না।

অটল বিহারী বাজপেয়ী স্পটলাইটে থাকা পছন্দ করলেও নিজেকে দলগত রূপে মেলে ধরতে পছন্দ করতেন। অনেক সময় তাঁর সঙ্গে দলের মত মেলেনি, তিনি নীরব থেকেছেন। হিন্দুত্বের যে ধারা থেকে তিনি সুচারু পদ্ধতিতে সরে আসার কথা বলেছিলেন, তা কিন্তু ভোলেননি মোটেই। হিন্দু ফেভিকলের জন্যে তাঁর নীরবতা আরো গাঢ় বন্ধনী জুগিয়েছে। অযোধ্যা প্রসঙ্গে অকুস্থলে তাঁর অনুপস্থিতি যেমন তাঁর দূরত্ব মেনে চলাকে বোঝায়, তেমনি অযোধ্যায় বাবরি পতনের আগের দিন তাঁর দেওয়া বক্তব্যের ভিডিও ফুটেজ বুঝিয়ে দেয় তিনি হিন্দুত্ব-বিস্মৃত পুরুষ ছিলেন না। নরেন্দ্র মোদীজির গোধরা সামাল দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে একাধারে রাজধর্ম পালনের জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যের পরেও তিনি নরেন্দ্রকে বহিষ্কৃত করেননি।

মাঢোক যত অভিযোগ করছিলেন, তাঁর বন্ধুদের সংখ্যা তত কমছিল। সঙ্ঘ একতায় বিশ্বাস করে। মাঢোক একা হতে চেয়ে সেই ঐক্যে আঘাত হানছিলেন। সঙ্ঘের পরিকাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে যৌথ পরিবারের নীতির ওপরে। মাঢোকের একক মতবাদ সেই কাঠামোয় ঘুণ ধরিয়ে দিচ্ছিল। পরে এমন প্রশ্নও ওঠে যে, বলরাজ মাঢোক সম্ভবত সঙ্ঘের অফিসার্স ট্রেনিং ক্যাম্পের ত্রিস্তরীয় প্রশিক্ষণটাই সম্পূর্ণ করেননি।

মাঢোকের সঙ্গে সঙ্ঘ এবং জনসঙ্ঘ দুদিকেরই দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছিল। তিনি মনেপ্রাণে চাইছিলেন অটল বিহারীর প্রেসিডেন্সিয়াল টেনিওর শেষ হোক। রাজমাতা বিজয়ারাজে সিন্ধিয়া জনসঙ্ঘের হাল ধরুন। কোনো একটি অজানা কারণে তাঁর মনে এই বিশ্বাস দানা বেঁধেছিল যে সিন্ধিয়াদের রাজমাতা জনসঙ্ঘের মাথা হলে পরে তাঁর গুরুত্ব আবার ফিরে আসবে।

কিন্তু তুচ্ছ মানব ভাবে এক, বিধাতা করেন আরেক। ১৯৭৩ সালে জনসঙ্ঘের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে অটল বিহারীর বদলে উঠে এল লালকৃষ্ণ আডবানির নাম।


দিল্লি মেট্রোপলিট্যান কাউন্সিলের শীর্ষব্যক্তি রূপে কাজ করলেও দলে কিন্তু আডবানির চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ এবং নানা ক্ষেত্রে দক্ষ ব্যক্তিরা ছিলেন। আডবানি রাজ্যসভার সদস্য হতে পারেন, কিন্তু সংসদে মাঢোকের মতো প্রখর বক্তা হয়ে উঠতে পারেননি। জাতীয় ক্ষেত্রে নানাজি দেশমুখের মতো সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠেনি তাঁর। রাজমাতা সিন্ধিয়ার মতো জনগণের নেতা হওয়ার কোনো লক্ষণ তখনও ধরা পড়েনি তাঁর মধ্যে। তাঁর শান্ত, সমাহিত, সদা সতর্ক ভাবমূর্তি, এবং ক্রমশ পরিবর্ধমান ইন্দ্রলুপ্তসম্পন্ন মাথা দেখলে আর. কে. লক্সমণের সেই বিখ্যাত কার্টুন চরিত্রটিকে মনে পড়ে যায়, যে চরিত্রটি আমাদের সবার প্রতিনিধি। দ্য কমন ম্যান। সদা বিনীত এই মানুষটির বিনয়কে হয়তো মাঢোক দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করেছিলেন। আডবানিকে তিনি আক্রমণ করতে ছাড়েননি। বলেছিলেন, আডবানি মেরুদণ্ডহীন। তাঁর নিজের কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নেই, মতামত নেই।

(ক্রমশ)       

 

Recent Comments:

Leave a Comment: