• ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮, শনিবার
  • 31 July 2021, Saturday
সেই ফুলের দল ছবি: ইন্টারনেট

সেই ফুলের দল

অভীক মুখোপাধ্যায়

Updated On: 12 Jun 2021 07:32 pm

পর্ব-৪৪

 

১৯৬৫ সালের কথা। গুরুজি গোলওয়ালকর নাগপুর থেকে দিল্লিতে গেলেন। ঝাণ্ডেওয়ালাঁ-তে সঙ্ঘের দফতরে তাঁর নেতৃত্বে একটি মিটিং বসল। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ‘বাজপেয়ীর জীবনে নারী’ ---- মিসেস কৌলের ব্যাপারটাকে কীভাবে দেখা হবে। উত্তর প্রদেশে সঙ্ঘের প্রান্ত প্রচারক তখন ভাউসাহেব দেওরস। তিনি বললেন, ‘যদ্দিন লোক-জানাজানি না-হচ্ছে তদ্দিন ঠিক আছে।’ জনসঙ্ঘের খাজাঞ্চি তখন নানাজি দেশমুখ, তিনি আবার এই যুক্তি মানতে চাইলেন না, বললেন, ‘আমার মনে হয়, ও বরং রাজকুমারী কৌলকে বিয়ে করে নিক।’ পটনার একটি হোটেলে বসে নানাজি একথা আগেও অটলজিকে বলেছিলেন। আসলে নানাজি ঘটকালি করতে ভালোবাসতেন। প্রেমিক-প্রেমিকাদের মিলন ঘটিয়ে দেওয়ার শুভ কাজ তিনি আগেও একাধিক বার করেছেন। লোকে বলে, শত্রুঘ্ন সিনহা আর পুনমের বিয়েটা নানাজির কথায় ভিত্তি করেই এগিয়েছিল। রাজনীতির অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যায়, মধ্যপ্রদেশের এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতীয় জনতা পার্টির একজন প্রাক্তন সেক্রেটারির মধ্যে ঘনীভূত প্রেমের সম্পর্ককেও নানাজি পরিণতি দিতে চেয়েছিলেন, তবে সেই বারে তিনি সফল হননি। প্রেমে কিছু অন্তরায় ছিল। প্রেমী-যুগলের একজন কিঞ্চিৎ মানাভিমানেই সংসার জীবন থেকে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। গল্পটা আর এগোয়নি তাই।

ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নানা জনের বক্তব্য শোনার পর গুরুজি গোলওয়ালকর বাজপেয়ী-কৌল প্রসঙ্গে নিজের মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর মত ছিল, বাজপেয়ী যেন এ ধরনের সম্পর্ক থেকে সরে আসেন। বাজপেয়ীজি রাজি ছিলেন না। কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি গুরুজি। নিন্দুকে বলে, বাজপেয়ী ব্রাহ্মণ বলেই তিনি শাস্তি পাননি, একমাত্র ব্রাহ্মণরাই ব্রাহ্মণ্যবাদ ভাঙলে শাস্তি পায় না।

কিন্তু শাস্তি কি সত্যিই পাননি অটল বিহারী?

সঙ্ঘের মধ্যে তাঁর আসন নড়ে গিয়েছিল। উচ্চতম কোটির যে বলয় সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত, সেখান থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যে বাজপেয়ী সঙ্ঘের জন্যে জাতিবাদ ত্যাগ করেছিলেন, সেই সঙ্ঘ তাঁকে তাঁর সম্ভাব্য প্রেমের জন্যে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। ভয়ও নেই, ভরসাও নেই গোছের একটি সম্পর্কের সুতোয় ঝুলতে আরম্ভ করে দিল বাজপেয়ী-সঙ্ঘ বেরাদরি এবং সম্ভবত এখান থেকেই আরম্ভ হল রাজনৈতিক বাজপেয়ীর প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার কাহিনিটা। প্রতিষ্ঠান আর ব্যক্তির দড়ি টানাটানিতে প্রতিষ্ঠান সর্বদা এগিয়েই থাকে, কিন্তু এক্ষেত্রে একক মেধার জোরেই সঙ্ঘের সঙ্গে টানাপোড়েনে আজীবন স্পর্ধা দেখিয়ে যাবেন বাজপেয়ী। আসলে জন্ম-প্রেমিক বাজপেয়ীর কাছে প্রেমই সবকিছু ছিল।

দাঁও পর সব কুছ লগা হ্যায়,

রুক নহিঁ সকতে।

টুঁট সকতে হ্যায় মগর হম,

ঝুঁক নহিঁ সকতে।

 

তবে গুরুজির মনে শুধু বাজপেয়ীর প্রেম-প্রসঙ্গই ছিল এমনটাও নয়, তিনি হিন্দুত্বের লড়াইটাকে একটু অন্য আঙ্গিকে দেখতে চাইছিলেন। একদম জন্মলগ্ন থেকেই সাভারকর কিংবা ডক্টরজির হিন্দুত্বের নীতিতে ভর করে চলে আসছিল সঙ্ঘের নীতি। সঙ্ঘের নীতিতে বদল আনার প্রয়োজন অনুভব করছিলেন গুরুজি। এবার তিনি সঙ্ঘের গায়ে ভারতের সনাতন ধর্মের ছোঁয়া চাইছিলেন। গুরুজি নিজে রামকৃষ্ণ মিশনে দীক্ষিত হয়েছিলেন। সন্ত-সাধু-সন্ন্যাসীদের প্রতি তিনি স্বাভাবিক একটা আকর্ষণ অনুভব করতেন বরাবরই। হিন্দুত্বের রাজনীতিতে এবার তিনি হিন্দু সন্তদের আনতে চলেছিলেন।

১৯৬৪ সালের ২৯ আগস্ট। পোয়াই, বোম্বে। গুরুজির ডাকে সাড়া দিয়ে এসে উপস্থিত হলেন এক প্রাক্তন বিপ্লবী। প্রথম জীবনে তিনি সাংবাদিকতার কাজও করেছিলেন। পরবর্তী কালে প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুতে ব্যথিত হয়ে তিনি নির্মোহী হতে সন্ন্যাস নেন। একটি মিশনের স্থাপনা করেন। প্রাক্তন এই বিপ্লবী পুরুষের সন্ন্যাস জীবনের নাম স্বামী চিন্ময়ানন্দ, তাঁর মিশনকে সকলে চেনে চিন্ময় মিশন নামে। গুরুজি এবং স্বামী চিন্ময়ানন্দের সংকল্পে জন্ম নিল ওয়ার্ল্ড হিন্দু কাউন্সিল। হিন্দিতে তর্জমা করলে নামটা চেনা-চেনা ঠেকবে---- বিশ্ব হিন্দু পরিষদ।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ট্যাগলাইনে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হল, তুমি ধর্মকে রক্ষা করো, ধর্ম তোমাকে রক্ষা করবে---- ধর্ম রক্ষতি রক্ষিতঃ। মনু সংহিতা থেকে তুলে আনা এই পঙ্‌ক্তি আসলে শতধারায় বিভাজিত সনাতন ধর্মের সাধু-সন্ন্যাসী-মহাত্মাদের একজোট করার জন্যে ব্যবহার করা হয়েছিল। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, সাভারকরের নীতি থেকে সরে আসার একটা প্রচ্ছন্ন প্রয়াস দেখালেও তাঁর উপপাদ্য কিন্তু বহাল ছিল। সাভারকর ভারতভূমিতে জন্ম নেওয়া সকল ধর্মকে এবং সকল ধর্মধারীকে ভারতীয় বলতে চেয়েছিলেন। এক্ষেত্রেও তা-ই বলা হচ্ছিল। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ছাতার তলায় কেবলমাত্র সনাতন হিন্দু ধর্মই নয়, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ ধর্মকেও এনে ফেলা হল। জায়গা পেল না ইহুদি, ইসলাম কিংবা খ্রিস্ট-মত। আসলে ভারতজাত ধর্মগুলির মাথা সৃষ্টির প্রয়াসেই বি.হি.প-এর জন্ম হয়েছিল। ইহুদিদের জন্যে জেরুসালেম ছিল, ইসলামের জন্যে মক্কা ছিল, খ্রিস্টানদের জন্যে ভাটিকান। সঙ্ঘ বি.হি.প-এর মাধ্যমে হিন্দুদের ভাটিকান সৃষ্টি করতে চাইছিল।

বি.হি.প-এর পক্ষ থেকে সোচ্চার কণ্ঠে বলা হল, ‘আমরা ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য ও চিহ্নগুলিকে পুনরুদ্ধার করব।’ চিহ্ন অর্থে মন্দিরগুলির কথা বলা হয়েছিল। এই ভাষণ ধীরে –ধীরে আন্দোলনের রূপ নিতে থাকবে। প্রায় দুদশক ব্যাপী আন্দোলনের পরে দেখা দেবে রামজন্মভূমি নিয়ে প্রবল সংগ্রাম। তবে বি.হি.প-এর প্রাথমিক অ্যাজেন্ডায় ছিল গোহত্যা বন্ধ করতে হবে। বি.হি.প-এর আবির্ভাবের আগে থেকেই নীরবে একটা আন্দোলন চলছিল এই নিয়ে, কিন্তু তা ভরবেগ লাভ করল বি.হি.প আসার পরেই।

৭ নভেম্বর, ১৯৬৬। লালবাহাদুর শাস্ত্রীজির মৃত্যুর পরে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সংগঠিত নেতৃত্বে সংসদের উদ্দেশে একটি পদযাত্রা বেরোল। গোহত্যা বন্ধ করতে হবে। ভারতীয় জন সঙ্ঘ, আর.এস.এস, হিন্দু মহাসভা, আর্য সমাজ এবং সাধু-সন্নাস্যীদের জমায়েত দেখা দিল দিল্লিতে। সকাল থেকে আবহ উৎসবের মতো ছিল। এদিনের আন্দোলনের নেতা হিসেবে করপাত্রী মহারাজকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। তিনি ভাষণ শেষ করতেই মঞ্চে উঠলেন স্বামী রামেশ্বরানন্দ সরস্বতীইনি এক বর্ণময় চরিত্র আর্য সমাজের সন্ন্যাসী। স্বামীজির সন্ন্যাস ধারণের আগের জীবনের কথা কমই জানা যায়। তবে হায়দ্রাবাদে তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহী ছিলেন। পরবর্তী কালে অবশ্য গান্ধীবাদ থেকে সরে এসে তিনি চরমপন্থাকেই পছন্দ করেছেন। রাজনীতিতে আগ্রহী হয়েছেন সন্ন্যাস গ্রহণের পরেও। বেছে নিয়েছেন ভারতীয় জনসঙ্ঘকে। কারনাল থেকে লোকসভার সাংসদ নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে গিয়েছিলেন। ইনি কোনো বেতন, কোনো ভাতা কিংবা কোনো সরকারি সুবিধা নিতেন না। সরকার থেকে প্রাপ্ত সমস্ত অর্থ দান করে দিতেন ভারতের প্রতিরক্ষা কোষে। নিজে দিল্লির সীতারাম বাজারের আর্য সমাজের মন্দিরের একটি ঘরে থাকতেন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে সংসদে যেতেন। সরকারি ক্যান্টিনে কখনো খাননি। নিজের হাতে করে দুটো রুটি বানিয়ে নিয়ে যেতেন, সেই খাবারই খেতেন খিদে পেলে। একবার ইন্দিরা গান্ধী সমস্ত সাংসদদের একটি পাঁচতারা হোটেলে আমন্ত্রণ করেছিলেন। মহাভোজের আয়োজন। সকলে যখন বুফে টেবলের দিকে এগিয়ে গেলেন, তখন রামেশ্বরানন্দকে দেখে হতচকিত হয়ে গেলেন শ্রীমতী গান্ধী। স্বামীজি তখন নিজের সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া বাজরার রুটি খাবার জন্যে মাটিতে বসে পড়েছেন। শ্রীমতী গান্ধী বলেছিলেন, ‘এখানে সাংসদদের খাবার সমস্ত আয়োজন করা হয়েছে।’ স্বামীজির উত্তর ছিল, ‘এসব আমার জন্যে নয়। আমি বরং একটু আচার আর জল চেয়ে নিচ্ছি।’ ওই দিয়েই ক্ষুন্নিবৃত্তি করে হোটেলে আচার আর জলের দাম নিজেই মিটিয়ে দিয়েছিলেন মহারাজ।

স্বামীজি টানা কয়েকদিন ধরে সংসদে গোহত্যা বন্ধ করার আবেদন জানিয়ে এতটাই বিকট পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন যে তাঁকে দশ দিনের জন্যে সংসদ-হল থেকে নিলম্বিত করে দেওয়া হয়। প্রখর বক্তব্যে মঞ্চ কাঁপিয়ে দিলেন স্বামীজি। উগ্র কথার ধারে জনতা তখন ফুঁসছে। স্বামীজি বলছিলেন, ‘উনহে শিকসা দেনা হ্যায়!’ পার্লামেন্ট হাউজ বন্ধ করিয়ে দিয়ে উচিত শিক্ষা দেওয়ার এই মন্তব্য শুনে উৎসবের আবহ পালটে কেমন একটা যুদ্ধ-যুদ্ধ রূপ নিতে শুরু করে দিল। যেহেতু সর্বদলীয় গোরক্ষা মহা-অভিযান সমিতির ডাকে ভারতীয় জনসঙ্ঘের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে থেকে একজন মঞ্চে উঠে এসে জনগণকে শান্ত হওয়ার আপিল করলেন। ভদ্রলোক বরাবরই কথার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে বিশ্বাসী। কার কথা বলছি বলুন তো?

(ক্রমশ)       

      

 

Recent Comments:

Dipak Kumar 2021-06-12

অটল বিহারি বাজপেয়ী সংঘ্যের জন্যে জাতিবাদ ত্যাগ করেছিলেন মানে?

Leave a Comment: