• ৩০ বৈশাখ ১৪২৮, শুক্রবার
  • 14 May 2021, Friday
সেই ফুলের দল ছবি: ইন্টারনেট

সেই ফুলের দল

অভীক মুখোপাধ্যায়

Updated On: 01 May 2021 11:48 pm

পর্ব: ৩৯

ক’মাসের মধ্যে ৪০০ জন অভ্যাগতকে নিয়ে একটি মিটিং-এর ব্যবস্থা করা হল। তারিখ ছিল ২১ অক্টোবর, ১৯৫১। জন্ম নিল ‘ইন্ডিয়ান পিপল’স অর্গানাইজেশন’। এবার নামটার ভারতীয় সংস্করণখানা লিখছি, চেনার সুবিধে হবে একটু। ‘ভারতীয় জনসঙ্ঘ’। পার্টি ম্যানিফেস্টোতে বলা হল ‘ওয়ান কান্ট্রি’, ‘ওয়ান নেশন’, ‘ওয়ান কালচারের কথা’। আর বলা হল, ‘ধর্মরাজ্য নট থিওক্র্যাসি বাট রুল অব ল’। আর প্রতীক? একটি প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ। পার্টির প্রেসিডেন্ট শ্যামাপ্রসাদ বাবু প্রখর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রইলেন ভারতভাগের মতো বীভৎস সিদ্ধান্তের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাওয়া পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। হিন্দু মহাসভার প্রাক্তনী উন্মুক্ত মনে ঘোষণা করলেন, তাঁর হাতে তৈরি নতুন দল সকল ধর্মের মানুষের জন্যে নিজের দরজা খোলা রাখবে।

আর এস এস কখনও আলোয় আসতে চায়নি। রাজনৈতিক দিকে তো একেবারেই নয়। সঙ্ঘের পক্ষ থেকে তাই শ্যামাপ্রসাদ বাবুর অধিনায়কত্বে জনসঙ্ঘের অগ্রগতি নিয়ে কোনও আপত্তি ছিল না। সঙ্ঘ যেহেতু গান্ধী হত্যার পর নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়েছিল, তাই তাঁদের সমস্ত পদক্ষেপ ছিল মাপা। রাজনীতি না করেও রাজনীতিতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারার আজকের এই ক্ষমতার জন্ম ওখান থেকেই। এটাকেই কেউ বলবেন সিংহাসনের পেছনের রিমোট কন্ট্রোল, কেউ বলবেন মুখ আর মুখোশের যুগলবন্দী, কেউ বলবেন কৃষ্ণ এবং অর্জুনের জুটি। অর্জুনটি নাহয় শ্যামাপ্রসাদ বাবু হলেন, তাঁর সারথি, তাঁর কৃষ্ণ? তাঁর চালিকাশক্তি হয়ে সঙ্ঘের পক্ষ থেকে রাশ ধরলেন জনসঙ্ঘের নবনিযুক্ত, ক্ষমতাবান জেনারেল সেক্রেটারি শ্রী দীনদয়াল উপাধ্যায়। তাঁর চোখে একখানা কালো মোটা ফ্রেমের চশমা থাকত, এখন পরলে ওটাকেই বলা হত রেট্রো লুক। ঝকঝকে কাচের পেছনে তাঁর দুটি চোখে বুদ্ধির ঝিলিক খেলা করে যেত। বুদ্ধি আর যুক্তির অদ্ভুত মিশেলে ক্রমশ অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছিলেন দীনদয়ালজি। 

শ্যামাপ্রসাদ বাবু এবং দীনদয়ালজির মধ্যে একটা সাদৃশ্য ছিল। দুজনে যথাক্রমে ইংরেজি এবং হিন্দিতে ওজস্বী ভাষণ দিতে পারতেন। আবার মজার ব্যাপার হল মুখুজ্জে মশাই হিন্দিতে কাঁচা ছিলেন, আর দীনদয়াল উপাধ্যায়ের ইংরেজি নিয়ে সমস্যা ছিল। শ্রী উপাধ্যায় পরিচিতি পেতেও পছন্দ করতেন না, নীরবে কাজ করাটাই তাঁর পদ্ধতি ছিল। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের লেখার ক্ষমতাও ছিল অসামান্য, তবে নিজস্ব ধ্যানধারণা, চিন্তাভাবনার চেয়েও তিনি অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই লিখতেন বেশি এবং যে বিন্দুটির কথা না লিখলে তাঁর এবং তাঁর উত্তরসূরীদের কথাতে প্রবেশই করা যাবে না তা হল, তিনি রাজনৈতিক মেধা অন্বেষণে অদ্ভুত দক্ষ ছিলেন। শুধুমাত্র এই ক্ষমতাটাই দীনদয়াল উপাধ্যায়কে এত বছর পরের দীনদয়াল উপাধ্যায় হিসেবে স্মরণে রাখতে বাধ্য করে রেখেছে।

মুখোপাধ্যায়-উপাধ্যায়ের এই জুটি জনসঙ্ঘের মধ্যে অদ্ভুত একটি কাঠামোর জন্ম দেবে। মুখোপাধ্যায় হবেন ন্যারেটর, উপাধ্যায় হবেন স্ক্রিপ্টরাইটার। দলের কেন্দ্রীয় স্তরের এই ছাঁচ রাজ্যস্তরেও অনুসৃত হবে। জেনারেল সেক্রেটারির পরে থাকবেন দলের অর্গানাইজেশন সেক্রেটারি বা সংগঠন মন্ত্রী। এই জনসঙ্ঘ কালক্রমে ভারতীয় জনতা পার্টি হবে, কিন্তু ছাঁচ বদলাবে না। সংগঠন মন্ত্রীর পদ বরাবর অলংকৃত করতে থাকবেন কোনও না কোনও সঙ্ঘী।

শ্যামাপ্রসাদ বাবু যে কারণে হিন্দুমহাসভা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন তা মনে আছে নিশ্চয়ই। তিনি কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। হিন্দুত্ব তাঁর পরিচয় হতে পারে, কিন্তু অহিন্দুদেরও দলে স্বাগতম। উদ্বোধনী মঞ্চে হিন্দু দেবী-দেবতাদের ছবি থাকলেও, কোথাও ‘হিন্দু’ শব্দটির অস্তিত্ব রাখা হয়নি। এই জিনিসগুলো সঙ্ঘের সঙ্গে জনসঙ্ঘের দূরত্বও সৃষ্টি করেছিল। আস্তিক-নাস্তিকের মধ্যে যেমন বিভেদ থাকে, কতকটা তেমনই। কিন্তু ভেতরে যাই হোক না কেন, বাইরে এসবের ছাপ সঙ্ঘ বা জনসঙ্ঘ কেউই পড়তে দেয়নি। 

একটি রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ শত্রু হতে পারেন দু' ধরনের নেতারা। এক, যারা সদাসর্বদা আলোকবৃত্তে থাকতে পছন্দ করেন। তাঁরা নিজেদের ইগোকে স্যাটিসফাই করার জন্যে দলকে ভেঙে দিতে পারেন। এঁদের বক্তব্য হতে পারে, দলে থেকে কাজ করতে পারছি না এবং দুই, নীতিবাগীশ নেতা। যারা কোনও এক থুত্থুড়ে বুড়োর লিখে যাওয়া উপপাদ্যকে কপচিয়ে কপচিয়ে চুল সাদা করে ফেলেন। এ জাতীয় উপদ্রবে দল স্থবির হয়ে যায়। নিজস্ব নীতির জন্ম হয় না। জনসঙ্ঘের সৌভাগ্য যে মুখোপাধ্যায়-উপাধ্যায় এই দু' প্রকারের কোনটাই ছিলেন না। বাগ্মী মুখোপাধ্যায় নিজের ভাষণে বুঁদ করে রাখতেন সংসদের সদস্যদের, দৃঢ় চরিত্রের উপাধ্যায় নিজের ক্যাডারদের সঙ্ঘবদ্ধ করে রাখার মন্ত্রটা জানতেন। এগুলো যে সময়ের কথা, তখনও কিন্তু বাজপেয়ী আর আডবানির দেখা হয়নি। 

জনসঙ্ঘের জন্মদিবসের ঠিক চারদিন পরেই স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের প্রথম ভোটপর্ব আরম্ভ হল। একেবারে ব্রিটিশ স্টাইলের ইলেকশন হয়েছিল কিন্তু। দেশকে বিভিন্ন সংসদীয় ক্ষেত্রে বিভক্ত করে দেওয়া হল। প্রত্যেক দল সাংসদ হিসেবে নিজের সদস্যকে দিল্লিতে পাঠানোর জন্যে সুযোগ পেল। জনগণ যাকে বেছে নেবে, সে যাবে দিল্লি। হবে এম পি। যে দলের সাংসদ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে, সেই দলের মধ্যে থেকেই কাউকে বেছে নেওয়া হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, তিনি মন্ত্রীসভা গঠন করে দেশ চালাবেন। ১৭ কোটি ৬০ লক্ষ ভারতীয় ২,২৪,০০০ পোলিং বুথের মাধ্যমে ব্যালট পেপারে ভোট দিলেন। ৫৬,০০০ আধিকারিক, ২,৮০,০০০ সহায়ক এবং ২,২৪,০০০ পুলিশকর্মী ছিল।

মুখোপাধ্যায়-উপাধ্যায় জুটির কথা যেমন বলতেই হয়েছে, তেমনই অপর একটি জুটিকে ভুললে চলবে না। সেই জুটির একজন পার্লামেন্ট মাতিয়ে রাখতে জানতেন, অন্যজন দলীয় সংগঠনকে অক্সিজেন জোগাতেন। নেহরু-পটেল জুটি। তদ্দিনে পটেল চলে গিয়েছেন, কিন্তু পেছনে একটি সুন্দর এবং শক্তিশালী সংগঠন রেখে গিয়েছেন অবশ্য। দেশের মানুষ তখন নেহরুর হাতে ভারতকে গড়ে উঠতে দেখতে চাইছিল। বুদ্ধিমান শ্যামাপ্রসাদ তাই নিজের বক্তৃতায় নেহরুকে আক্রমণ করলেও, নেহরুভিয়ান মেইনস্ট্রিম থেকে সরলেন না। দেশের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে শ্যামাপ্রসাদ বিরোধ করেননি। হিন্দু কোড বিল নিয়ে ইচ্ছে পোষণ করলেও তার জন্যে কোনও জেদাজেদি ছিল না। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের এই অদ্ভুত প্রকৃতির রাজনৈতিক বিরোধীতার সুন্দর ছাপ পড়ে দেখা যাবে অপর একজনের মধ্যে। কে বলুন তো? আসছি, আসছি। তাঁর কথাতেই আসছি এবার। 

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় হিন্দিতে সড়গড় ছিলেন না। গোবলয়ে পার্টির ভিত মজবুত করতে গেলে দরকার ছিল হিন্দিতে প্রখর ভাষণ। দীনদয়াল উপাধ্যায় তখন জহুরির চোখ নিয়ে হিরে খুঁজতে লাগলেন। লোক চাই। এমন লোক চাই যে মুখোপাধ্যায় মশাইয়ের ভাষণগুলোর হিন্দি অনুবাদ করবে।

অনুবাদকের কাজটা ভারী মজার! কিঞ্চিৎ দুঃখেরও বটে। পরকায়াপ্রবেশের মতো। নিজেকে লেখার মধ্যে ঢেলে দিতে হয়, লেখাটাকে যেন কাঠ কাঠ না মনে হয়, আবার মূল লেখকের সমস্ত বক্তব্য যেন অটুট থাকে। অনুবাদ ভালো হলেও অনুবাদককে লোকে ভুলে যায়। শ্যামাপ্রসাদ বাবুর অনুবাদক হিসেবে উপাধ্যায়জি বেছে নিলেন সঙ্ঘের পত্রিকার তরুণ সম্পাদক অটলবিহারী বাজপেয়ীকে। ভারতের রাজনীতিতে সম্ভবত তিনিই অনুবাদকের সফল হওয়ার চূড়ান্ত নিদর্শন রেখেছিলেন। একজন অনুবাদক নিজস্ব মেধার ভিত্তিতে পরে প্রধানমন্ত্রী আসনে আসীন হবেন। আবার অটলজির রাজনৈতিক জীবনে তাঁর বক্তব্যের ইংরেজি অনুবাদকের কাজটা করবেন লালকৃষ্ণ আডবানিজি। পরে যেমন ইন্দিরা গান্ধীর তামিল ট্রান্সলেটর হবেন পি সি চিদাম্বরম, ইংরেজি অনুবাদক হবেন মার্গারেট আলভা। প্রত্যেকেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সাফল্য পাবেন। 

৫১-৫২ সালের ভোটের আগে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে উত্তর প্রদেশ চষে বেড়ালেন অটল বিহারী। এর বাইরেও দুজনে একসঙ্গে অনেক জায়গায় গেছেন। যেমন রাজস্থানের কোটায় প্রচারের জন্যে যেতে হল। জনসঙ্ঘের মেরুদণ্ড তখন আর এস এস। তাঁদের প্রচারকেদের শক্তিতেই বলীয়ান হয়ে জনসঙ্ঘ লড়তে নামছে। শ্যামাপ্রসাদ বাবুকে নিয়ে অটলজি যখন কোটায় গিয়ে নামলেন, তখন সেখানে তাঁর সঙ্গে এক যুবকের দেখা হল। ছেলেটির নাম লালকৃষ্ণ আডবানি। এই সেই প্রেক্ষাপট যেখানে ভারতেতিহাসের অপর এক কৃষ্ণ-অর্জুন জুটির সম্ভাবনা জন্ম নিল। আডবানি অবশ্য কখনোই নিজেকে অটলবিহারীর সমকক্ষ বা জুড়িদার বলে ভাবেননি, তাঁর চোখে প্রথম থেকেই অটলজি নায়ক ছিলেন, কবি ছিলেন। 


আর লালকৃষ্ণ? 


তিনি শুধুই অটলবিহারীর গুণমুগ্ধ ছিলেন।    

(ক্রমশ)

Recent Comments:

Leave a Comment: