• ১ বৈশাখ ১৪২৮, বৃহস্পতিবার
  • 15 April 2021, Thursday
sei-phooler-dol-epi-35 ছবি: ইন্টারনেট

সেই ফুলের দল

অভীক মুখোপাধ্যায়

Updated On: 03 Apr 2021 08:47 am

পর্ব: ৩৫

 

ব্রিটিশরা এদেশে ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে ঘোষণা করল, এই দেশ দ্বিখণ্ডিত হবে। মুসলিম লিগের দাবি এবং জিন্নাহর ক্ষুরধার ওকালতি মেনে মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলি নিয়ে গঠিত হবে পাকিস্তান। মুসলিম প্রধান অঞ্চলের মধ্যে পড়ছিল পঞ্জাব প্রদেশ আর বাংলা। রিয়াসতের রাজাদের বলা হল, আপনারা ইচ্ছেমতো দুটি দেশের যে কোনোটিতে যোগ দিতে পারেন, চাইলে স্বাধীন থাকার অধিকারও রয়েছে।

কোনো পক্ষই খুশি হতে পারল না। কংগ্রেস দেশভাগ চায়নি। জিন্নাহ এমন পোকায় খাওয়া পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেননি। যাই হোক, অনেক সাধাসাধির পরে ১৯৪৭ সালের ৯ জুন মুসলিম লিগের পক্ষ থেকে দেশভাগের এই পরিকল্পনা মেনে নেওয়া হল। কংগ্রেসও মানল, ঠিক ছ’দিন পরে।

দেশভাগের ড্রাফট যখন তৈরি হচ্ছে, তখন হিন্দু মহাসভার মতো রাজনৈতিক দল কিংবা সঙ্ঘের মতো সাংস্কৃতিক সংস্থার তরফ থেকে কোনো কথাই কেউ শোনেনি। ক্ষুব্ধ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সঙ্ঘের কাগজে লিখলেন, ‘আমরা আমাদের এই পবিত্র ভূমির একটা খণ্ড বিনাযুদ্ধেই হারাতে চলেছি। অ্যাংলো-মুসলিম লিগের চক্রান্তে দর কষাকষিতে হার মেনেছে কংগ্রেস, বিনা প্রতিরোধে আত্মসমর্পণ করেছে।’

৫ আগস্ট, ১৯৪৭। গুরুজি গোলওয়ালকর করাচিতে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তাঁকে রেলওয়ে স্টেশনে আনতে গিয়েছিলেন লালকৃষ্ণ আডবানি। গুরুজি করাচিতে সভা করলেন। এক লক্ষ হিন্দু শ্রোতা মুগ্ধ হয়ে তাঁকে শুনেছিল। ১০,০০০ স্বয়ংসেবক পদযাত্রায় অংশ নিল, দেশাত্মবোধক গানের তালে তালে পা মেলাল। নেতৃত্বে তরুণ আডবানি। এ-ই শুরু, এরপর আডবানির সাংগঠনিক ক্ষমতা নিয়ে আর প্রশ্ন উঠবে না দশকের পর দশক।

এর ঠিক ন’দিন পরে জন্ম নিল পাকিস্তান। রাজধানী হল করাচিতে। যারা পাকিস্তান চেয়েছিলেন, তাঁরা মণ্ডামিঠাই বিলোলেন। হিন্দুরা সেই মিষ্টি মুখে তুলল না। পরের দিন, ১৫ আগস্ট, ভারত স্বাধীন হল। বছর উনিশের আডবানি সেদিন অদৃষ্টকে দোষারোপ করেছিলেন মনে হয়, ‘হায় রে, পোড়া কপাল! পাঁচ বছর ধরে দেশের স্বাধীনতার জন্যে কত স্বপ্ন দেখেছি! আর আজ এমন দিন দেখালে?’ সম্ভবত তাঁর সিন্ধি আত্মাকে দু’ টুকরো করে দিয়েছিল ভারত-পাক সীমারেখা। আডবানি তাঁর পরের সত্তর বছর ধরে অনেক কিছু করবেন; সঙ্ঘের প্রচারক হবেন, রাজনৈতিক দল গঠন করবেন, সাংবাদিকতা করবেন, সরকারের অংশ হবেন, কিন্তু দেশভাগের প্রেত তাঁকে তাড়া করে বেড়াবে। মনে দাগ রয়ে যাবে।

এ তো গেল সীমান্তের ওদিকের ছেলেটির কথা। এপারে? বাজপেয়ী তখন কোথায়? খুব ব্যস্ত। নতুন জীবনে প্রবেশ করতে চলেছিলেন অটল। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট সঙ্ঘ একটি নতুন হিন্দি মাসিক পত্রিকা চালু করল। নাম ‘রাষ্ট্রধর্ম’। অফিস ছিল লখনউতে। ২২ বছরের অটল বিহারী হলেন সেই ম্যাগাজিনের প্রথম যুগ্ম-সম্পাদক। এরপরে তিনি ঢুকে পড়বেন সম্পাদনার কাজে। দফতর বদলে যাবে অবশ্য। তখন আর রাষ্ট্রধর্ম নয়, ‘পাঞ্চজন্য’র অফিসে বসবেন তিনি। ইত্যবসরে অটল সঙ্ঘের প্রথামাফিক সমস্ত সাংগঠনিক শিক্ষা শেষ করে ফেলেছিলেন। ইউনাইটেড প্রভিন্স বা অধুনা উত্তর প্রদেশের সীতাপুরে সঙ্ঘের প্রচারক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। কিন্তু প্রচারক রূপে যে ধরনের কষ্টের জীবন কাটাতে হয়, তার সঙ্গে কিছুতেই মানিয়ে উঠতে পারছিলেন না তিনি। অথচ এমন অমূল্য রত্নকে সঙ্ঘ হারাতেই বা চাইবে কেন? যুদ্ধক্ষেত্রে সব জওয়ান তো যুদ্ধ করে না, ডেস্কজবও তো থাকে রে বাবা! হিন্দি ভাষায় অসামান্য দক্ষ এই যুবককে তাই বলে দেওয়া হল, যাও তুমি জনসঞ্চারে সাহায্য করো। সঙ্ঘের জহুরিরা সেদিন হিরে চিনতে ভুল করেননি। শুধুমাত্র এই দক্ষতার ওপরে ভর করে পক্ষ আর বিপক্ষের লোকেদের নিজের কথার তারে অটল বিহারী খেলাবেন পরবর্তী ছয় দশক ধরে।

পাঞ্চজন্যের পাতায় কিন্তু দেশভাগের বিরুদ্ধেই লেখা চলছিল ক্রমাগত। মুসলিম লিগকে সুযোগসন্ধানী এবং লিগের অপকর্মে কংগ্রেসকে সম্মতিপ্রদানকারী বলা হচ্ছিল। দেশভাগের সমস্ত যুক্তিতর্ক অটল বিহারীর মাথায় ছিল। কিন্তু সীমান্ত থেকে ৮০০ কিলোমিটার ভেতরে বসে যেটুকু বোঝা যায় তা দিয়ে সংবাদপত্রের শিরোনাম লেখা গেলেও ত্রাসটাকে অনুভব করা সম্ভব ছিল না।

কোটি কোটি মানুষ বুঝতে পারছিলেন না কোনটা তাঁদের মুলুক হবে। কী হিন্দু, কী মুসলিম, কী শিখ সবাই তখন নতুন দেশের উদ্দেশে চলেছিল। পঞ্চাশ হাজার মুসলিম রমণী ধর্ষিতা হয়েছিলেন। হিন্দু আর শিখ নারীদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ছিল তেত্রিশ হাজার। হিসেবটায় ধর্ম ব্যতিরেকে শুধুমাত্র নারী রূপে বিবেচনা করলে সংখ্যাটা কোথায় দাঁড়াচ্ছে দেখুন, সুধী পাঠক। দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ মরেছিল দেশভাগের ফলে। আডবানি তখন নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে করাচি চষে বেড়াচ্ছেন। চাক্ষুষ করছেন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। চারিদিকে শুধুই শবের স্তপ।

সাধারণ জনগণের কাছে উন্নত ভারতের প্রতীক ছিল রেলগাড়ি। পঞ্জাব প্রদেশের একদিক থেকে অপরদিকে ট্রেনে চড়ে রিফিউজিরা যাচ্ছিল। যার যেখানে জোর বেশি, সে সেখানে ট্রেন দাঁড় করিয়ে সব শরণার্থীকে হত্যা করে লাশে বোঝাই ট্রেন পাঠাচ্ছিল। ট্রেন লক্ষ্যে পৌঁছচ্ছিল, নীরবে, মৃতদেহের ভার বইতে-বইতে।

তুলনামূলক ভাবে করাচির হিন্দুরা অনেকটাই সুরক্ষিত ছিল। তবে ঝড়ঝাপটা তাঁদেরও পোয়াতে হয়েছিল। অনেক হিন্দুর পরিবারই দেশভাগের পরেও বেশ কিছুটা সময় ওখানে থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু সময় আর সমাজ দুটোই তখন বড় অস্থির। নিরাপত্তার অভাব বোধটা ছিলই। এমনই একটি পরিবার ছিল জগতিয়ানিদের। তাঁরা ১৯৪৮ সালে ভারতে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। যেদিন চলে আসেন, সেদিন করাচিতে তাঁদের বাড়ির সামনে থাকা একটা গুরুদ্বারা জ্বালিয়ে দিচ্ছিল ধর্মান্ধ কিছু লোকজন। জগতিয়ানিদের বাড়ির মেয়েই একটা সময়ে লালকৃষ্ণর লক্ষ্মী ঠাকুর হয়ে উঠবেন। অত্যুক্তি ভাববেন না যেন। মেয়েটির নামও কমলা-ই ছিল।

জগতিয়ানিদের মতোই আডবানিরাও এদেশে চলে আসেন। শরণার্থী হিসেবে এলেও, আর্থিক ক্ষমতা একটু অন্যপ্রকারই ছিল। অবশ্য সিন্ধের ব্যবসায়ী পিতার আনুকূল্যে লালকৃষ্ণ করাচিতে যে ধরনের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ছিলেন, তাতে ছেদ পড়েছিল। প্রাসাদোপম বাড়িতে বাস করা এবং ঘোড়ায় টানা গাড়িতে বসা ছেলেটিকে সিন্ধু রিসেটেলমেন্ট কর্পোরেশনের বন্দোবস্তেই খুশি হতে হচ্ছিল তখন।

আডবানি ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লিতে চলে আসেন। ব্রিটিশ ওভারসিজ এয়ারোয়েজ করপোরেশনের ফ্লাইটে করে। বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত আডবানির কষ্ট হচ্ছিল ঠিকই, তবে ধাক্কাটা বেশি খেয়েছিলেন মনে। ঘরবাড়ি ছেড়ে আসা ছেলেটির কাছে নতুন পরিবার হয়ে উঠছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। মেকলেপুত্র আডবানির গোত্রান্তর হচ্ছিল, তিনি ভারতের ভূমিপুত্রে পরিণত হচ্ছিলেন।


ঠিক দু’ মাস পরে আডবানি চলে যাবেন বোম্বেতে। যে মানুষটার লেখা পড়ে তাঁর মনে চেতনার নবজাগরণ হয়েছিল, তাঁর সামনে গিয়ে বসবেন। ‘হিন্দুত্ব’ এবং ‘গ্রেট ওয়ার অব ইন্ডিপেন্ডেন্স’ পড়তে পড়তে সাভারকরের যে ছবি তাঁর মনে জন্ম নিয়েছিল, তারই পূর্ণত্ব প্রাপ্তি ঘটাবেন। সত্যজিৎ রায়ের প্রফেসর শঙ্কু সিরিজের গল্পের সেই নকুড়বাবুকে মনে পড়ে? ক্লেয়ারভয়েন্ট। আগেই বুঝতে পারতেন কী ঘটতে চলেছে। আমাদের লালকৃষ্ণর মনকাহিনির ক্লেয়ারভয়েন্ট হয়ে উঠেছিলেন শ্রী সাভারকর। কয়েক দশক ধরে সাভারকর কংগ্রেসের নীতির ভুল দিকগুলোকে তুলে ধরে যে ভবিষ্যৎবাণী করে চলেছিলেন, তা সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল দেশভাগের প্রকল্পে। সেদিন শিবাজী পার্কের বাড়িতে এক সংকল্পময় সন্ন্যাসীর সামনে বাধ্য শিষ্যের মতো বসে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন লালকৃষ্ণ। সাভারকর দেশভাগের পরে সিন্ধ প্রদেশে হিন্দুদের অবস্থা নিয়ে খোঁজখবর নিয়েছিলেন।

তবে সাভারকরের বিচক্ষণতা আডবানিকে স্পর্শ করলেও তাঁর র‍্যাডিক্যালিজম কিন্তু লালকৃষ্ণর মনকে ছুঁতে পারেনি। এত কষ্ট, এত দৈন্য, এত আঘাত দেখে অনেকেই হয়তো হাতে অস্ত্র তুলে নিতে পারত, আডবানি বেছে নিয়েছিলেন মৌনতা, সঙ্ঘের প্রতি নিষ্ঠা, অরাজনৈতিক চিন্তাধারা, এবং সামাজিক পরিবর্তনের সংকল্প। আর এই গুণগুলোই রাজনৈতিক আডবানির মধ্যেও দেখা যাবে, সেই আডবানি দু-দু’ বার প্রধানমন্ত্রীর আসনের খুব কাছে এসেও গদি স্পর্শ করতে পারবেন না, কিন্তু তাঁর মধ্যে কোনো ক্ষোভ থাকবে না, হিংসে থাকবে না।

রাজস্থানে সঙ্ঘের প্রচারকের ভূমিকায় দেখা যাবে আডবানিকে। যেসব শাখা আগে থেকেই চলছিল, সেগুলোর তত্ত্বাবধান এবং নতুন শাখার প্রতিষ্ঠা। শাখাগুলির নেতৃত্ব নির্বাচন, স্বায়ত্ত শাসনের কথা বোঝানো, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলিয়ে দিয়ে অর্থনৈতিক দিকগুলো খোলসা করে দেওয়া এসবই ছিল তাঁর কাজ। দেশজ উৎপাদনের কোয়ালিটি ইনস্পেক্টরের ভূমিকা পালন করছিলেন তিনি। গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন। চলছিলেন কখনো সাইকেলে চেপে, কখনো বাসে চড়ে, আবার কখনো বা উটের পিঠে বসে আর ওদিকে ভারত সরকার চলছিল।

ভারতের মসনদে তখন নেহরুজি। কংগ্রেসের পছন্দ ছিল সর্দার পটেলকে, আর নেহরুজিকে পছন্দ করেছিলেন গান্ধীজি স্বয়ং। গান্ধীজি একথাও বলে দিয়েছিলেন কংগ্রেস সরকারে থাকলেও ক্যাবিনেটে কিন্তু সব দলের প্রতিনিধিকে রাখতে হবে। তাই ক্যাবিনেটে আম্বেদকর ছিলেন, শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন।

দেশভাগের পরে যেসব মুসলিম ভারতে রয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা কিছুটা শঙ্কায় ভুগছিলেন। তখন তাঁরা সুরক্ষার জন্যে তাকাচ্ছিলেন কংগ্রেসের দিকে, মুসলিম লিগ তো জিন্নাহ সাহেবের সঙ্গে পাকিস্তানেই চলে গিয়েছিল। আরএসএস কিন্তু হিন্দুদের একত্রিত করার সুবর্ণ সুযোগ দেখল। ’৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে গুরুজি বললেন, অবশিষ্ট মুসলিমরাও এবার ভারত থেকে বিদায় নিলেই ভালো হয়। মহাত্মা গান্ধী অবশ্য রয়ে যাওয়া মুসলিমদের ভারতেই রাখার পক্ষে ছিলেন, আর কংগ্রেস তো ছিলই---- এমন সুরক্ষিত ভোট ব্যাঙ্ক কে-ই বা হারাতে চায়?

অসুরক্ষাই হোক বা অন্য কোনো কারণে, দেশভাগের পরেও এদেশ থেকে অনেক মুসলিম পরিবার পাকিস্তান চলে যাচ্ছিল এবং বহু হিন্দু এদেশে আসছিল। খেয়াল করুন, দুটোর যেটাই ঘটুক না কেন ভারতে হিন্দু পরিণত হচ্ছিল সুপার মেজরিটিতে। তার ফলে হিন্দু মহাসভার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক এবং সঙ্ঘের ক্ষেত্রে সামাজিক উচ্চতা ক্রমশ বৃদ্ধি হচ্ছিল। বলাই বাহুল্য যে, ‘হিন্দুত্ব’ নামক বীজটিকে বপন করার উপযুক্ত সময় এসে উপস্থিত হয়েছিল। কিন্তু বিধাতা যখন নিজের কলম চালান, তখন সমস্ত পরিকল্পনা তছনছ হয়ে যায়। হিন্দুত্বের চাষআবাদে জল ঢেলে দিল স্বাধীন ভারতের প্রথম রাজনৈতিক হত্যা। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি বিকেল ৫:১৭ তে গান্ধীজির বুকে তিনটে বুলেট দেগে দিয়ে গেল হিন্দু মহাসভার এক সদস্য নাথুরাম গডসে।

(ক্রমশ)     

    

 

     

    

 

Recent Comments:

Leave a Comment: