• ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭, বুধবার
  • 03 March 2021, Wednesday
sei-phooler-dol-epi-29 ছবি: ইন্টারনেট

সেই ফুলের দল

অভীক মুখোপাধ্যায়

Updated On: 20 Feb 2021 08:31 am

পর্ব: ২৯

 

এখন ভারতের রাজনীতি দুটি স্পষ্ট দিকে বিভক্ত। বিজেপি এবং অ-বিজেপি। স্বাভাবিক ভাবেই স্বীয় রাজনৈতিক দলগুলির অনুসারীদের মধ্যেও গড়ে উঠেছে সীমারেখা। ভক্ত এবং প্রতিভক্তের দল। ভারতীয় জনতা পার্টির পক্ষে থাকা লোকেরা বলে বিজেপি প্রখর রাষ্ট্রবাদী দল এবং বিপক্ষে থাকা প্রত্যেকের উক্তি হল বিজেপি উগ্র রাষ্ট্রবাদী। দুক্ষেত্রেই রাষ্ট্রবাদের উল্লেখ আছে, যে যার মতো করে ব্যবহার করছেন। সুবিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট আণ্ডারসন রাষ্ট্রবাদ-এর একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন---- ‘deep horizontal comradeship or imagined community, within territorial limits, and operating under a sovereign state.’ ভারতে যখন রাষ্ট্রবাদ জন্ম নিল, তখনকার প্রেক্ষিতে এই শব্দগুলোর, এই তিনটি বিন্দুর বিচার করলে কী দাঁড়ায়?

এই মুহূর্তে ভারতের রাষ্ট্রবাদিতা মানে হিন্দু রাষ্ট্রবাদ। তাহলে ‘ইমাজিনড কমিউনিটি’? অতি অবশ্যই সেখানে উঠে আসবে ‘আইডিয়া অব আ হিন্দু স্টেট’। হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণা।

আজকে নাহয় গুগল সার্চ করে কিংবা ট্রেনে–প্লেনে চড়ে ঘুরে আমরা বুঝে নিতে পারছি ভারত নামক দেশটির মানচিত্র কেমন, ভূপ্রকৃতি কেমন, কোথায় কী মেলে, লোকজনের খাদ্যাভ্যাস কী, বেশবাস কেমন ধারা। কিন্তু আজ থেকে ১০০, ২০০ কিংবা ৫০০–১০০০ বছর পিছিয়ে গেলে? সেই ভারতের এক প্রান্তের লোক কীভাবে জানত অন্য প্রান্তের মানুষের কথা? দেশের মানুষ নিজের দেশ ভারতবর্ষকে নিয়ে কী ভাবত, কোন ধারণা রাখত?

বিষ্ণু পুরাণে লেখা রয়েছে, ‘দক্ষিণে সাগর আর উত্তরে তুষারাবৃত পর্বতের মাঝে বিরাজ করছে ভারত নামক দেশ।’ কর্মের ভূমি ভারত, যেখানে মানুষ বিশ্বাস করে যে তাদের কর্মের ফল অনুসারে মৃত্যুর পরে তারা স্বর্গ কিংবা নরকে যাবে। ইহলোকে বসে চিন্তা করে পরলোকের। পাপ-পুণ্যের নিক্তিতে নিজেদের তুল্যমূল্য বিচার করার পরে তারা কৃতকর্মের পাপ ধুয়ে ফেলার চেষ্টাও করেছে অনবরত। তীর্থযাত্রা, তীর্থে স্নান তাদের মুক্তির আশ্বাস দিয়ে এসেছে সেই কোন সুদূর অতীত থেকেই। লোনা জলের সমুদ্র আর গৌরীগুরু হিমালয়ের মধ্যিখানের এই ভূমিকে তীর্থের বিন্দুগুলিই জুড়েছে। আগে মানুষ শখের ভ্রমণে বেরোত বলে তেমন কোনো লিখিত ইতিহাস মেলে না, কিন্তু তীর্থ অবশ্যই করত। দেশের এক প্রান্তের মানুষ অপর প্রান্তকে চিনত এভাবেই। বিবিধতার মধ্যে মহান মিলন গড়ে তোলার একমাত্র সেতু ছিল তীর্থগুলোই। শৈব, বৈষ্ণব, দেবী, দেবতা, কুলীন, কায়েত সব কিছু তীর্থে মিলে মিশে একাকার হতবহু অভ্যেস, আচার, বিচার, সংস্কার তীর্থ–তীর্থর কুম্ভীপাকে জন্ম দিয়েছে হিন্দু নামক শব্দের। জন্ম দিয়েছে হিন্দু নামক সংস্কৃতির। এভাবে হাজার–হাজার বিভেদের মধ্যে থেকে উঠে এল একটি ‘ইমাজিনড কমিউনিটি’। পারস্পরিক সহমর্মিতা জন্মানোর পর এই কমিউনিটির লোকজনের মধ্যে দেখা দিল একটা ‘হরাইজন্টাল কমরেডশিপ’। যখন এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অন্য কোনো বহিরাগত সংস্কৃতির যুদ্ধ হবে, তখন এই কমিউনিটির লোকজনই হবে একে অন্যের কমরেড বা সহযোদ্ধা। আশা করি, প্রথম বিন্দুর স্পষ্টীকরণ করতে পারলাম  

রাষ্ট্র ছিল। রাষ্ট্র থাকলেই সীমাও থাকবে, কিন্তু হিন্দু রাষ্ট্র ছিল না (আজও নেই)। হিন্দু রাষ্ট্রের কথা আগেই ব্যাখ্যা করেছি। কীভাবে রাজা শিবাজির আদর্শ গ্রহণ করে, একটু যোগবিয়োগ করে নিয়ে শ্রী সাভারকর নিজস্ব হিন্দুত্বের আইডিয়া তৈরি করবেন। কীভাবে রামরাজ্যের কনসেপ্ট গড়ে তোলা হবে।

এই সব কিছুই ধারণা হিসেবে ঠিক ছিল, কিন্তু অভাব ছিল বাইবেল কিংবা কোরানের মতো এমন কোনো পবিত্র গ্রন্থের, যা হিন্দু নামক ধর্মের (সংস্কৃতির) অবলম্বীদের এক সুতোয় বাঁধবে। অভাব বোধ করা হচ্ছিল ভাটিকানের মতো কোনো সংস্থার, যারা নিজেদের হাতে রাখবে ধর্মের রাশ।  

শ্রী সাভারকর নিয়ে যে ব্যক্তি যে মতোই রাখুন না কেন, একটি বিষয়ে প্রত্যেকে সহমত হবেন যে ভদ্রলোকের মেধার কোনো অভাব ছিল না। নিজের বক্তব্য দিয়ে অন্যকে প্রভাবিত করতে পারতেন খুব সহজেই। ১৯০৯ সালে তিনি যখন লন্ডনে, তখনই ১৮৫৭ সালের গদর নিয়ে অদ্ভুত বিশ্লেষণ লিখে ফেললেন। ব্রিটিশরা সুচতুর ভাবে এই পরাধীন ভারতের এই বিদ্রোহকে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ নাম দিল। যেন রাষ্ট্র থাকলেই তার সেনাবাহিনী থাকবে, আর সেনাবাহিনী থাকলেই তারা বিদ্রোহ করতেই পারে। সাধারণ ব্যাপার। শ্রী সাভারকর নিজস্ব বিচারবুদ্ধির নিরিখে এটাকেই বললেন ‘মহাবিদ্রোহ’---- ‘a conreted war of independence. মাজিনি নামক যে ব্যক্তি ইতালিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, তাঁর লেখার অনুবাদ করলেন। মাত্র বছর ছাব্বিশের সাভারকর ভারতবাসীকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যে, ভারতবাসীর পরাজয়ের কারণ হল তাদের মধ্যেকার অনৈক্য।

এরপরে সাভারকরকে দীর্ঘ সময় কারাবন্দি হয়ে থাকতে হয়েছিল। এই জেলপর্ব সাভারকরকে অনেকটা বদলে দেয়। সেখানে থাকাকালীন মুসলিমদের প্রতি তাঁর পৃথক একটি দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। স্বচক্ষে তথাকথিত নিম্নবর্ণের (জেলবন্দি) হিন্দুদের ইসলাম গ্রহণ দেখতে দেখতে তাঁর মনে শঙ্কা জন্মাচ্ছিল। উচ্চবর্ণের হিন্দু বন্দিরা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের বৈষম্যমূলক আচরণ করত, সেটাও প্রভাব ফেলেছিল শ্রী সাভারকরের মনে। তিনি ঐক্যের অভাব স্পষ্ট অনুভব করছিলেন। নিজের চিন্তাভাবনাগুলিকে তিনি নথিবদ্ধ করতে শুরু করলেন। একাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হল স্বনামে ও ছদ্মনামে। ভারতের রাজনীতিতে নতুন দিক আনতে তিনি একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখলেন। ইংরেজিতে। ‘এসেনশিয়ালস অব হিন্দুত্ব’। খেয়াল করার মতো বিষয় হল ইংরেজির ‘হিন্দুইজম’ থেকে সরে এসে তিনি একেবারে দেশজ একটি শব্দকে ইংরেজি অভিধানে ভরে দিচ্ছেন। এখানেই শুরু করলেন মস্তিস্ক নিয়ে খেলা। ‘এসেনশিয়ালস অব হিন্দুত্ব’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৩ সালে। তখন তিনি রত্নাগিরির জেলে বন্দি। জেল থেকে পাণ্ডুলিপি বাইরে পাচার করে ‘মারহাট্টা’ ছদ্মনামে ছাপা হয়েছিল। ১৯২৮ সালে পুস্তিকা আকারে পরিবর্ধিত হয়ে এল ওই একই লেখা। এবারে লেখার নাম বদলে গেল---- ‘হিন্দুত্ব: হু ইজ আ হিন্দু?’

শ্রী সাভারকর বলতে চাইলেন ধর্ম এবং জাতি ব্যতিরেকে ভারতবর্ষের সকল অধিবাসীই হিন্দু। তবে তিনি তাদেরই হিন্দুত্বের এই নতুন ধারণায় ঢোকালেন, যাদের পূর্বপুরুষের ভূমি ছিল ভারতবর্ষ। যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন। ইসলাম এবং খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারীদের জন্যে তাঁর হিন্দুত্ব খাপ খাচ্ছিল না। তাঁর মত ছিল মুসলিমরা মক্কার দিকে তাকিয়ে থাকেন, খ্রিস্টানদের দৃষ্টি থাকে রোমের দিকে, ইহুদিরা খোঁজেন জেরুসালেমের পবিত্র দেওয়ালটাকে। তাহলে ভূগোল দিয়ে বাঁধা ধর্মের ইতিহাসকে ভিত্তি করে একটি দেশের মধ্যে নব রাষ্ট্রবাদ গড়ে তুলতে সমস্যা কোথায়? শ্রী সাভারকরের বিপক্ষ তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে যত না বিদ্ধ করেছে, তার হাজার গুণ বেশি বার আক্রমণ করেছে তাঁর মৃত্যুর পরে। কিন্তু তাঁদের কাউকেই কেউ এই প্রতিপ্রশ্ন করেননি যে, প্রায় ওই একই সময়কালে ইহুদিরা নিজেদের দেশ খুঁজছিল, ব্রিটেনে বসে এক মুসলিম যুবক চৌধুরী রহমত আলি পাকিস্তান গঠনের স্বপ্ন দেখছিল, তাঁদের রাষ্ট্রবাদে কি কোনো সমস্যা ছিল না? সেক্ষেত্রে প্রশ্ন নেই কেন? পিতৃতন্ত্রের পিঠে ভর করে যদি কেউ ফাদারল্যান্ড, ধর্মের ভিত্তিতে যদি কেউ হোলিল্যান্ড খুঁজতে পারে, তাহলে ভারতমাতার মূর্তি মনে রেখে মাদারল্যান্ড প্রতিস্থায় সমস্যা কোথায়? ইতিহাসের পাঠক হিসেবে আমাদের মনে প্রশ্ন থাকাটা স্বাভাবিক। হয়তো কেউ–না–কেউ কোনো–না–কোনো দিন এসবের উত্তরও দিতে বসবেন।

ব্রিটিশ ভারতের প্রথম জেনারেল ইলেকশন হয়েছিল ১৯২০ সালে। তখন শ্রী সাভারকর জেলে বন্দি। তাঁর কাছে বাইরের সব খবরই যাচ্ছিল। তিনি নিজের প্রবন্ধ লেখার সময়ে ভারতের রাজনীতিকে মাথায় রেখেছিলেন। ১৯২২ সাল নাগাদ তাঁর প্রবন্ধের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিটির একটি কপি এক দেশস্থ ঋগবৈদিক ব্রাহ্মণ যুবকের হাতে এসে পড়ে। তীক্ষ্ণ মেধার সেই যুবক লেখাটি পড়ার পরে সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিক্ষোভ করলেই চলবে না, হিন্দুদের একত্রিত করতে গেলে, হিন্দু রাষ্ট্র গড়ে তুলতে গেলে, হিন্দু সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে গেলে সাংস্কৃতিক সংগঠন তৈরি করতে হবে।

যুবকের মনে আসলে ১৯২০ সালে নাগপুর দাঙ্গা চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে গিয়েছিল। যুবকের পরিবার কোনো একটি সময়ে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে নাগপুরে এসেছিল। নাগপুর মরাঠা প্রদেশের অন্যতম শহর। মরাঠি আর হিন্দিতে তুখোড় যুবক শিবাজী মহারাজ এবং বীর মরাঠাদেরকে নিজের আদর্শ বলে মনে করতেন। ছোটবেলায় নাগপুরের নীল সিটি হাইস্কুলে বন্দে মাতরম গাইবার অপরাধে তাঁকে স্কুল থেকে বিতাড়িত করা হয়। প্লেগে বাপ–মা হারানো ছেলেটির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন কংগ্রেসের বালাকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জে। তিনি ছেলেটির পড়ার দায়িত্ব নেন। পুণেতে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ শেষ হলে তাঁকে কলকাতায় পাঠান ডাক্তারি পড়ার জন্যে। কলকাতা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে এল এম এস পাশ করে যুবক ফিরে যায় নাগপুরে। লোকে তদ্দিনে তাঁকে ডক্টরজি বলতে শুরু করেছিল। বাংলায় থাকাকালীন তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেশাত্মবোধক লেখা পড়ে বিশেষ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। যোগ দিয়েছিলেন বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন সমিতিতেও। ব্রিটিশ পুলিশের ওপরে বোমা নিক্ষেপ করার অপরাধে তাঁকে গ্রেফতার করা হলেও উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে যান যুবক। বাংলা আর সেন্ট্রাল প্রভিন্সের বিপ্লবীদের মধ্যে তিনি যোগসূত্র স্থাপন করতেন সমানে। যতবার নাগপুরে যেতেন, ততবার অস্ত্র পাচার করতেন বিপ্লবী দলের হয়ে। এই সব গোপন মিশনের জন্যে ব্যবহার করা হত গুপ্ত সংকেত। অস্ত্রকে বলা হত ‘অ্যানাটমি’। সম্ভবত তিনি চিকিৎসক ছিলেন বলেই এ ধরনের নাম। এর পাশাপাশি সংগঠনের মধ্যে তাঁরও একটি কোডনেম ছিল। ‘কোকেইন’।


আর ভালো নাম?

হেডগেওয়ার ---- কে. বি. হেডগেওয়ার ---- কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার।

(ক্রমশ)              


Recent Comments:

Leave a Comment: