• ১৩ মাঘ ১৪২৭, বুধবার
  • 27 January 2021, Wednesday
Forasi Sugandha ছবি: ইন্টারনেট

ফরাসি সুগন্ধি

সুপর্ণা চ্যাটার্জী ঘোষাল

Updated On: 26 Nov 2020 11:42 pm


সিনেমা: পোর্ট্রেইট অফ আ লেডি অন ফায়ার (ফ্রেঞ্চ- Portrait de la jeune fille en feu)

 

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিক। ম্যারিয়েন নামের এক ফরাসি চিত্রশিল্পী আসে ব্রিটানি দ্বীপে। এখানে তাকে নিযুক্ত করা হয়েছে এলোইজ নামের এক মেয়ের ছবি আঁকার জন্য। সেই ছবি পাঠানো হবে পাত্রপক্ষের কাছে। এলোইজ সেই বিয়েতে রাজি নয় বলেই ম্যারিয়েনকে এই ছবি আঁকতে হবে এলোইজের অগোচরে। সেই নির্জন দ্বীপে এলোইজকে স্টাডি করতে করতে এই দুই নারীর মধ্যে গড়ে ওঠে এক সম্পর্ক। আমরা তাকে ভালোবাসা বলে ডাকি। অন্যেরা ডাকে নিষিদ্ধ প্রেম। যে প্রেম নিজে পূর্ণতা পায় না, অথচ হৃদয় ভরিয়ে রাখে পরিপূর্ণতায়।

 

ডিরেক্টর সেলিন স্কিয়ামা মাত্র দু-তিনটি চরিত্র দিয়ে অসাধারণ এক কবিতা তৈরি করেছেন। এই সিনেমা গোগ্রাসে গেলার নয়, জিভের আলতো ছোঁয়ার মহার্ঘ ওয়াইনের সুখ নেওয়ার মতো করে উপভোগ করতে হয়। ডিরেক্টর যেন পরম যত্নে একটা একটা রত্ন দিয়ে চন্দ্রহার গেঁথেছেন।

সিনেমাটা যেহেতু নির্মাণই হয়েছে চিত্রশিল্প ও শিল্পীকে ঘিরে, তাই এর প্রতিটি ফ্রেমকে যেন এক-একটা ছবির রূপ দেওয়া হয়েছে। সকালবেলা বাইরের দৃশ্যে এলোইজের চোখের রঙের সমুদ্র, সবুজ ব্রিটানি দ্বীপ, পাথরের বুকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়া সমুদ্রের ভেঙে যাওয়া তরঙ্গ যেন ক্লদ মনের আঁকা বেল্লে-ইলে; আর রাতে নির্জন প্রাসাদে, মোমবাতি আর ফায়ারপ্লেসের কমলাভ আলোয় তিনটি তরুণীর জীবন যাপনের প্রতিটি ফ্রেম আপনাকে মনে পড়াবে ভারমিরের কিয়াসেক্যিউরো স্টাইল। 

শব্দ আর নৈঃশব্দের দোলাচল এই সিনেমার আর রত্ন। এই ফরাসি সিনেমা দেখতে গেলে আপনাকে ফরাসি ভাষা বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। এখানে শব্দের যত না প্রয়োগ হয়েছে, তার চেয়ে ঢের গুণ প্রয়োগ হয়েছে নৈঃশব্দ্য। যেন তারা ঘুমন্ত শিশুর দোলনার দু’ পাশে দাঁড়িয়ে আছে, আর মৃদু দোলা দিচ্ছে দোলনায়।

ম্যারিয়েন আর এলোইজের দৃষ্টির আদান-প্রদান, ম্যারিয়েনের দ্বিধা মাখা শরীরী ভঙ্গি, আর সোফির সারল্য মাখা চোখ তুলে তাকানোতেই যেন সব গল্প বলা হয়ে যায়।

মধ্যযুগীয় ‘গার্লস নাইট আউটে’ তাদের অরফিউস আর ইউরিদিকের গল্প নিয়ে আলোচনার সময় যেন তাদেরও জীবন একাত্ম হয়ে যায় সেই গ্রিক মিথের গল্পের সঙ্গে। অরফিউস কেন পিছন ফিরে তাকিয়েছিল? তার পিছন ফেরা কি ইচ্ছাকৃত ছিল? সে কি ইউরিদিকের স্মৃতিটুকুকে আঁকড়ে ধরেই বাঁচতে চেয়েছিল? সঠিক উত্তর কে দেবে!

 

আর মিউজিক, ভিভালোদির ফোর সিজনের ‘সামার’ এই সিনেমার প্রাণভোমরা। বহু দিন আগের ধূসর হয়ে আসা কোনো গোলাপি চিঠি যেমন আচমকাই বইয়ের পাতা ওলটাতে গিয়ে হালকা হাওয়ায় ভেসে, পায়ের কাছে এসে পড়ে, তেমনই, অনেক দিন আগে ম্যারিয়েনের কাছে শোনা ‘সামার’, আবার এলোইজ শোনে এক অর্কেস্ট্রায় এসে। আবেগে সে হেসে ওঠে, কেঁদে ফেলে, খাতার ভাঁজে রাখা বিবর্ণ গোলাপের ঘ্রাণে ভরে ওঠে তার বুক।


 

কবিতা ভালোবাসলে, ছবি ভালোবাসলে, সর্বোপরি ভালো সিনেমা দেখতে ভালোবাসলে আপনাকে এই অসাধারণ নারীত্ব-যাপনের গল্পে আসন পেতে বসতেই হবে। এই গল্প নিষিদ্ধ গানের; যে গান সমুদ্রের দূরবর্তী কোনো দ্বীপে বসে কোনো সাইরেন কন্যা ছড়িয়ে দেয় তরঙ্গের মধ্যে দিয়ে। তবেই এই গান মৃত্যু বয়ে আনে না। আনে স্নিগ্ধতা, বিরহের মধ্যেও প্রিয়া-মিলনের প্রশান্তি।

ছবির রেটিং লোভনীয়। রটন ট্যোমাটোজ রেট: ৯৮%।

আর ঝুলিতে আছে বেস্ট স্ক্রিনপ্লে, বেস্ট সিনেমাটোগ্রাফি থেকে শুরু করে বেস্ট স্ক্রিনরাইটিং, বেস্ট সাপোর্টিং অ্যাক্টর-এর মতো বেশ কিছু অ্যাওয়ার্ড।

 

অভিনয়ে- অ্যাদিল এনেল, নোয়েমি মারল্যান্ট, লুয়ানা বাজরামি।

ডিরেক্টর- সেলিন স্কিয়ামা।

রিলিজ - ২০১৯

Recent Comments:

Leave a Comment: