• ৩০ বৈশাখ ১৪২৮, শুক্রবার
  • 14 May 2021, Friday
সত্যজিতের রবীন্দ্র ঠাকুর ছবি: ইন্টারনেট

সত্যজিতের রবীন্দ্র ঠাকুর

শুভঙ্কর দে

Updated On: 02 May 2021 04:49 pm



রায় চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের। রবীন্দ্রনাথের তৎকালীন সময়ের একটি উপন্যাস ‘রাজর্ষি’-র দুটি চরিত্রের নামে উপেন্দ্রকিশোর তাঁর দুই সদ্যজাত শিশুর ডাকনাম রাখলেন। ‘হাসি’ সুখলতা রাও এবং ‘তাতা’ সুকুমার রায়। রবীন্দ্রনাথ সুকুমারকে ভীষণ স্নেহ করতেন। তাঁর অন্তিম শয্যায় কবি গেয়েছিলেন, ‘দুঃখ এ নয়, সুখ নহে গো, গভীর শান্তি এ যে’ সুকুমারের মৃত্যু কবিকে মারাত্মক পীড়া দেয়। তিনি বলেছিলেন, “আমি অনেক মৃত্যু দেখেছি, কিন্তু এই অল্প বয়স্ক যুবকটির মতো, অল্পকালের আয়ুটিকে নিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এমন নিষ্ঠার সঙ্গে অমৃতময় পুরুষকে অর্ঘ্যদান করতে প্রায় আর কাউকে দেখিনি।” সুকুমার যখন মারা যান তাঁর পুত্র সত্যজিৎ আড়াই বছরের শিশু।

এরপর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সত্যজিতের দেখা হয় শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায়। তখন সত্যজিতের বয়স মাত্র দশ। কবিগুরুর কাছে দশ বছরের বালকটির আবদার ছিল যে কবি যেন তাঁর সদ্য কেনা অটোগ্রাফ খাতার প্রথম পাতায় একটা কবিতা লিখে দেন। আবদার মেনে কবি পরের দিনই লিখে দিলেন ‘স্ফুলিঙ্গ’-এর সেই বিখ্যাত কবিতা---- ‘একটি ধানের শিষের উপরে /একটি শিশির বিন্দু’। সেই মুহূর্তে সুপ্রভা দেবীকে তিনি বলেছিলেন, “এটার মানে ও আরেকটু বড়ো হলে বুঝবে।”


ছোট থেকেই যে সত্যজিৎ রবীন্দ্রনাথের প্রতি খুব আকৃষ্ট বা অনুপ্রাণিত হন তা কিন্তু নয়। শান্তিনিকেতনের কলাভবনে যখন তিনি ভর্তি হন তখন গুরুদেবের সঙ্গে সাক্ষাতের অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা করেননি। কবির মৃত্যুর পরের বছরেই সত্যজিৎ শান্তিনিকেতন ছেড়ে কলকাতা ফিরে আসেন। বিজ্ঞাপন জগতে প্রবেশ করেন। রবীন্দ্রনাথের উপর লেখা কিছু বইয়ের প্রচ্ছদ অঙ্কন করেন। যেমন সুধীরচন্দ্র করের ‘জনগণের রবীন্দ্রনাথ’, সুশোভন সরকারের ‘প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ’ ইত্যাদি। এরপর সত্যজিৎ চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করার পর ধীরে ধীরে দিন যত এগিয়েছে রবীন্দ্রনাথকে তত বেশি করে অনুধাবন করেছেন। 

১৯৫৮ সালে বিশ্বকবির জন্ম শতবর্ষ পালনের জন্য ভারত সরকার একটি কমিটি তৈরি করে। কবিকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের দায়িত্ব বর্তায় সত্যজিতের উপর। শোনা যায় কমিটির অনেকেই নাকি সত্যজিৎকে এই দায়িত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল সত্যজিৎ ইতিহাসবিদ নন, একজন চলচ্চিত্রকার মাত্র, তাঁর পক্ষে এরকম কাজ করা সম্ভব না। কমিটির চেয়ারম্যান তথা প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু এই যুক্তি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “আমাদের প্রয়োজন একজন শিল্পীর। সত্যজিৎ রায় সেই মানুষ, কোনও ইতিহাসবেত্তার তাঁর কাজে হস্তক্ষেপ করার দরকার হবে না।”

যাই হোক সত্যজিৎ খুব পরিশ্রম করেন এই তথ্যচিত্রের জন্য। এই সময় এটি ছাড়াও ‘তিনকন্যা’ ছবির শুটিং নিয়েও খুব ব্যস্ত থাকেন। এরই মাঝে সত্যজিৎ তাঁর মা সুপ্রভা রায়কে হারান। সুপ্রভা দেবী খুব খুশি হয়েছিলেন তাঁর ছেলে, গুরুদেবকে নিয়ে কাজ করছেন শুনে। কিন্তু সেটা আর তাঁর দেখা হয়ে উঠল না। মায়ের মৃত্যু সত্যজিৎকে মুহূর্তের মধ্যে অপ্রকৃতিস্থ করে দেয়। বিজয়া রায় এই বিষয়ে লিখেছেন, “ওঁর অমন হতবাক বিহ্বল চেহারা আমি এর আগে দেখিনি।” 

অবশেষে ১৯৬১-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতী প্রেক্ষাগৃহে ‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্রটি প্রথম প্রদর্শিত হয়। কবির মৃত্যু দিয়েই তথ্যচিত্রের শুরু---- “On 7th August nineteen hundred forty one, in the city of calcutta, a man died. His mortal remains perished, but he left behind him a heritage which no fire could consume.” ভাষ্যকার পরিচালক স্বয়ং। দেশ-বিদেশ সর্বত্র সমাদৃত হল এ তথ্যচিত্র। নেহরু তাঁকে এই কাজের জন্য একটি রৌপ্য ফলক উপহার দেন। 

 

  ‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্রে স্মরণ ঘোষাল 

এরপর ৫ মে, ১৯৬১ রবীন্দ্রনাথের শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মুক্তি লাভ করে ‘তিনকন্যা’। এটির জন্য সত্যজিৎ নির্বাচন করেন রবীন্দ্রনাথের তিনটি গল্প---- ‘মণিহারা’, ‘পোস্টমাস্টার’ আর ‘সমাপ্তি’। ‘তিনকন্যা’র মাধ্যমেই তিনি প্রথম সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই ছবিতে তিনি ব্যবহার করেন একটি রবীন্দ্রসংগীত ‘বাজে করুণ সুরে/ তব চরণতলচুম্বিত পন্থবীণা’। নেপথ্য গায়িকা রুমা গুহঠাকুরতা। 

১২ মে, সাল ১৯৬২ মুক্তি পেল সত্যজিতের স্বরচিত কাহিনি নিয়ে তৈরি এবং তাঁর করা প্রথম রঙিন ছবি ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’। এখানেও তিনি অমিয়া ঠাকুরকে দিয়ে গাওয়ালেন একটি রবীন্দ্রসংগীত ‘এ পরবাসে রবে কে হায়/কে রবে এ সংশয়ে সন্তাপে শোকে’| এরপর মুক্তি পায় রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ অবলম্বনে ‘চারুলতা’, সাল ১৯৬৪, ১৯ এপ্রিল। এই ছবিটি নিয়ে তিনি বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “চারুলতায় ভুল সবচেয়ে কম। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি যে, ছবিটা যদি আমি আবার বানাতাম, তবে ঠিক একই রকম ক’রেই বানাতাম।”

‘চারুলতা’র টাইটেল মিউজ়িকটিতে সত্যজিৎ যন্ত্রসংগীতের মাধ্যমে ব্যবহার করলেন ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে, কে যে নাচে’ গানটি। এখানে তিনি কিশোর কুমারকে দিয়ে গাওয়ালেন ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ রবীন্দ্রসংগীতটি। (এটি কিশোর কুমারের গাওয়া প্রথম রবীন্দ্রসংগীত), যা নিয়ে সেই সময় কলকাতার তথাকথিত ‘রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ’রা সমালোচনা করেন যে এত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী থাকা সত্ত্বেও কেন কিশোর কুমার! 


“চারুলতা”-য় আইকনিক Lorgnette হাতে মাধবী মুখার্জী

১৯৮৫ সালের ৪ জানুয়ারি মুক্তি পায় রবীন্দ্রনাথের কাহিনি কেন্দ্রিক আরেকটি ছবি ‘ঘরে বাইরে’। এখানেও আবার তিনি কিশোরকে দিয়ে গাওয়ালেন ‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি’ গানটি। এসব ছাড়াও তাঁর ‘জন-অরণ্য’ ছবিতে শর্মিলা রায়ের কণ্ঠে ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’, শ্রমণা গুহঠাকুরতার কণ্ঠে ‘শাখা-প্রশাখা’ ছবিতে ‘মরিলো মরি, আমায় বাঁশিতে ডেকেছে কে’ ও ‘আগন্তুক’-এ ‘বাজিল কাহার বীণা’ রবীন্দ্রসংগীতগুলি আমরা শুনতে পাই। ‘আগন্তুক’-এ আরেকটি রবীন্দ্রসংগীতও শোনা যায় ‘অন্ধজনে দেহো আলো, মৃতজনে দেহো প্রাণ’, যেটি উৎপল দত্তের লিপে কণ্ঠ দান করেন স্বয়ং সত্যজিৎ! 

এসব ছাড়াও তাঁর অনেক ছবিতেই চরিত্ররা রবীন্দ্রসংগীত গুনগুন করে গেয়েছেন স্বকণ্ঠে যেমন ‘চারুলতা’য় ‘ফুলে ফুলে ঢ’লে ঢ’লে’, ‘চিড়িয়াখানা’য় ‘মেঘের ‘পরে মেঘ জমেছে’, ‘অরণ্যের দিন রাত্রি’-তে ‘ঘরেতে ভ্রমর এল’ ইত্যাদি উল্লেখ্য।

সত্যজিতের পরিণত মননের সিংহাসনে রবীন্দ্রনাথ নামক একজন ‘ঠাকুর’-এর স্থান যে বেশ পাকাপোক্ত ভাবেই ছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে একথাও উল্লেখ্য যে, তিনি কিছু মেকি রবীন্দ্রভক্তের মতো ছিলেন না। একজন প্রকৃত রবীন্দ্রপ্রেমী কখনোই অন্ধভাবে তাঁকে অনুসরণ করবেন না। সত্যজিৎও সেই শ্রেণীতেই বিরাজ করেন। এর প্রমাণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে সত্যজিৎ তাঁর ‘বিষয় চলচ্চিত্র’ গ্রন্থের ‘বাংলা চলচ্চিত্রের আর্টের দিক’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “জনপ্রিয়তা শিল্পে উৎকর্ষের সংজ্ঞা নয়। যদি তাই হত, তবে রবীন্দ্রনাথের অনেক রচনাই সাহিত্য হিসাবে বাতিল করে দিতে হতো।”

*তথ্য ঋণ:

১) বিষয় চলচ্চিত্র: সত্যজিৎ রায়,আনন্দ

২)যখন ছোট ছিলাম: সত্যজিৎ রায়,আনন্দ

৩)আমাদের কথা: বিজয়া রায়,আনন্দ

৪)সত্যজিৎ রায়: বাবলু ভট্টাচার্য,মৃন্ময়

Recent Comments:

Leave a Comment: