• ৩০ বৈশাখ ১৪২৮, শুক্রবার
  • 14 May 2021, Friday
মাধুকরী হও নয়নমোহিনী স্বপ্নের কাছাকাছি ছবি: ইন্টারনেট এবং লেখক

মাধুকরী হও নয়নমোহিনী স্বপ্নের কাছাকাছি

সাগ্নিক রায়

Updated On: 09 Apr 2021 07:52 pm

পৃথু ঘোষ-কে মনে আছে? সেই যে ‘মাধুকরী’-র পৃথু ঘোষ, বিলেত ফেরত ইঞ্জিনিয়ার, উচ্চ-পদস্থ চাকরিজীবী। পৃথু ঘোষ একটা বড় বাঘের মতো জীবন কাটাতে চেয়েছিল,  কাউকে কোনো পরোয়া-তোয়াক্কা না করে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে জীবনকে ভালোবাসতে চেয়েছিল পৃথু। খুব বড় মানুষ হতে চেয়েছিল সে। কোনো এলিট সোসাইটির মধ্যে নয়, প্রকৃতির মধ্যে খুব বড়, মহান। কিন্তু আদতেই পৃথু ঘোষ-রা হেরে যায়। এভাবে জীবন কাটানো যায় না। সামাজিক ও দাম্পত্য দায়বদ্ধতা আমাদের ভেতর লুকোনো পৃথু ঘোষ-কে হারিয়ে দেয়। পৃথু আমাদের কারোর কারোর সেই স্বপ্নের নায়ক। আমরা হতে চাই তার মতো কিন্তু হতে পারি না।

১৯৮৪ সালে শুরু হয়েছিল বুদ্ধদেব গুহর ‘মাধুকরী’-র যাত্রা সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায়। তারপর বহু সমাদৃত এই উপন্যাস পাঠককের বুকসেলফে, আর প্রকাশকের বেস্ট সেলারে জায়গা করে নিয়েছে। অগুনতি পাঠক-পাঠিকা বারবার প্রেমে পড়েছে মাধুকরী-র। আজ প্রথম এত বছর বাদে থিয়েটারের প্রসেনিয়াম স্পেসে ‘মাধুকরী’।
পরিচালক ড. সিতাংশু খাটুয়া যে নাটকে স্বয়ং পৃথু। ‘গড়িয়া কৃষ্টি’-র নতুন নাটক ‘মাধুকরী’ দেখে আসলাম জ্ঞান মঞ্চে। সেই রাতে প্রেটোরিয়া স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে সাহসী সিতাংশু-র কথা মনে হয়েছে। অনেক দিন পর বাংলা সাহিত্যনির্ভর কাজ দেখে মুগ্ধ হলাম। এর আগে ওরা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ নিয়ে কাজ করেছে। করেছে সমরেশ মজুমদারের ‘কালপুরুষ’। আজ মাধুকরী। নিতান্তই জিভে ব্লেড রাখার মতো সাংঘাতিক কাজটা করেছেন সিতাংশু। যা অত্যাধিক দুরূহ। লেখকের এ দীর্ঘ উপন্যাসটিকে মাত্র প্রায় আড়াই ঘণ্টার একটা নাটকে কনভার্ট করা অতিমাত্রায় কঠিন ও পারদর্শিতার কাজ। কীভাবে এক টুকরো স্টেজ হয়ে উঠল হাটচান্দ্রা, রাইনা, কিবুরু। বন-জোৎস্নায়, সবুজ অন্ধকারের মতো সেট সাজিয়েছেন নীল কৌশিক। দেখা যায় দূরে পাহাড়ের কোল। মাস্ক পরে কিছু অভিনেতা অরণ্যের বন্য জন্তু হয়ে ওঠে। অঙ্গভঙ্গি ও আংশিক নাচের ফর্মে তা হয়ে উঠেছে রোমহর্ষক ও গা ছমছমে। এভাবেই শিকারও দেখানো হয়।

বাঙালির রোম্যান্টিক উপন্যাস মাধুকরী হয়ে উঠেছে জীবন্ত ও দৃশ্যত বাস্তব। পৃথু, ঠুঠা, রূষা, কুর্চি, বিজলি, শামিমরা কাগজের ভাঁজ থেকে বেরিয়ে আজ মঞ্চে। পৃথুর চরিত্রে ড. সিতাংশুর অভিনয় নিয়ে আলোচনা করা যায়। যথেষ্ট দক্ষ্ ও স্বকীয় অভিনয়শৈলী তাঁর। মেকি, সেকুলার, অভিনয়ের চিরাচরিত ঢঙ-কে আঘাত করেন সিতাংশু। যা তাঁকে পৃথু করে তুলেছে এ নাটকে। প্রচণ্ড কঠিন চরিত্র পৃথু ঘোষ। চরিত্রের ছোট ছোট বাউন্ডুলে, ক্ষ্যাপাটে দিকগুলোকে এক্সপিরিমেন্টের জায়গায় নিয়ে গেছেন তিনি। যার ফলে সার্থক বুদ্ধদেবের পাগলা ঘোষসা চরিত্র পৃথু। এছাড়াও ঠুঠা বাইগা-র চরিত্রে কাজল শম্ভু বেশ ভালো। কুর্চির চরিত্রে গান্ধর্বী খাটুয়ার অভিনয় খুবই মনোমুগ্ধকর। মনে রাখার মতো। রোকেয়া রায়কে নিয়ে আলাদা করে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা নেই আমার। এক সময় রোয়েকার ‘সীতায়ন’ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। আজ সে ‘মাধুকরী’র রূষা। তবু যেন প্রত্যাশা ছিল আরো। এছাড়া ইদুরকার চরিত্রটিও আরো সার্থক হয়ে উঠতে পারত বলে মনে হয়েছে। তবু বলব এ নাটকের শিল্পীরা সবাই ক্ষমতাবান। এ এক যৌথ দাপুটে প্রচেষ্টা। সাড়ে-ছয়শো পাতার একটা টেক্সটকে আড়াই ঘণ্টার নাটকে উপস্থাপন করার স্পর্ধা দেখায় কটা দল!
গড়িয়া কৃষ্টি-র সার্থক প্রযোজনা ‘মাধুকরী’।

বুদ্ধদেব গুহর লেখা যেমন প্রেমিকার চিঠি ব্যাতিত হয় না। মাধুকরীতেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বারবার চিঠি এসছে নাটকে। লেখক এ সাহিত্য নিবেদন করেছিলেন একবিংশের নারী ও পুরুষদের। আমার মতো ইয়াং জেনারেশনও এই নাটক দেখতে দেখতে হোয়্যাটসঅ্যাপ আর চিঠি চালাচালির তুলনামূলক আবেগ ও দূরত্ব কষতে থাকে। দেখে, ভালোবাসা কত ফিকে আজ। কত প্রাণহীন। সাদা কাগজে কলমের দাগ নেই। এ নাটক কবিতাচ্ছন্ন করে তোলে দর্শককে। লেখক প্রচুর কবিতা ঢেলে দিয়েছিলেন মাধুকরীতে। পরিচালক প্রয়োজন ও সাধ্যমতো তা রেখেছেন নাটকে। সংগীতের ব্যবহার নিয়ে কিছু না বললে বাকি থেকে যাবে। মন ছুঁয়ে যাওয়া সঙ্গীতায়োজন। অদ্ভূত সুন্দর কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং অবশ্যই রবীন্দ্রসংগীত। অপূর্ব সমাপ্তি সিকোয়েন্স দিয়ে মাধুকরীর মধুরেণ সমাপয়েৎ।

আর কী বলতে পারি! আমি নাট্য বোদ্ধা নই। সমালোচকও নই। কোনো ভাবে চাই না এ লেখা সমালোচনা হয়ে উঠুক। স্রেফ একটা লেখা হিসেবেই থাকুক। একজন সামান্য দর্শকের ভালো লাগা থেকে কিছু কথা। উপন্যাস ও থিয়েটার ধর্মগত ভাবে দুটো আলাদা মাধ্যম। তবু একটা আরেকটার মধ্যে এসে পড়ে। মাধুকরী পড়া এবং মাধুকরী দেখা কখনোই একশো শতাংশ এক হবে না। উপলব্ধি, অনুভূতি দু’ ক্ষেত্রে দুরকম। কিন্তু এক থেকে যায় খালি মাধুকরীর অন্তরাত্মার নির্যাসটুকু। যা আমাকে ভাবায় কবীর সুমনের লাইন----
‘নতজানু হয়ে ছিলাম তখন এখনও যেমন আছি,
মাধুকরী হও নয়নমোহিনী স্বপ্নের কাছাকাছি...’

অস্থির সময়ে ব্যর্থ প্রেমিককে স্মৃতি-জাগানিয়া করে তোলে এই নাটক। জ্ঞান মঞ্চের সিটে বসে হারিয়ে যাই শেষ বসন্তের রাতে। দোরে দোরে ভিক্ষাবৃত্তির নাম-ই মাধুকরী। ভালোবাসার ভিক্ষাবৃত্তি। এখন ভাবি, মানুষ এ পৃথিবীতে কত কী করল! যে হাতে কবিতা লিখেছে সে হাতেই তো বোমা বেঁধেছে। হয়তো পৃথিবীতে একদিন ভালোবাসা বলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তাই মাধুকরীদের বেঁচে থাকতে হয়। দিনশেষে এ-জীবন মাধুকরী-ময়। এক টুকরো ভালোবাসার ভিক্ষে করে মরি।
মাধুকরী বেঁচে থাকুক। পৃথু ঘোষরা বেঁচে থাকুক। হয়তো বাঘের মতো বাঁচা যাবে না। তবু…

Recent Comments:

Leave a Comment: