• ১২ মাঘ ১৪২৭, মঙ্গলবার
  • 26 January 2021, Tuesday
ঘেঁটু ফুলের জোসনা ছবি: কৃষ্ণেন্দু মণ্ডল

ঘেঁটু ফুলের জোসনা

সায়ন্তন ঠাকুর

Updated On: 10 Oct 2020 11:58 pm


পর্ব:


দূরে একটি গান বাজছে, গানে ছেলেটি মেয়েটিকে ইনিয়ে বিনিয়ে বলছে, বাজিকর, আমি বাজিকর, বলছে, হৃদয়ের বাজি সে জিতেছে নাকি হৃদয় খুইয়ে, এদিকে আজ আকাশখানি নীলকান্তমণির মতো জেগে উঠেছে। মাঘমাস হলে হবে কী, মধুঋতুর বাতাস বইছে ভুবনডাঙায়।


সকালে রোজকার মতো বাজারে গেছিলাম, দেখি, পথের ধারে বসা বাজারখানি তুলে ময়দানবের মতো কে যেন বাঁধানো পাকা দালানে নিয়ে চলে এসেছে। মাথায় করোগেটের চাল, বিজলিবাতি জ্বলছে, তকতকে নূতন দোকান সব। মনখারাপ হয়ে গেল, তাজা দিশি বেগুন-ফুলকপির শরীরে ভর সকালেও লেগে আছে অশ্লীল বাতির আলো। কেমন মলিন মুখে ঘুমিয়ে আছে পালংশাক আর মটরশুঁটি।
 

রাসমোহনের মুখেও অন্ধকার, কাঁচাপাকা দাড়ি, সামনের দুটি দাঁত ভাঙা, গলায় কণ্ঠী, একখানি ধুসো চাদর জড়িয়েছে গায়ে। সেই মদনপুর পায়রাডাঙার দিকে ঘর, একটু হেসে বললাম, কী গো, নতুন দোকান পেলে?
----হাঁ, করি দিলে সব উয়ারা

----তা ভালোই তো হয়েছে, জলঝড়ে আর অসুবিধা হবে না!
----তা হইচি, তবে বোজলা কিনা, ওই ভুঁইয়ে ভালা চেল দুকান!
----কেন গো? সেই দোকান তোলা-পাতা, তার থেকে এইখানে থিতু হয়ে বসা, ভালো না?
 
----থিতু, থিতু... ও থিতু হয়ি কী হবে বলো দিনি! গৌরের দয়ায় আজ আচি কাল নাই... কী নেবা? দ্যাও দ্যাও থলে, ইদিকে দ্যাও!

গৌরের দয়া! ওসব দিকে, গাঁ-ঘরে বোষ্টুমদের কথা বলার অমনই ধারা। সারা কার্তিক মাস জুড়ে নামগান, রাতের দিকে কীর্তনের আসর বসে, বৈরিগিদের নিয়মসেবার মাস কিনা! টুপটুপ করে নূতন হিম খসে পড়ে বাতাস থেকে, এই বড় বড় হ্যাজাক জ্বলছে, মাথার ওপর শামিয়ানা, ওই যে দূরে তুলসীতলা, গায়েন হারমোনিয়ামের বেলো টিপে শুরু করেছে তখন, হরিহরায় নমঃ-কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ-যাদবায় মাধবায় কেশবায় নমঃ। তেমন আহামরি গলা নয়, গাঁজা খাওয়া ভাঙা ভাঙা গলা। তবে বোষ্টুমির খুব বাহার, ঢলোঢলো রসকলি, একপিঠ চুল, একেকদিন আবার চুড়ো করে বাঁধে মাথার ওপর।
 

লোকমুখে শুনেছি ব্রজধামে যমুনার পথে বোষ্টুমি একদিন হেঁটে যাচ্ছিল, সিক্ত বালুকায় দু’ খানি চরণচিহ্ন, তা খানিক দূর যাওয়ার পর চরণচিহ্ন মুছে গেল, গেল কোথায় বোষ্টুমি, খোঁজ খোঁজ! সে সবই সার, পাওয়া আর গেল না, নিধুবনে দিকে যাচ্ছিল কিনা! তবে ওইখানকার বুড়া গোঁসাই বলে, আরো একটি পদচিহ্ন সে নাকি দেখেছিল ওই দিন, পুরুষ পায়ের ছাপ বালির ওপর, শুধু একটু ভারী, চাপ পড়ে গর্ত হয়ে গেছে জায়গায় জায়গায়, যেন পুরুষটি কাউকে কোলে নিয়ে হেঁটে চলেছে দূর যমুনার দিকে!
 

তা ওই বোষ্টুমির সঙ্গে রাসমোহনের আশনাই! আমাকে একদিন গল্প করেছিল রাসমোহন নিজেই। সেদিন ঘন বর্ষা, সকাল থেকেই আকাশ ফুটো হয়ে জল ঝরছে, বাজারহাট তেমন বসেনি কিছুই, এদিকে আমার ঘরে আনাজ নাই, তা গেছি একখান ছাতা নিয়ে, দেখি রাসমোহন বসে আছে, দোকানে মালপত্র নাই তেমন, ওই আলু, পেঁয়াজ, লঙ্কা, কানা বেগুন, দু-চারটে বুড়ো পটল, এই সব। ওই দিন আমাকে বলেছিল বোষ্টুমির কথা। তাদের পীরিতের কথা। আমি শুধোলাম, নাম কী গো তার?
ভাঙা দাঁত বের করে বলে
----পদ্মা, পদ্মাবতী!
----বলো কী! নামের তো বাহার খুব!
 
----হবেনি কত্তা, কার ঘরে চেল দেকতে হবে তো!
----কার ঘরে গো?
----শিনিবাস গো কত্তা, শিনিবাস!
----তা পরের বোষ্টুমি, তুমি ফুঁসলালে কী করে তাকে?
একটু চুপ করে বসে থাকে রাসমোহন। বিড়ি ধরায়, আমাকেও দেয় একখানি, নীল সূতার বিড়ি, বড় সোয়াদ।
ধোঁয়া ছেড়ে বলে
----গৌরের দয়া গো! বোজলা কিনা, গৌরের দয়া সব!

আজ থলির ভেতর নিজেই উচ্ছে, আলু, বেগুন, পেঁপে সব পাল্লায় মেপে মেপে ভরে দিল। মাপছে আর বলছে, বোজলা না, শীত শ্যাষ, বেশি মাচ-মাংস খাবা না একন!
 
----তাহলে?
----আনাজ খাবা, প্যাট গরম হয় খুব একন

----সবজি?
----হ্যাঁ, পাতলা ডাল খাবা! তিতা খাবা! এই যে উচ্চে, উচ্চে দেলাম! খাবা!
 
একটু হেসে, আহা, কী লজ্জা মেশানো হাসি, বলে
----বোষ্টুমি কী সোন্দর সুকতো রাঁধে! মুকে লেগে থাকে গো!

তা আজ বাজার থেকে ফিরে রাঁধলাম, সুক্তো রাঁধলাম। মৌরি-আদাবাটা-রাঁধুনি ফোড়ন, দুধ, বড়ি, ঘি সব দিয়ে, অসময়ে একটা কোকিল ডাকে এদিকে, আজও ডাকছিল। ওদেরই বা দোষ কী, মধুমাসের বাতাস বইছে, ঝিরিঝিরি নিমগাছের পাতা দুলছে আপনমনে। দূর আকাশে নির্ভার মেঘ ভেসে ভেসে কোথায় যেন চলেছে, কেমন খর হয়ে এসেছে রোদ্দুর।

রাঁধতে রাঁধতে দ্বিপ্রহর মুখ নীচু করে চুমো খেল অপরাহ্নের কপালে। কী মেদুর অপরাহ্ন, কত পুরাতন কথা মনে পড়ে যায়, আমার তো আর পদ্মাবতী নাই, তবুও পদ্মার কথা মনে করেই অন্ন রান্না করলাম আজ। ভবসমুদ্রে ফুরিয়ে গেল আরো একটি নশ্বর দিবস।

 

Recent Comments:

Leave a Comment: