• ১৩ মাঘ ১৪২৭, বুধবার
  • 27 January 2021, Wednesday
আমার মেঘনাদবধ ছবি: ইন্টারনেট

আমার মেঘনাদবধ

দেবশ্রী রায়

Updated On: 27 Sep 2020 02:10 pm

মেঘনাদবধ কাব্যের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ‘বিভীষণের প্রতি ইন্দ্রজিৎ’ কাব্যাংশটির হাত ধরে। বলতে দ্বিধা নেই , কম বয়সের আবেগ ওই অত অল্পেই এক মহাসমুদ্রের আভাস পায় ও গোটা সমুদ্র দর্শন করে চক্ষু সার্থক করতে চায়। এরপর গোটা সমুদ্র দর্শন সে করে বটে, কিন্তু তার মন ভরে না, পর্বতের মূষিক প্রসব দর্শন করে যেন সে। 


এর কিছুদিন পর আমি বিভিন্ন মহারথীদের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ সমালোচনা পড়ে জানতে পারি আমার অনন্য উত্তরসূরীগণও একে নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করতে পারেননি। তবে তাঁরা ছিলেন স্বীয় প্রতিভাবলে বলীয়ান এবং তাঁদের কাছে ছিল অকাট্য যুক্তিজাল। সেখানে আমি সামান্য এক হরিদাস পাল হয়ে কি এই মহাকাব্যের সমালোচনা করতে পারি? তবু, আমি যখন একে অপছন্দ করেছি, আমার মতো সাধারণ্যে এর কী প্রভাব পড়েছে তা জানানোর দায় থেকেই যায়। আর সেই দায় থেকেই এই লেখার অবতারণা। 


শ্রদ্ধেয় শ্রী চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের সুযোগ্য পুত্র শ্রী কনক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, Romantic self-identitification নামক ভাবটিই হল মধুসূদনের কাব্যগুলির বৈশিষ্ট্য। আর এই ‘আত্মভাবপ্রাধান্য’ যা কিনা মধ্যযুগীয় কবিতা থেকে আধুনিক কবিতাকে পৃথক করেছে, সেইটেই, মধুসূদনকে দিয়েছে বাঙালি মননে এক মহাসন। 


কিন্তু এই ‘আত্মাভাবপ্রাধান্য মানে কী? আমাদের মূল মহাকাব্যটির প্রাচীনত্ব এবং সত্যতা থেকে সরে এসে পাশ্চাত্যগন্ধী বিভিন্ন রস আমাদের মহাকাব্যের খাপে বসিয়ে তাকে একটি জগাখিচুড়ি বানানো?

বিস্তারিত বলা যাক তবে। 


প্রথমে মেঘনাদবধ কাব্যের নায়ক নির্বাচনে মধুসূদন স্বাতন্ত্র্য এনেছেন। রাম নন, তাঁর নায়ক রাবণ। এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্যও বেশ প্রণিধাণযোগ্য। “I despise Rama and his rabble. The idea of Ravana elevates and kindles my imagination.” বুঝুন!


যা হোক, কাব্যের শুরু হয়েছে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ রাজসভায় এসেছে, এই খান থেকে। সেই মৃত্যুসংবাদ পেয়ে রাবণের ও তাঁর সভাসদকুলের ক্রন্দন, মাত্রা ছাড়িয়ে বহু দূর অতিক্রম করেছে। এই যদি একজন বীর পুত্রের পিতার নমুনা হয়, তবে তা বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায় না কি?


এরপর বীরবাহু-মাতা চিত্রাঙ্গদার ভৎর্সনায় রাবণ যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তুত হন, কিন্তু মেঘনাদ সেই সময় হঠাৎ এসে স্বয়ং যুদ্ধে যাবেন বলে জেদ ধরেন। রাবণ সম্মত হন, তবে যুদ্ধযাত্রার পূর্বে তিনি স্বীয় ইষ্টদেব অগ্নির উদ্দেশে নিকুম্ভলা যজ্ঞাগারে যজ্ঞ করে যুদ্ধযাত্রা করতে নির্দেশ দেন এবং মেঘনাদকে সেনাপতি পদে বরণ করেন। 


একটু থামি। এই খানে জানিয়ে রাখি মেঘনাদবধ মহাকাব্যের নয়টি সর্গের মাত্র দুটি সর্গ রামায়ণানুগত। ওই দুটি সর্গে রামায়ণীয় কাহিনির সূত্র অবিকৃত ভাবে রক্ষিত---- চতুর্থ সর্গে সরমার কাছে সীতার বিলাপ অংশটি এবং ষষ্ঠ সর্গে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণের কাছে মেঘনাদ হত্যা অংশটি। যদিও ষষ্ঠ সর্গে লক্ষ্মণের স্থানে তিনি মেঘনাদকে মহিমান্বিত করেছেন, তবুও এই দুটি সর্গ-রচনা মূলানুগ বলেই বোধহয় মধুসূদনের কাব্য প্রতিভা স্বতঃস্ফূর্ত লেগেছে , অন্তত আমার কাছে। আর বাদবাকি সমস্ত মহাকাব্যটির বিভিন্ন অংশে বিদেশি মহাকাব্যের বিভিন্ন ফ্রেম, ধরে ধরে স্থাপন করা হয়েছে। 


যেমন, প্রথম সর্গের শেষ ভাগে যেখানে লঙ্কাপুরীর বহির্ভাগে প্রমোদোদ্যানে মেঘনাদের ব্যসনমত্ত অবস্থানের কথা বলা হয়েছে, সেই চিত্রটি ট্যাসো রচিত ‘জেরুজালেম উদ্ধার’ কাব্য থেকে গৃহীত হয়েছে। 


দ্বিতীয় সর্গে লক্ষ্মী, পার্বতী, কামদেব অধ্যুষিত দৈব ষড়যন্ত্রের উৎস হল হোমার রচিত ‘ইলিয়াড’ কাব্য। দেবরাজ জুপিটারের অনুগ্রহপুষ্ট ট্রয়ের সর্বনাশসাধনে জুপিটারপত্নী জুনো নিদ্রাদেব সমনাসের সহায়তায় আইডা পর্বতশৃঙ্গে জুপিটারকে নিজের রূপে সম্মোহিত করে রাখেন। এই অংশের হুবহু অনুকরণ দ্বিতীয় সর্গে, অবহিত ব্যক্তিগণ মাত্রই তা জানেন।


তৃতীয় সর্গে মেঘনাদের প্রমোদোদ্যান ত্যাগের পর বিরহিণী মেঘনাদপত্নী স্বামীর সঙ্গে মিলিত হবার অভিপ্রায়ে অবরুদ্ধ লঙ্কা নগরীতে প্রবেশ করছেন। এই মেঘনাদপত্নী অর্থাৎ এই মহাকাব্যের নায়িকা কে, তা সবাই জানেন। তিনি হলেন প্রমীলা। কিন্তু আশ্চর্যের কথা কী জানেন, রামায়ণে প্রমীলার উল্লেখমাত্র নেই। কাশীরামের মহাভারতের অশ্বমেধ পর্ব থেকে প্রমীলা নাম তিনি গ্রহণ করেছেন। আর এও জানিয়ে রাখি, প্রমীলাতে হেক্টরপত্নী এন্ড্রোমেকির ছায়া, রঙ্গলালের ‘পদ্মিনী’ কাব্যের পদ্মিনীর ছায়া প্রবল। 


আগেই বলেছি মেঘনাদবধ কাব্যের দুটি সৰ্গ কেবল মূলানুগ। চতুর্থ ও ষষ্ঠ। পঞ্চমেও আছে ট্যাসোর ‘জেরুজালেম উদ্ধার’-এর ছায়া। সপ্তম, অষ্টম, নবমও তার ব্যতিক্রম নয়। নবম সর্গে বর্ণিত মেঘনাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হোমার রচিত ইলিয়াড কাব্য থেকে গৃহীত, যেখানে প্যাট্রক্লউস ও হেক্টরের মৃত্যুর পর তাদের অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া বর্ণিত হয়েছে। 


আবারও বলি, মেঘনাদকে মহিমান্বিত করলেও ষষ্ঠ সর্গে মেঘনাদের হত্যা এবং চতুর্থ সর্গে সীতার বিলাপ অংশটিই পাঠক মনকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্পর্শ করে। মূল মহাকাব্যের সত্য দর্শন করায় ওই দুটি অংশ, তাই কি?


এই বার কাব্য পাঠ সুখের কথায় আসি। এর প্রতি সর্গেই আমরা দেখতে পাই, অযুত প্রতিশব্দ ও উপমার এবং অবশ্যই অলঙ্কারের ছড়াছড়ি। অধিক সন্ন্যাসীতে যেমন গাজন নষ্ট হয়, তেমন অধিক প্রতিশব্দ, উপমান উপমেয়র ব্যবহার বারবার আমাদের বিভ্রান্ত করে। আর অলঙ্কার? কী নেই? উৎপ্রেক্ষা অলঙ্কার, ব্যতিরেক অলঙ্কার, উপমা অলঙ্কার, দৃষ্টান্ত অলঙ্কার, সম্বোধন অলঙ্কার, ভ্রান্তিমান অলঙ্কার---- কাব্য অপেক্ষা কাব্যের টীকা নিয়ে সময় অতিবাহিত বেশি হয় যেন। যে মেয়ে সাধারণ নিরাভরণ সাজে সর্বত্রগামী হতে পারে, অলঙ্কারের ভারে পীড়িত করলে তাকে যে পদে পদে হোঁচট খেতে হয়, মেঘনাদবধ মহাকাব্য পাঠ আমাদের যেন বারবার সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে। 


যে কোনো সৃষ্টিকর্ম তার সত্যতা ও সরলতা দিয়ে আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে। মেঘনাদবধে এই দুইয়েরই অভাব পরিলক্ষিত হয়। যদি মেনেও নিই, তৎকালীন মজ্জমান বাংলা ভাষাকে উদ্ধারের প্রচেষ্টায় মধুসূদনের এ এক মহৎ প্রয়াস, কিন্তু সে প্রয়াসের সফলতা নিয়ে তো প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যায়, তাই নয় কি?


“‘গাইব মা বীররসে ভাসি মহাগীত’--- বলে কবি যে কাব্য রচনা আরম্ভ করেছেন তা এইরকম করুণ রসের মধ্যে দিয়ে শেষ, অলঙ্কার শাস্ত্রের বিচারে দোষ বলেই পরিগণিত হয়”---- এই অমোঘ বাক্যটিই এই মহাকাব্যের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেয় বলে আমি মনে করি। রাম ও লক্ষ্মণকে অপছন্দ করে, মেঘনাদকে নায়ক করে তাঁর বীরত্ব কতটা দেখিয়েছেন মধুসূদন? বীরের মৃত্যু তাঁকে দান করেও, শেষ দৃশ্যের স্বর্গযাত্রা মহাকাব্যের মূল সুরকে আপত্তিজনকভাবে লঘু ও তারল্য দোষে দুষ্ট করেছে। সর্বোপরি, এই কথা বলে আমার সমালোচনা শেষ করি, যে কাব্যে পাঠসুখ অপেক্ষা অভিধানপ্রিয়তা মহৎ গুণ হয়ে দাঁড়ায়, সেই কাব্য তাৎক্ষণিক সাফল্য পেলেও, সুদূরপ্রসারী ব্যর্থতাই তার কপালে জোটে। 


Recent Comments:

Leave a Comment:

সম্পর্কিত খবর