• ১৩ কার্তিক ১৪২৭, বৃহস্পতিবার
  • 29 October 2020, Thursday
অনন্তের আহ্বান ছবি: লেখক।

অনন্তের আহ্বান

গৌরব বিশ্বাস

Updated On: 17 Oct 2020 12:02 am


একাদশ পর্ব

 

নিউইয়র্কের লেক জর্জ। জুলাই মাস। এডমন্ডস সাহেব (J. W. Edmonds) সকাল সকাল পড়ার টেবিলে এসে বসেছেন। এই গ্রীষ্মে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন পাহাড়ে। নিজের নিরালা কটেজে। মাসখানেক কাটিয়ে এই সদ্য ফিরেছেন নিজের বাড়ি। এই ক’মাসে প্রচুর চিঠিপত্র এসেছে ডাকে। এডমন্ডস সাহেব ব্যস্ত মানুষ। শহরের নামকরা উকিল। বহু লোকেই যে চিঠিপত্রে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চায়। এক-এক করে সব চিঠিরই উত্তর দেবেন তিনি। রিডিং টেবিলে সামনে চেয়ার টেনে বসে একে একে চিঠিগুলো পড়তে থাকলেন স্যার এডমন্ডস। একটা চিঠি খুলে তিনি একটু থমকালেন। ইন্ডিয়া থেকে এসেছে এই চিঠিখানা, কলকাতার এক ভদ্রলোক পাঠিয়েছেন। এডমন্ডস সাহেব নড়েচড়ে বসলেন। এ চিঠি কোনো কেজো আইনি পরামর্শের চিঠি নয়। এ চিঠির বিষয়, প্রেততত্ত্ব। পরলোক সম্পর্কিত কিছু জিজ্ঞাসা। কলকাতার এই ভদ্রলোকটি যথার্থ ব্যক্তির কাছেই চিঠি পাঠিয়েছিলেন। যোগ্য ব্যক্তির কাছেই জ্ঞাপন করেছিলেন পরলোক সম্পর্কিত অনুসন্ধিৎসা। প্রখ্যাত আইনজীবী ছাড়াও এডমন্ডস সাহেবের আরো একটি পরিচয় ছিল। তিনি ছিলেন সে যুগের প্রখ্যাত প্রেত বিশেষজ্ঞ। আধুনিক স্পিরিচুয়ালিজমের আদি যুগের অন্যতম কাণ্ডারী। এডমন্ডস সাহেব কলকাতা থেকে আসা এই চিঠির উত্তর দিতে বসলেন---- ‘To, P. C. Mittra, Esq...’। P. C. Mittra প্ৰদোষ চন্দ্র মিত্র নয়, আমাদের প্যারীচাঁদ মিত্র।

প্যারীবাবুর স্ত্রী বামাকালী মারা গেছেন বছর খানেকও হয়নি। প্যারীচাঁদ ঝুঁকেছেন স্পিরিচুয়ালিজমের প্রতি। ন্যাশনাল লাইব্রেরি থেকে আনিয়ে পড়ছেন বিদেশের বিখ্যাত স্পিরিচুয়ালিস্টদের লেখা বইপত্র। এমনি ভাবেই একদিন প্যারীবাবুর হাতে এসে পড়ল, এডমন্ডস সাহেবের লেখা ‘Spiritualism’-এর এক খণ্ড। এন্ডমন্ড সাহেবরা কী করে পরলোকগত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সাফল্য পেয়েছেন এ বইতে বিস্তারিত রয়েছে সব। প্যারীচাঁদ সরাসরি এডমন্ডস সাহেবকে লিখে বসলেন চিঠি। এদেশের প্রাচীন শাস্ত্রের পাতায় পাতায় অধ্যাত্ম দর্শন। আধ্যাত্মিকতার বীজ এদেশের আকাশে-বাতাসে। সে অধ্যাত্ম দর্শন আত্ম উন্নতির মার্গ হতে পারে কিন্তু পরলোকগত প্রিয়জনের এক মুহূর্ত দর্শন, মৃত্যুর পরেও তাঁর সঙ্গলাভ এই আপাত অসম্ভবকেই সাধারণ মানুষের জন্য সম্ভব করেছিল পাশ্চাত্যের স্পিরিচুয়ালিজম। পাশ্চাত্যের এই নব্য ধারার স্পিরিচুয়ালিজম আর প্রাচ্যের গভীর অধ্যাত্ম দর্শন, এই দুইয়ের মধ্যে সেতু হয়েছিলেন প্যারীচাঁদ। এডমন্ডস সাহেবের কাছ থেকে চিঠি মারফত জেনে নিয়েছিলেন পরলোকগত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের উপায় সমূহ।


মাহেন্দ্রক্ষণ যখন শুরু হয়, আলাদা করে আয়োজনের প্রয়োজন পড়ে না। সময়ই অলীক ক্ষমতাবলে, সবকিছু গড়ে নেয়। এন্ডমন্ডস সাহেবের সঙ্গে প্যারীবাবুর এই পত্রলাপের সময়কাল ১৮৬১। এর প্রায় বছর দুই বাদে, ১৯৬৩-এর ডিসেম্বরের গোড়ায় এ শহরে এলেন হোমিওপ্যাথ ডাক্তার বেরিগনি (Thiennette Bérigny)। জাতে ফ্রেঞ্চ। দীর্ঘকাল হোমিওপ্যাথির পসার জমিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। কিন্তু ১৮৬২ নাগাদ অস্ট্রেলিয়া হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাকে অবৈজ্ঞানিক বলে ঘোষণা করল। ডাক্তার তখন আর কী করেন! ভাসতে ভাসতে বউ-বাচ্চা সমেত চলে এলেন এ শহরে। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় এ শহরে ডাক্তার বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের চিকিৎসক ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারও, ডাক্তার বেরিগনিকে অসীম শ্রদ্ধা করতেন। ডাক্তার বেরিগনি এ শহরে খুলে ফেললেন হোমিওপ্যাথি ডিসপেন্সরি। মহেন্দ্রলাল সরকারের জীবনীকারের মতে, এটিই এ শহরের প্রথম হোমিওপ্যাথি ডিসপেন্সরি---- ‘বেরিগনি অ্যান্ড কোং’ ( ১)।এ শহরে এসে ডাক্তার বেরিগনি দুটো কাজ করেছিলেন। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রচার, বহু তরুণ সে সময় ডাক্তার বেরিগনির থেকে হোমিওপ্যাথ শিখেছিল। সেই সঙ্গে পরলোক তত্ত্বের বিস্তার। হোমিওপ্যাথের পাশাপাশি বেরিগনির নেশা ছিল পরলোকচর্চা।


বেরিগনি সাহেবের বাড়ি আর চেম্বার একসঙ্গেই। ঠিকানা- ১২, লালবাজার, কলকাতা। সন্ধের পর যখন এ শহরের কোলাহল স্তিমিত হয়ে আসে, বেরিগনির চেম্বারে রোগী দেখা শেষ হলেই জমে উঠত পরলোক চর্চার আসর। এমন পরিবেশই তো প্রেতচক্র বসবার জন্য আদর্শ। এডমন্ডস সাহেব প্যারীচাঁদকে চিঠিতে তেমনই তো লিখেছিলেন- ‘...at twilight hour, when turmoil of the day is over, and sitting together in a circle, with hands joined all around and in silence’. সে সময় এ শহরে বিদ্যুৎ তখনও আসেনি। রাস্তার গ্যাসবাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলছে। টিপেটিপে বৃষ্টি, শীতের সন্ধ্যায় বেরিগনির চেম্বারে বসেছে প্রেত বৈঠক। দরজা ভেজানো। ঘরের ভিতর মৃদু জ্বলছে বাতি। তাতে ঘর আলো হয় না কিন্তু পরস্পরের মুখ বোঝা যায়। ঘরের মাঝে একটা টেবিল ঘিরে চক্রাকারে বসে রয়েছেন পাঁচ-সাত জন মাঝবয়সি ভদ্রলোক। দেওয়াল জুড়ে তাঁদের দৈত্যাকার ছায়া। নিবিষ্ট চিত্তে সবাই স্মরণ করছেন কাঙ্ক্ষিত পরলোকগত ব্যক্তিকে। চিত্ত হওয়া চাই অচঞ্চল। দীঘির নিস্তরঙ্গ জলস্তরের মতো স্থির। যেন কোনো নিস্পন্দ প্রদীপের শিখা। কিছুক্ষণ কেটে যায়, কোনো সাড়া নেই। সব নিশ্চুপ নিস্তব্ধ। শুধু পরস্পরের শ্বাসের শব্দ শোনা যায়। ইহলোকের জীবনের লক্ষণ। গুটি কয়েক ইহলোকের জীব নিবিষ্ট চিত্তে মগ্ন হয়েছেন ইহলোক-পরলোকের সংযোগ স্থাপনে। হঠাৎ যেন সবার হাতের উপর দিয়ে বয়ে গেল এক দমকা ঠান্ডা বাতাস। দরজা-জানালা তো সব বন্ধ! তবে! চমকে উঠল সবাই। তবে কি সে এল?

এ শহরের পরলোকচর্চার শুরুর সন্ধেগুলো ছিল এমনই। পাঁচ-সাত জন নিয়ে চক্রগঠন। টেবিলের চারিদিকে গোল হয়ে বসে প্রেত বৈঠক। হাতে হাত লাগিয়ে বসতে হবে এমন মানে নেই। নিবিষ্ট চিত্তে বসলেই হল। চক্র শুরুর আগে ভক্তিমূলক গান গাওয়া যেতে পারে। মৃত্যু পরবর্তী অস্তিত্বকে কঠোরভাবে বিরোধিতা করেন, এমন ব্যক্তিকে চক্রে না রাখাই ভালো। মানসিক ভাবে সবাই একাত্ম হলে তবেই পরলোকগত ব্যক্তির ইহলোকে আসার পথ সুগম হয়। দরকার ধৈর্য। প্রথম দিন বসলেই যে সফলতা পাওয়া যাবে এ ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা নেই। কয়েকদিন পরপর বসলে তবেই সফলতা মেলে। প্রেত আসরে বিভিন্ন ধরনের বিচিত্র কাণ্ড ঘটতে পারে তাই সহজেই ভয় পায় বা নার্ভাস হয়ে পড়েন এমন ব্যক্তিকে নিয়েও চক্র গঠন করা উচিত নয়।

....................................................................

১. Life of Dr. Mahendra lal Sircar, Sarat Chandra Ghosh

ছবি: এডমন্ডস সাহেব---- Portraits of eminent Americans now living: with biographical and historical memoirs of there lives and actions, VOL-II

 ডাক্তার বেরিগনি অ্যান্ড কোং-এর বিজ্ঞাপন---- The Calcutta Journal Of Medicine

 

(কোনোরকম কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেওয়া এই রচনার উদ্দেশ্য নয়। আশা করা যায়, পাঠক-পাঠিকারাও সংস্কারমুক্ত মনে, শুধুমাত্র পাঠের আনন্দে এই রচনা পাঠ করবেন)