• ১২ কার্তিক ১৪২৭, বুধবার
  • 28 October 2020, Wednesday
সাইকোকাইনেসিস ছবি: ইন্টারনেট।

সাইকোকাইনেসিস

অনুভব

Updated On: 15 Oct 2020 12:00 am


নন-আমেরিকান সুপারহিরো সিনেমা:

সাইকোকাইনেসিস---- মধ্যবিত্ত কোরিয়ান সুপারহিরো এবং রুখে দাঁড়ানোর গল্প

 

বর্তমান সময়ে সুপারহিরো মুভি মানেই আমরা ডিসি, মার্ভেল বুঝতে শিখেছি। আমাদের মনে ভেসে ওঠে সুপারম্যান, ব্যাটম্যান, অ্যাভেঞ্জার্সদের ছবি। মোদ্দা কথা সুপারহিরো জগতকে ঢেকে রেখেছে আমেরিকান সুপাররহিরোরা। এই সুপারহিরোদের চলচ্চিত্রায়ণ অন্য স্তরে পৌঁছেছে হলিউডের দুর্দান্ত ইনফ্রাস্ট্রাকচার--- আর্থিক, টেকনিকাল এবং দক্ষ কলাকুশলীদের সহজলভ্যতার কারণে। কিন্তু তাই বলে আমেরিকান বা হলিউডি সুপারহিরোর বাইরে কি সুপারহিরো নিয়ে কাজ হয়নি? আমাদের দেশেই তো কৃশের মতো সুপারহিরো নিয়ে কাজ হয়েছে, অন্যান্য মুভি ইন্ডাস্ট্রিতেও এরকম চেষ্টা নিশ্চয়ই হয়েছে। তাদের হলিউডের মতো চাকচিক্য নেই, দক্ষ কলাকুশলী নেই--- এমন হতে পারে বা তাদের সুপারহিরো এবং সুপারহিরো মুভি মেকিং স্বতন্ত্র হতে পারে। নন-আমেরিকান সুপারহিরো মুভি একটু এক্সপ্লোর করা যাক। বেশ কয়েকটার নাম অনেকে শুনেছেন, অনেকে শোনেননি। কয়েকটা বেশ জনপ্রিয়, কয়েকটা একেবারেই সুপার ফ্লপ। আগামী কয়েক সপ্তাহ আমরা এমনই কিছু সুপারহিরো সিনেমার দিকে আলো ফেলব।

 

নন আমেরিকান সুপারহিরো মুভি

পর্ব: ১

 

সাইকোকাইনেসিস

(দক্ষিণ কোরিয়া)

 

পরিচালক: ইওন সাং হো

 

 

সাইকোকাইনেসিস প্রথম কোরিয়ান সুপারহিরো মুভি। ট্রেন টু বুশান, সিওল স্টেশনের পরিচালক ইওন সাং হো ট্রেন টু বুশানের সিক্যুয়েল পেনিনসুলার কাজ শুরুর আগে এই ছবিটি বানান। মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন কোরিয়ান ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা 'মিরাকল ইন সেল নাম্বার সেভেন', 'দ্য টার্গেট' খ্যাত রিউ সিয়ং রিয়ং। সব মিলিয়ে সিনেপ্রেমীদের জন্য যথেষ্ট খুশি হওয়ার মতো উপাদান মজুত ছিল সাইকোকাইনেসিস সিনেমায়।

 

সাইকোকাইনেসিস শুরু হয় শিন রু মি নামের একটি মেয়ে এবং তার মাকে নিয়ে। রু মি মায়ের সঙ্গে সিওলে একটি ছোট রেস্টুরেন্ট চালায়, দ্রুত তাদের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে, সবকিছু ভালো চলতে থাকে। কিন্তু একই সময় রু মি এক ভয়ানক সমস্যায় জড়িয়ে পড়ে। তাদের রেস্টুরেন্ট এবং ছোটোখাটো ব্যবসায়ীদের দোকান পাটে ভর্তি এলাকাটি এক প্রভাবশালী কোম্পানির নজরে পড়ে। যেনতেন প্রকারে সেই জায়গা দখলের চেষ্টায় লেগে পড়ে তারা। পুলিশ এবং আইনকে নিজেদের ক্ষমতা বলে সম্পূর্ণ নিস্ক্রিয় রেখে তারা আক্রমণ শুরু করে, তাদের হাতে নিহত হয় রু মি'র মা।

মায়ের মৃত্যুর খবর রু মি দেয় বাবা সিউক হিউকে, যে প্রায় বিনা কারণেই স্ত্রী এবং মেয়েকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। সিউক হিউ যখন এই খবর পায়, ঠিক সেই সময়েই অদ্ভুত ভাবে সে এক অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী হয়। সদ্যপ্রাপ্ত ক্ষমতা দিয়ে সিউক হিউ কীভাবে মেয়ের লড়াইয়ে সামিল হয় এবং মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করে তাই নিয়ে এগোয় সাইকোকাইনেসিস।

 

সাইকোকাইনেসিস বেশ সুন্দর, ঝকঝকে সুপারহিরো সিনেমা হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু বিভিন্ন কারণে হয়ে উঠতে পারেনি। আমেরিকান সুপারহিরো ফ্র‍্যাঞ্চাইদের বদান্যতায় এখন সুপারহিরো সিনেমা বিশেষ অবাক করে না দর্শকদের। ভিজুয়াল, টেকনিকাল চাকচিক্য দিয়ে দর্শকদের আকৃষ্ট করা বর্তমানে খুব আলাদা কিছু নয়। ইওন সাং হো তাই একটু আলাদা ধরনের সুপারহিরো তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এই সিনেমার অনুপ্রেরণা ছিল একটি প্রকৃত ঘটনা, সেজন্যই হয়তো ইওন সাং হো'র সুপারহিরো ছাপোষা, সমস্যা থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাওয়া, বিবাদ এড়িয়ে চলা মধ্যবয়সি এক মানুষ। এই সুপারহিরো হঠাৎ, দুম করে নিজের শক্তি টের পেয়ে অবাক হয়ে যায়, তারপর সরাসরি নিজের মেয়েকে সাহায্য করতে চায়। অন্য কিছু তার মাথায় আসে না। তথাকথিত সুপারহিরোদের থেকে এই সুপারহিরোর শক্তিও কিছুটা আলাদা। একটি উল্কাপাত এবং তার সংস্পর্শে আসা ঝরনার জল খেয়ে অদ্ভুত শক্তি পায় সিউক হিউ। সাইকোকাইনেসিস বা টেলিকাইনেসিস শক্তি পায় সে। যে কোনো জিনিস মনের জোরে কন্ট্রোল করতে পারে সে--- এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নিয়ে যেতে পারে, অনায়াসে ভারি জিনিস মনের শক্তি দিয়ে তুলে নিতে পারে, উড়তে পারে। ইওন সাং হো'র  সিনেমার সুপারহিরো অনেকটা ২০১২ তে রিলিজ হওয়া আমেরিকান সিনেমা 'ক্রনিকল'-এর চরিত্রদের মতো। দুটি সিনেমার বিষয়ই টেলিকাইনেসিস এবং কিছুক্ষেত্রে ক্রনিকলের সঙ্গে সাইকোকাইনেসিসের মিল পাওয়া যায়। তবে তারপরেও সাইকোকাইনেসিস সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, প্রেক্ষাপট একদম নিজস্ব।

 

কোরিয়ান বাণিজ্যিক সিনেমায় আবেগের ব্যবহার লক্ষ্য করার মতো। ইওন সাং হো 'ট্রেন টু বুশান' সিনেমায় আবেগকে অ্যাকশন এবং হররের মোড়কে সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। সাইকোকাইনেসিসেও একই চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু সেই কাজে সফল হতে পারেননি।

সাইকোকাইনেসিসে আমরা বেশ কিছু বিষয় দেখতে পাই। প্রথমেই দেখা যায় রু মি সহ খেটে খাওয়া মানুষদের সঙ্গে সর্বগ্রাসী কর্পোরেট মাফিয়া শক্তির লড়াই। পরিচালক চেয়েছেন শ্রেণি সংগ্রামকে তুলে ধরতে, সেই সঙ্গে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের আইন-কানুন কীভাবে কর্পোরেটদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে সেটা পরিষ্কার ভাবে তুলে ধরতে। এই প্রেক্ষাপটে একজন সুপারহিরোকে এনে ফেলেছেন পরিচালক, মিরাকলের মতো।

 

পাশাপাশি সিউক হিউয়ের মধ্যের ছাপোষা, ভীরু মানসিকতার মানুষের পালটে যাওয়া... মেয়ের সঙ্গে ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক জুড়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা, ভালো বাবা হওয়ার চেষ্টা, অতীতের ভুল শুধরে নেওয়ার চেষ্টা---- এগুলোও পরিচালক আনার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ট্রেন টু বুশানে সাফল্যের সঙ্গে সেটা পারলেও, এক্ষেত্রে কিছুটা খাপছাড়া রয়ে গেছে। বাবা-মেয়ের সম্পর্কের আবেগ সেই মাত্রায় পৌঁছয় না সাইকোকাইনেসিসে।

 

তবে বেশ কিছু দিক একসঙ্গে, অল্প সময়ে দেখাতে গিয়ে পরিচালক ব্যর্থ হয়েছেন। কোনোকিছুই ভালোভাবে দেখানো যায়নি। এত সুন্দর এবং নতুনত্বে ভরা গল্প মার খেয়ে যায় অত্যন্ত দুর্বল স্ক্রিপ্টের জন্য। গল্পের নাটকীয়তা, আবেগের জায়গা, সম্পূর্ণতা---- সমস্তই যেন জোর করে মেলানোর চেষ্টা। শেষ পর্যন্ত কোনোটাই সেভাবে দেখানো সম্ভব হয়নি। ট্রেন টু বুশানে যে জায়গায় সফল ছিলেন পরিচালক, এখানে ব্যর্থ। যদিও দুটি জঁর আলাদা, তবু দুর্বল স্ক্রিপ্টের জন্য সাইকোকাইনেসিস পিছিয়ে যায় অনেকটা। সেই সঙ্গে কমেডির ব্যবহার স্ক্রিপ্টের বাঁধুনি আলগা করেছে। বেশিরভাগ কমিক দৃশ্যই জোর করে রাখা হয়েছে বলে মনে হয়েছে, উপভোগ্য হয়ে ওঠেনি। বরং কাহিনির গাম্ভীর্য কমিয়েছে।

সিনেমায় একজন শক্তিশালী ভিলেনের অভাব বেশ লক্ষ্যণীয়। যদিও কর্পোরেট কোম্পানির মাধ্যমে রিয়েলিস্টিক, অর্থবহ প্রতিপক্ষ হাজির করেছেন লেখক-পরিচালক। কিন্তু ব্যক্তিত্বময় অথবা মনে দাগ কাটার মতো খলনায়ক কেউ নেই। যদিও পরিচালক সম্ভবত খলনায়ক হিসেবে সমষ্টিগত ভাবে কর্পোরেট দুনিয়া এবং রাজনীতির নোংরা পৃথিবীকেই রেখে গল্প এগোতে চেয়েছেন। যেখানে খলনায়ক কোনো একজন নয়, অনেকে। সিনেমার মূল বিষয় যেহেতু শ্রেণী সংগ্রাম এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, তাই প্রতিপক্ষ হিসেবে সমষ্টিগত অন্যায়কারীদের দেখাতে চেয়েছেন লেখক-পরিচালক ইওন সাং হো।

 

অভিনয়ে সবাই বেশ ভালো, রিউ সিয়ং রিয়ং বরাবরের মতোই সিউক হিউয়ের ভূমিকায় অনবদ্য। স্ক্রিপ্টের খামতি ঢেকে দিতে সাহায্য করেছেন রিউ। রু মি'র ভূমিকায় সিম ইউন কিয়াং এবং অন্যান্য চরিত্রে বাকিরা সাধ্যমতো চেষ্টা করলেও স্ক্রিপ্টের কারণে তেমন সুবিধে করতে পারেননি।

সাইকোকাইনেসিসের সিনেমাটোগ্রাফি বেশ ভালো হলেও ভিজুয়াল এফেক্টসে বাজেটের অপ্রতুলতা সহজেই চোখে পড়ে। আবহসঙ্গীতও মনে রাখার মতো নয়। 

 

তবে সব মিলিয়ে সাইকোকাইনেসিস বাজে অভিজ্ঞতা নয়। আমেরিকান সুপারহিরোদের সাম্রাজ্যে নতুন প্রচেষ্টা হিসেবে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য। সুপারহিরো সিনেমা হিসেবে যথেষ্ট বাস্তবিক এবং মানবিক থাকার চেষ্টা স্পষ্ট। সেই সঙ্গে সুপারহিরো মানেই আকর্ষণীয়, শক্তপোক্ত হতে হবে... এ ধরনের ভাবনা ভেঙেছে এই সিনেমা। জীবনযুদ্ধে ব্যর্থ হতে থাকা কেউ সুপারহিরো হতে পারে, সেখানে বয়স কোনো বাধা নয়---- এই  বার্তাও দিয়েছে এই সিনেমা। ইওন সাং হো আশা অনুযায়ী একটি মনে রাখার মতো সিনেমা দিতে না পারলেও, একটি স্বতন্ত্র সুপারহিরো উপহার দিয়েছেন।