• ১২ কার্তিক ১৪২৭, বুধবার
  • 28 October 2020, Wednesday
কথাবার্তা ছবি: ইন্টারনেট।

কথাবার্তা

ইলোরা চট্টোপাধ্যায়

Updated On: 15 Oct 2020 12:00 am

সন্ধ্যে থেকে শিমশিমে বৃষ্টিতে ফাঁকা জায়গা আরো ফাঁকা হয়ে গেছে। ঝুপঝুপ জলের আওয়াজ আর  নুয়ে পড়া অন্ধকার এই জায়গাটার গায়ে শ্যাওলার মত আটকে আছে। সকালে একটু  আলো এলেও  চাঁদের প্রবৃত্তি নেই এখানে উঁকি দেওয়ার। কয়েকটা নেড়ি কুকুর এখানে একবার কি দুইবার আসতো দিনে। পচা দুর্গন্ধ মাড়িয়ে তারাও আজকাল আসা বন্ধ করে দিয়েছে। তাই মর্গের ঠান্ডা আর রাতের নীরবতা মেখে জায়গাটা বুড়োবটের মত ধুঁকছে। 

 ঠন ঠন ধাতব আওয়াজ কমে যেতে আর জুতো মসমসিয়ে চলে যাওয়া অবয়বগুলো হালকা হতেই সাপের মত নিজের ভারী ধাতব শরীর কাঁপিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসলো ২২২০১। ফিসফিসিয়ে পাশের ২২৯কে ডাকলো

- কি ভায়া ঘুমোলে! বলি,   ভায়া।

- ঘুম! কী যে বলো তুমি দাদা। ২৩শে মার্চের পর থেকে তো খালি ঘুমোচ্ছি। আর কত ঘুমাবো বলো দেখি! 

- বড়কর্তারা এসেছিল তো।

- জি আর পি এফ? কেন এসেছিল গো? সঙ্গে কারা ওরা!

- এসেছিল দেখতে, কেমন আছি আমরা। সঙ্গে ওই ইঞ্জিনিয়ার হবে। নেড়ে ঘেঁটে, হাতুড়ি ঠুকে দেখলো, কলকব্জা সব ঠিক আছে কিনা। তুই বুঝতে পারিস নি!

-  বুঝেছি দাদা।। চুপ করে ছিলাম। 

-  আমার তো হাড় কনকনিয়ে গেল।

-  তাহলে কী আবার চালু হবে! কী মনে হচ্ছে!

- কী জানি ভাই। সারা শরীরে জং ধরে গেল বসে বসে। একসময় কত ছটফটে ছিলাম যে। ঝমঝম করে যেতাম যখন ব্রিজের ওপর দিয়ে আশেপাশের লোকজন  তাকিয়ে দেখতো। হ্যাঁ, যাচ্চে বটে একটা দূরপাল্লা।

-  ছটফটে! হ্যাঁ সে আমিও ছিলাম বটে।  দিনে কতবার আপ ডাউন করেছি বলতো। আমার আসার খবরে লোকে ব্যস্ত হয়ে উঠত , বনধের দিনে মানুষের সেকি ভোগান্তি আমি না থাকলে। 

-   দিনের পর দিন কলকাতা পুরী করেছি আমি। তখন কী ফিট আমি , আর এখন দেখ! গতর যেন নাড়াতে কষ্ট হয় আজকাল। যেদিন প্রথম উদ্বোধন করলো মুখ্যমন্ত্রী, কেমন মালা দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিল আমায়। ঠান্ডা এসি কামরায় ভরে গেলাম আমি।

- তা যা বলেছো। তখন তোমায় দেখে মাইরি কী হিংসে হত।

-  আর হিংসে!  আমারও কী তখন কম দেমাক ছিলো রে। ঘঙ ঘঙ কাশির আওয়াজে অন্ধকার কারশেড কেঁপে ওঠে।

-  কতদিন মানুষের আওয়াজ শুনিনা। আর একটা সময় হৈ হুল্লোড়ে ভরে থাকতাম। তুমি যদিও আমার থেকে বয়েসে আর পদমর্যাদাতে অনেক বড়।

-  রোজ শ্যাম্পু সাবান মেখে কেমন স্নান করতাম বলতো! গাটা আমার হিরের মত ঝলকাত যেন।

-  হুঁ হিরে না জিরে! 

-  খবরদার!

-  আহা, রাগ করো ক্যান! আমায় তো ক্বচিৎ কখনো হোস পাইপের জলে ভেজাতো। নাহলে ওই বৃষ্টি সম্বল আমার।

-  তোর গায়ে গুটখা, পানের পিক ভরে থাকতো আমি দেখিনি নাকি। তোর জন্য ওই বৃষ্টির জলই ভালো।

-  তা বাপু লোকাল  ট্রেন এমনই হয়। সতীনের পো এর মত।

-  হ্যাঁ, তা যা বলেছিস। বিকেল হলেই আমার জন্য স্টেশন যেন সেজে  উঠতো, বল। ছেলে পুলে, শ্বশুর শাশুড়ি, বাবা মা নিয়ে সব যেত পুণ্য করতে। আর আলোয়, চা ,ঝালমুড়িতে মেতে উঠতো কামরাগুলো। আহা, দেখেও শান্তি।

-  সে বাপু আমারও। কত রকমের ফেরিওয়ালা, ফলওয়ালা, সবজির ঝুড়ি নিয়ে গেট জুড়ে বসে থাকা ভেন্ডাররা। কেউ ইঁদুর মারার বিষ বেচে তো, কেউ গান শোনায়। কী বলব তোমায়, আপিস টাইমে থিকথিক ভিড়ে ঝগড়া, চেঁচামেচি, সেগুলোও কী মধুর লাগতো আমার। কী সব সোনালী দিন ছিল গো।  

-  রাতের স্টেশনগুলো কেমন একা হয়ে চুপ করে বসে থাকতো, আর আমার সেটাই ভালো লাগতো। রাতের অন্ধকার চিরে রাজার মত ঘোড়া ছুটিয়ে যেতাম আমি।

-  আর আমার কপাল ভাবো। সেই ভোর রাতে উঠে ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে ছুটতাম। আর ফিরতে ফিরতে সেই রাত সাড়ে ১২টা প্রায়। কী শীত, কী গরম। বর্ষা মাথায় নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। 

-  শীতের দিনে খুব কষ্ট হত না রে!

-  খুউউব। এই কারশেডের বাইরে যেতে ইচ্ছে হত না ওই মাঘ মাসে। একটু জুবুথুবু হয়ে ঘুমোবার উপায় আছে! ফার্স্ট ট্রেন বলে কথা। কোনোমতে চোখে মুখে জল দিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। আর আজ দেখো ঘুমোতে ইচ্ছে করে না।

-  তুই তো তাও রাতে শুতিস কয়েক ঘন্টা। আমার তো সারারাত চলতো। সন্ধের দিকে প্যাসেঞ্জার নিয়ে বেরোতাম, সকাল ৮/৯টা নাগাদ পৌঁছুতাম। 

-  বেলার দিকে তো ঘুম দিতে!

-  কই আর! কয়েকঘন্টা পর আবার প্যাসেঞ্জার নিয়ে ফেরার পথ ধরতাম। একবার কী হলো জানিস!

-  কী গো!

-  সেবার শরীরটা একদম বিগড়লো। পাগুলোয় জোর নেই। রেললাইনের ওপর রাখতে পারছি না। ওরা আমার দুটো তিনটে পা ভালো করে চেক করে ছেড়ে দিলো। 

-  তারপর!

-  তারপর! ঘরঘরে গলায় ২২২০১ বলল, তারপর মাঝরাতে আমার পাগুলো ফসকে গেল লাইন থেকে। সামলাতে চেয়েছিলাম আপ্রাণ। পারলাম না জানিস। কয়েকটা বগি নিয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়লাম অন্ধকার মাঠের ওপর। ধু ধু করছে চারপাশ। অন্ধকারের মিশমিশে গন্ধ আর চিৎকার, কান্না। আহ, আজও কানে আসে। কী বলবো তোকে। সে যে কী আর্তনাদ। উফফ, মা গো।

-উফফ, কী সাংঘাতিক। এসব ভেবো না এখন। 

-তুই বুঝবি না রে, দায়িত্ব , এ যে মহা দায়িত্ব।

-বুঝি বুঝি।  আমারও এমন কয়েকবার হয়েছে।

-তুই উল্টে গেছিলি?

-না গো। আমি তো থ্রুট্রেন । কয়েকটা স্টেশনে না দাঁড়িয়ে হুশহুশ করে চলে যাই। তো সেবার স্টেশনে বলছে চিৎকার করে, আমি আসছি, সবাই যেন সরে যায়, বারবার বলছে।

-তারপর! 

-তারপর, হঠাৎ কোথা থেকে একটা লোক অন্ধকার ফুঁড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার সামনে। আমি শুধু দেখলাম জানো, কিছু করতে পারলাম না। চোখের নিমেষে,,,,,

-থাক থাক, চুপ কর।

- চুপই তো দাদা। সেই সাত মাস ধরে চুপ। আর কোনোদিন আমরা আবার ছুটব ,তোমার কী মনে হয়!

- রেললাইনগুলো দেখেছিস! মরচে ধরে গেছে। 

- ছুটির দিনে এখন লোকে কী করে গো দাদা। তখন তো কেমন সেজেগুজে ছানাপোনা নিয়ে বেড়াতে যেত। কত প্রেম, কত হাহাহিহি সব কেমন চুপ হয়ে গেল।

- আমাদের এবার রিটায়ার করাবে মনে হয়। সব কেমন রংহীন, বিবর্ণ হয়ে গেছে। এসি কোচগুলো, পর্দা দেওয়া জানলা গুলো, সব ভিজে স্যাঁতসেঁতে। নিজেকে দেখেছিস! কালিঝুলি মেখে কেমন হয়ে গেছিস

- ও দাদা, সে তো তুমিও। তোমার গায়ে আবার টয়লেটের পুতিগন্ধ।

- জানি রে জানি। এভাবেই রয়ে যাব আমরা।

- চলো দাদা চলো। মেলা রাত হলো। ঘুমাই এবার।

- হ্যাঁ চল। ঘুমাই।

 

রাত ঘনিয়ে আসা কারশেডে সরীসৃপের মত চেহারা নিয়ে ট্রেনদুটো চুপ করে। ট্রেনের হাতল, সিট, জানলাগুলো এতক্ষন কান পেতে ওদের কথা শুনছিলো। সেই হকারদের দিন, নিত্যযাত্রীদের দিন, কলেজ পড়ুয়াদের দিন, প্রেমিক প্রেমিকাদের দিন, সেই কথা, চিৎকার, ঝগড়া, জানলার ধারের সিট নিয়ে হাতাহাতি, তাসের জমে ওঠা খেলা বুকে নিয়ে ওরাও রাত ঘুমে ঝিমোতে লাগলো। বাইরের পৃথিবী জানলো না, ওদেরও কান্না পায়, ওদেরও জমা কথা আছে, ওরাও আজ বড্ড একা।