• ১২ কার্তিক ১৪২৭, বুধবার
  • 28 October 2020, Wednesday
দশের নীচে শূন্যপথে ছবি: ইন্টারনেট।

দশের নীচে শূন্যপথে

সঙ্কর্ষণ ঘোষ

Updated On: 15 Oct 2020 12:00 am


জনগণের পক্ষ থেকে শাসককে দাবিপত্র তুলে দেওয়া গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষে আইনত সিদ্ধ হলেও প্রাপকের পক্ষে সে অপমান সহ্য করা যেন ক্রমাগতই কঠিন হয়ে উঠছে। সত্যি বলতে কি এ কথাও তো ঠিক যে সাধারণ মানুষ আইনসভার দ্বারস্থ না হয়ে সরাসরি পথে নেমে রাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব বোঝাতে একমাত্র তখনই বাধ্য হয় যখন অন্য কোনো পথের সে সন্ধান পায় না।


শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে দাবিপত্র গ্রহণের উদাহরণ ভারতবর্ষে আদৌ আছে কিনা সে সম্পর্কে নিশ্চিত না থাকলেও এটুকু ধারণা অবশ্যই সম্ভব যে রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং লোকবল যদি পরস্পরের সমকক্ষ না হয় সেক্ষেত্রে তথাকথিত সবল নিশ্চয়ই বিপক্ষের বিরূদ্ধে দমননীতি গ্রহণ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না? যদিও স্বরাষ্ট্রব্যবস্থা গণতন্ত্রের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্তম্ভ, কিন্তু এক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের দায় কি সে উপেক্ষা করতে সক্ষম? 


গত বছর পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন শাসক দলের এক তরুণ সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাতে সে স্মিতহাস্যে আমাকে তার পায়ে একটি দাগ দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রহারের চিহ্ন হিসাবে দাবি করেছিল। অথচ নবান্ন অবধি সেই পদযাত্রার শেষে জনৈক শান্তিরক্ষকের দেহে রক্তের নামে আলতার সন্ধানপ্রাপ্তিতে গণমাধ্যম যে নিন্দাবাদে পূর্ণ হয়ে উঠেছিল আমরা সকলেই তার সাক্ষী ছিলাম। অনেকের এও বক্তব্য ছিল যে, এক্ষেত্রে লোকবল স্বরাষ্ট্রব্যবস্থাকে পরাজিত করেছে।


কিন্তু প্রশ্ন হল যে মাত্র একটি বছরের ব্যবধানে এমন এক দল এই সেদিন অবধিও পশ্চিমবঙ্গে যাদের অস্তিত্ব সেভাবে স্বীকৃতই ছিল না, তাদের সমান দাবিসহ পত্রদানের পদযাত্রায় পূর্বোক্ত স্বরাষ্ট্রব্যবস্থা এমন সুসজ্জিতভাবে তৈরি রইল কীসের তাড়নায়? নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পূর্বে যানবাহন সংক্রান্ত ভোগান্তি আরম্ভ হয়ে যায় এবং তা শেষ হয় রাসায়নিক মিশ্রিত বারিধারার যুদ্ধে (গৃহীত সিদ্ধান্ত হিসাবে যা সম্পূর্ণ আইনবিরূদ্ধ)।


মহানাগরিক স্বরাষ্ট্রব্যবস্থার প্রহারেণ ধনঞ্জয় নীতিকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে গিয়ে গণমাধ্যম মূলত যা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছে তা হচ্ছে বিরোধীকে সমীহ করবার সমীচীনতা। বিরোধী হিসাবে প্রাক্তন রাজ্য শাসকদলের পদযাত্রার সঙ্গে বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসকদলের পদযাত্রার গুরুত্বের পার্থক্য বিবেচনা করলেই তা পরিস্ফূট হয়ে যায়। নিরস্ত্র লোকবলের বিরূদ্ধে যখন রাষ্ট্র তার পোষ্য দুর্বৃত্ত বাহিনীকে সশস্ত্র এগিয়ে দেয়, ধর্তব্য যে এর ক্ষমতা অবশ্যই অধিকতর।


যদিও স্থান-কাল-পাত্রের বিচারে বিরোধী দলের ভীতিও রীতিমতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন দেখা যায় যে নবান্নর নিকটবর্তী স্থানে পদযাত্রা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় একবারের জন্যও সে তার বহুব্যবহৃত ব্রহ্মাস্ত্র সাম্প্রদায়িকতার নামোচ্চারণ করে না। কিন্তু এর তুলনায় অধিকতর লক্ষ্যণীয় যে দেশব্যাপী অলিখিত প্রধানতম বিরোধী মতাদর্শ হয়েও প্রাক্তন রাজ্য শাসকদল এ ঘটনা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য রাখতেই অপারগ।


তবে সত্যিই ঘটনার অভ্রান্ত মূল্যায়ন হয়নি নাকি তা হলেও প্রকাশিত হয়নি সেই উত্তর অজানা থাকলেও গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসাবে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বর্তমানে নিজস্ব ভূমিকা যে কতখানি পালন করছে তা সর্বজনবিদিত। তবু মতপ্রকাশে মাধ্যমের অভাব বা পক্ষপাতী অবস্থানকে উপেক্ষণীয় বিষয় বলা যেতেই পারে। প্রকৃত সত্য গোপনে থাকবার তো কথা নয়... 


শতকরা হিসাবে এত হতশ্রী পরিণতির কারণ যে কিঞ্চিৎ অনুমেয় তা বলাই বাহুল্য।