• ১২ কার্তিক ১৪২৭, বুধবার
  • 28 October 2020, Wednesday
বিরোধীশূন্য গণতন্ত্র, বিপন্ন ভারতবর্ষ ছবি: ইন্টারনেট।

বিরোধীশূন্য গণতন্ত্র, বিপন্ন ভারতবর্ষ

সঙ্কর্ষণ ঘোষ

Updated On: 13 Oct 2020 12:02 am

 

স্বাধীনতা উত্তর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেশীয় আন্তর্জাতিক ঐতিহাসিকগণ মূলত যে সমস্যাটি তাঁদের গবেষণাপত্রে বারংবার উদ্ধৃত করেছেন তা হল নীতিগত ক্ষেত্রে এদেশে তত্ত্বের ব্যাখ্যান প্রায়োগিকতার পরস্পরবিরোধী অবস্থান। অর্থাৎ সংখ্যাধিক্যের সম্মতিক্রমে যে মনোভাব রেখে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়, বাস্তবে তা আরোপ করতে কর্তৃত্বকে এত অতিরিক্ত পরিমাণে বৈপরীত্যের সম্মুখীন হতে হয় যে ফলস্বরূপ কেবল মূল উদ্দেশ্য সাধনের বিফলতাই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বয়ং সমস্যাই প্রায় সম্পর্কবিহীন এবং তুচ্ছাতিতুচ্ছ অপর কোনো বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে প্রত্যেকের মতামত রাখবার আইনত অধিকারই এই সমস্যার জন্য অনেকাংশে দায়ী, কারণ আলোচ্য বিষয়ে অসম্মত ব্যক্তিত্ব নিতান্ত সংখ্যালঘু হলেও তাঁদের স্বার্থও কিন্তু অবশ্যগ্রাহ্য




 

সম্ভবত স্বার্থরক্ষাবশত এই দ্বান্দ্বিকতাই সংবিধান প্রণেতাদের শাসক বিরোধী উভয়পক্ষকে যৌথভাবে গণতন্ত্রের প্রথম স্তম্ভের মর্যাদাদানে প্ররোচিত করেছিল, যাতে নতুনতর পদক্ষেপ গ্রহণে সংখ্যাধিক্যের (তৎকালীন শাসক) মতামতই শেষ অবধি গ্রাহ্য হলেও তাতে যা কিছু ভ্রান্ত তা পারতপক্ষে বিরোধীদের প্রাথমিক বাধার সম্মুখীন হয়, তা সে সাধারণ নির্বাচনে উভয়ের প্রমাণিত গ্রহণযোগ্যতা যতটুকুই থাকুক না কেন। এরপরেও যদি কোনো বিষয়ের সমাধান আইনসভায় একান্তই না ঘটে তখন শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করতে গণতন্ত্রের দ্বিতীয় স্তম্ভ অর্থাৎ বিচারালয়আছে, বাদানুবাদ যদি বৃহত্তর আকার ধারণ করে উপরোক্ত সভাদ্বয়ের বহির্জগতে শান্তিভঙ্গ করে সেক্ষেত্রে তৃতীয় স্তম্ভ হিসাবে নিজ দায়িত্ব পালন করবে স্বরাষ্ট্রব্যবস্থাএবং আপামর জনগণের সঙ্গে উপরোক্ত তিন পক্ষের প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করবে চতুর্থ স্তম্ভ অর্থাৎ সংবাদমাধ্যম

 

আপাতদৃষ্টিতে এগুলির প্রতিটিই রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বায়ত্তশাসিত অঙ্গ হলেও রাষ্ট্রবাসীর ভাগ্যনিয়ন্তা মূলত আইনসভাই, যেহেতু সেই কক্ষে অধিষ্ঠিত প্রত্যেকেই জনপ্রতিনিধিবা সাংবিধানিক প্রেক্ষিতে আপামর রাষ্ট্রবাসীর প্রতিভূ, যাঁরা স্বয়ং বিভিন্ন বিষয়ে বহুপাক্ষিক দ্বন্দ্বের উৎস। লক্ষ্যণীয় যে সমর্থনের সংখ্যাধিক্যে নির্বাচিত শাসক হিসাবে একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রত্যক্ষ রাজনীতি করা একপ্রকার অসম্ভব হওয়ায়, সর্বোচ্চ পদে আসীন না হওয়া পর্যন্ত (বিরোধী থাকাকালীন) যতটুকু অভিজ্ঞতা তাদের দ্বারা সঞ্চিত হয়েছে কেবল তার প্রেক্ষিতেই তারা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্রতী হয় এবং প্রাণপণে অপর দলগুলির গুরুত্বকে অস্বীকার করতে থাকে। আশ্চর্য যে সংবিধানে কিন্তু বিরোধীকে যৌথভাবে প্রাধান্য দেওয়াই হয়েছিল কঠোর সমালোচনার দ্বারা একটি সরকারকে পরোক্ষে সাহায্য করবার জন্য। গণতন্ত্রে নির্দিষ্ট কোনো একটি দল যে অপরিহার্য নয় তা যেমন এতদ্বারা প্রমাণ করা সম্ভব, তেমনই সম্ভব অপর দল বা দলগুলির অস্তিত্বের যৌক্তিকতা প্রমাণ

 

কিন্তু সেসব প্রমাণের পরিবর্তে যখন তত্ত্ব প্রয়োগের ব্যবধান পূর্বের তুলনায় স্পষ্টতর হয়, তখন সর্বপ্রথম অনুভূত হয় যে বাস্তবিক গণতন্ত্র ঠিক কীভাবে ধীর পদক্ষেপে একনায়কতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে (ঠিক যে কারণে ভারতবর্ষকে মৌখিকভাবে হলেও বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের মুখোশটুকু পরানো হয়েছিল?) যেখানে স্বরাষ্ট্রব্যবস্থার দায়িত্ব ছিল নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সময়ের সঙ্গে তা হয়ে দাঁড়াল কেবল শাসকশ্রেণীর স্বার্থরক্ষা। সংবাদমাধ্যম যেখানে হতে পারত প্রত্যক্ষ রাজনীতি করা প্রতিটি মানুষ মূলত বিরোধীপক্ষের মুখপত্র, একনায়কতন্ত্রবশত নিজস্ব অস্তিত্বরক্ষার্থে তা হয়ে দাঁড়াল কেবল শাসকের প্রচারপত্র। একনায়কতন্ত্রে যত দ্রুত স্বৈরাচারের পথে অগ্রসর হতে থাকে বিচারালয়ের গুরুত্বও এর সমানুপাতে হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ রাজনীতি থেকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চিরকালের মতো অদৃশ্য হয়ে যায়, যার ফলে দেশবাসীর একাংশের সমস্যা সম্পর্কে স্বয়ং রাষ্ট্রযন্ত্রই অবগত থাকে না। কিন্তু এও মূলত স্বৈরাচারমুখী একনায়কতন্ত্রেরইচরিত্র মাত্র, আদর্শ স্বৈরাচার নয়

 

এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে শোষিত মানুষের সংখ্যা যদি শোষকের তুলনায় অধিকতরই হয় সেক্ষেত্রে কোনোপ্রকার মাধ্যম ব্যতীত কি তাদের দাবি জনসমক্ষে আসা সম্পূর্ণ অসম্ভব? তাত্ত্বিকভাবে তা কখনোই নয়, যেহেতু বার্তা ব্যক্তি তার ব্যক্তিত্বে বহন করে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারমাধ্যম সেখানে নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর। অতএব ধর্তব্য যে আপন চাহিদা সম্পর্কে তারা স্বেচ্ছায় নীরব। ঠিক এখানেই আসছে একনায়ক স্বৈরাচারীর অন্যতম পার্থক্য যে জনৈক একনায়ক উচ্চাসনে নিজস্ব অস্তিত্ব সম্পর্কে অধিকতর নিশ্চিন্ত থাকায় ক্ষণিকের দমননীতির আশ্রয়নেয় এবং আতঙ্কবশত স্বৈরাচারী বিশ্বাস করে আংশিক দাবিপূরণের রাজনীতিতে ফলস্বরূপ প্রথমটির ক্ষেত্রে আন্দোলন সংগঠিত হয় এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আন্দোলন প্রশমিত হয়। যদিও তত্ত্বগতভাবে উভয়ক্ষেত্রেই আন্দোলনের তীব্রতা ক্রমবর্ধমান থাকা উচিত, কিন্তু বাস্তবে ফলাফল পৃথক হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিবাদ আংশিক থেকে সম্পূর্ণ চাহিদার পথে অগ্রসর হতে পারে না

 

এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠতেই পারে যে গণতন্ত্রে বিরোধীর লক্ষ্য কি তবে কেবল শাসকের পদে নিজেকে অধিষ্ঠিত করা? উত্তর হল ‘না’ তবে কি আলোচ্য পরিস্থিতিতে বিরোধীপক্ষে অবস্থান করেও শাসককে প্রভাবিত করা সম্ভব? তারও উত্তর হবে ‘না’ তাত্ত্বিকভাবে ব্যক্তিস্বার্থের সংকীর্ণ পরিসর বহির্ভূত নৈতিকতা অনুযায়ী জনৈক বিরোধী সর্বদাই নিজ অনুসৃত রাজনৈতিক মতাদর্শকেউচ্চাসনে প্রতিষ্ঠার প্রয়াসী এবং কেবল আদর্শ বিরোধীর পক্ষেই গণতন্ত্রের আদর্শ অভিভাবক হয়ে ওঠা সম্ভব, যেটি শাসকের প্রাথমিক কর্তব্য। এই কারণেই একটি উত্তম রাজনৈতিক দলের ঠিক ৩টি অংশ থাকা আশু প্রয়োজন, যথা--- মস্তিষ্ক (সংখ্যালঘু, মতাদর্শের ধারক বাহক), হৃদয় (তুলনায় সংখ্যাগুরু, কেবল নেতৃত্বের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের প্রতিভূ) এবং দেহ (সংখ্যাগরিষ্ঠ, গড্ডলিকা প্রবাহের অংশীদার) রাজনৈতিক ক্ষমতা অধিকারের পরে উক্ত প্রথমাংশ সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী হবে, দ্বিতীয়াংশ সেগুলির প্রয়োগে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করবে এবং তৃতীয়াংশ দায়িত্ব নেবে নতুনতর সমর্থকগোষ্ঠী নির্মাণের

 

সমস্যা হল প্রথম যখন মতাদর্শ তৈরি হয় সেই মুহূর্তে কিন্তু উপরোক্ত কোনো অংশেরই অভাব অনুভূত হয় না, যা কিছু সমস্যা দেখা দেয় প্রাথমিক বাধাপ্রাপ্তির পর। ব্যক্তিস্বার্থের ন্যায় স্পর্শকাতর বিষয়কে অতিক্রম করবার তত্ত্ব ততক্ষণ অবধিই সত্য যতক্ষণ অবধি তা ন্যূনতম আহত হয়। যদি এই আঘাতবা সেটব্যাক দলের মধ্যে আত্মসমালোচনার জন্ম দেয় তাহলে তা ঠিক দুটি পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যায়, প্রথমত দ্বান্দ্বিক নীতিবা ডায়ালেক্টিকাল , দ্বিতীয়ত গুণগত অগ্রগামী উল্লম্ফনবা কোয়ালিটেটিভ ফরোয়ার্ড লিপ কিন্তু যখনই কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাবর্তন অসম্ভব হয়ে পড়ে প্রথম অস্তিত্বসংকট দেখা দেয় দলের তৃতীয়াংশে, যেহেতু তাদের নিজস্ব কোনো চিন্তাধারা নেই। তাদের পরিণতি দেখে নেতৃত্বের ওপর বিশ্বাস হারায় দ্বিতীয়াংশ, যার ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়ে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের ধারক বাহকেরা। তখন তাদের হাতে মাত্র দুটিই বিকল্প থাকে, রাজনীতি অথবা আদর্শ, যে কোনো একটি নির্বাচন করতে হয়। একথা বলাই বাহুল্য যে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অনুযায়ী রাজনীতির মতো কঠিনতর ক্ষেত্রে মানুষ নিজস্ব অংশগ্রহণ বৃথা যেতে দিতে চায় না

 

এভাবেই স্বৈরাচারী শাসক প্রথমে গণতন্ত্রে বিরোধীর অস্তিত্ব এবং এর সমান্তরাল নতুনতর প্রতিপক্ষের উত্থান স্তব্ধ করে নিজের পথ সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক করে নেয়। অতএব অবস্থা দাঁড়ায় কিছু এই প্রকার। প্রথম স্তম্ভ হিসাবে আইনসভায় শাসকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, বিরোধী গুরুত্বহীন ছিল, আছে, থাকবে। দ্বিতীয় স্তম্ভ বিচারালয়ের আপাতদৃষ্টিতে কোনো গুরুত্বই নেই যে তা মূলে পৌঁছে সমস্যার সমাধান করবে। তৃতীয় স্তম্ভ স্বরাষ্ট্রব্যবস্থা একটি শাসকপোষিত দুর্বৃত্তবাহিনী ব্যতীত অন্য কিছু নয়। চতুর্থ স্তম্ভ কেবল শাসকের ব্যক্তিগত প্রচারমাধ্যম হিসাবেই কর্মরত। এমতাবস্থায় শাসক অন্তর্গত মনুষ্যত্বের শেষটুকুও পরিত্যাগ করে নিজের উত্থানের ইতিহাস সম্পূর্ণ বিস্মৃত হবে এবং এমন এক ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তৈরি করবে যাদের অভিধানে রাষ্ট্রীয় অভিভাবকত্বনামে কোনো শব্দবন্ধই নেই। রাজনৈতিক পরিভাষায় এই বীভৎসতা অক্ষমের ক্ষমতায়নবা জাস্টিফিকেশন অফ দ্য ইনজাস্টিফায়েডনামে পরিচিত। যে গণতন্ত্র এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বুঝতে হবে বাস্তবে তার অস্তিত্ব শূন্য হয়ে গেছে

 

এখানেই আসছে মূল বক্তব্য যে রাষ্ট্রের খোলস ধারণ করে সংবিধানের সাহায্যে শাসক যদি বহুসংখ্যক অদূরদর্শীকে এই প্রমাণ দিতে সক্ষম হয় যে রাজনীতিতে প্রবেশ করতে কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আদৌ প্রয়োজন নেই তাতে প্রথমত তৈরি হবে অজস্র প্রশ্নহীন আনুগত্যের প্রতিমূর্তি, দ্বিতীয়ত আদর্শ শিক্ষিত যোগ্যতর ব্যক্তিগণ এই ক্ষেত্র ঘৃণাভরে ত্যাগ করবে। ফলস্বরূপ শাসকের ব্যর্থতাবশত যারা সর্বাধিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তারাই নিজ দায়িত্বে শাসককে নির্বাচনের বৈতরণী পার করিয়ে দেবে, উপরন্তু আইনত দুর্বৃত্তবাহিনীর পাশাপাশি যে আইন-বহির্ভূত দুর্বৃত্তবাহিনীটি প্রয়োজন তার নির্মাণে এরা স্বেচ্ছায় অগ্রসর হবে এবং কার্যসমাধার পরে নির্দ্বিধায় এদেরকে মৃত্যুর করাল গ্রাসে তুলেও দেওয়া যাবে। পৃথিবীতে নৈতিকতার (সে রাজনৈতিক হোক বা সাম্প্রদায়িক) অপব্যবহার দ্বারা আজ অবধি যত সমাজবিরোধী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে তা ঠিক এই মনোবৃত্তি থেকেই। পূর্বে উল্লিখিত যারা শেষ অবধি আদর্শের পরিবর্তে অবস্থানকে নির্বাচন করেছিল মূলত তারাই হয় এই কর্মযজ্ঞে শাসকের সর্বোত্তম অস্ত্র। নৈতিক পরিভাষায় এরা ছদ্ম-বুদ্ধিজীবীবা সিউডো ইন্টেলেকচুয়ালনামে পরিচিত।  

 

স্মর্তব্য যে যারা এখানে আলোচ্য এবং যাঁরা এখানে আলোচক তারা কিন্তু কেউই পরস্পরের তুলনায় পৃথক নন। শাসক শোষক চিরকালই শাসিত শোষিতের মধ্যে থেকেই আসে। শাসক যেখানে সংখ্যালঘুর ওপর নির্দ্বিধায় অত্যাচার করতে সক্ষম, ধর্তব্য যে আমরাও প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে সেই কাজের সমর্থক। সাংবাদিকদের অপমানকর আর্থিক দয়াভিক্ষাবা বখশিস প্রদান দ্বারা যদি শাসক আপন ব্যর্থতা পর্যালোচনার পরিবর্তে জনৈকা অভিনেত্রীর জীবনযাত্রা সম্পর্কে লেখবার প্ররোচনা দানে সক্ষম হন, এর অর্থই হল সাংবাদিককূলের পাশাপাশি আমরাও তাৎক্ষণিক ত্যাগ অস্বীকারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। শিক্ষার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিনিয়োগের পরিবর্তে যদি শাসকের পক্ষে বর্তমান পরিস্থিতিতেও উৎসবের নিমিত্ত অজস্র অর্থ ব্যয় করা সম্ভবপর হয়, সেক্ষেত্রে একথা প্রমাণিত যে অদূর ভবিষ্যতের তুলনায় বর্তমান ভোগেই আমরা অধিকতর উৎসাহী। শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় বর্ণাশ্রম নির্বিশেষে ধর্ষণ ক্রমবর্ধমান হওয়া সত্ত্বেও যদি স্বরাষ্ট্রব্যবস্থা ঔদাসীন্য প্রদর্শনে সক্ষম হয় তাতে নারীজাতির প্রতি আমাদের অসম্মাননা জ্ঞাপনেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আক্রান্ত হয়ে অস্ত্রধারণের পরিবর্তে আত্মসমর্পণ করবার এই তীব্র গরল বহুকাল যাবত প্রবেশ করেছে আমাদের রক্তে, করেই চলেছে। 

 

কিন্তু দায়িত্বের হাত থেকে নিষ্কৃতি চাওয়া বিরোধী, বিচারালয়, সংবাদমাধ্যম, স্বরাষ্ট্রব্যবস্থা, জনগণ প্রত্যেকেই ঠিক একটি কথাই ভাবছে যে যা ঘটেছে, তা আদৌ তাদের সঙ্গে নয়। অপরের সঙ্গে একাত্ম বোধ করবার যে কর্তব্য তা নয় উহ্যই রইল, সমস্যা হচ্ছে যাদের সঙ্গে ইতিমধ্যে অন্যায় সংঘটিত হয়েছে তারাও প্রত্যেকে ঠিক সমানভাবে দায় এড়াতে চেয়েছিল। যে সাংবাদিক আজ হাত পেতে শাসকের ভিক্ষা গ্রহণ করছেন, তিনি স্বয়ং কিন্তু দোষ ঢাকতে গিয়ে নিজেকেই ক্রমাগত নিয়ে চলেছেন তাঁর স্বল্প বেতনের চাকরিটি হারাবার দিকে। মৃন্ময়ী মূর্তিতে বহুমূল্য সজ্জার ব্যবস্থা করে আসা কর্মকর্তার আপন সন্তানের বেসরকারি শিক্ষালয়েও কিন্তু মাসিক প্রদেয় ক্রমবর্ধমান। অবহেলাভরে শ্রীমতি বাল্মীকির দেহ সৎকার করা শান্তিরক্ষক ব্যক্তিত্বও হয়তো এক কন্যাসন্তানের পিতা। সর্বোপরি বিরোধী পক্ষের প্রধান নেতাকে (তা তিনি যতখানি হাসির পাত্রই হোন না কেন) প্রথমে নির্লজ্জ পদাঘাত এবং পরবর্তীতে আইনত হেনস্থা, মনুষ্যত্বের নিরিখেও কি এই অসভ্যতা তাঁর প্রাপ্য ছিল? যখন ভারতবর্ষের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি রাখা হয়নি, প্রণেতাদের যুক্তি ছিল তথাকথিত শিক্ষিত না হলে কি মানুষ ভালোবেসে তার মাতৃভূমির দায়িত্ব নিতে অক্ষম? অথচ তাঁরা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছিলেন যে এহেন উদারতা প্রদর্শন করতেও ন্যূনতম অনুশীলন থাকা প্রয়োজন... 

 

বিরোধীশূন্য গণতন্ত্রের সুযোগে প্রায় সমস্ত প্রেক্ষিতে ক্রমবর্ধমান শ্রেণীবৈষম্য