• ১২ কার্তিক ১৪২৭, বুধবার
  • 28 October 2020, Wednesday
অতিমারীকালের অ-বাস্তব শিক্ষা ছবি: প্রতীকী।

অতিমারীকালের অ-বাস্তব শিক্ষা

নন্দিনী নাগ

Updated On: 16 Oct 2020 12:09 am


তখনও 'ভার্চুয়াল' শব্দটাই শুনিনি, মানে বোঝা তো অনেক দূরের কথা।

আমার, আমাদের অনেকেরই ছোটবেলার কথা বলছি। জানলার শিক, খাটের স্ট্যান্ড অথবা ফাঁকা ঘরের বাতাস ধুলোবালিকে মিথ্যে ছাত্রছাত্রী বানিয়ে, স্কুল-স্কুল খেলতাম কত্ত। তখন কি ভাবতে পেরেছিলাম, এমন দিনও আসবে, যখন একটা ফোনের পর্দায় চোখ রেখে কল্পনা করে নিতে হবে পঞ্চাশ-ষাট জন মেয়ের মুখ আর ঢাল-তলোয়ার ছাড়াই তাদের মাথায় ঢোকাবার চেষ্টা করে যেতে হবে অঙ্ক, বিজ্ঞানের মতো আপাত শক্ত বিষয়!

অথচ প্রায় আট মাস ধরে এই দুরূহ কাজটা করবারই চেষ্টা করে চলেছি,পাঠ্যক্রমও প্রায় শেষের পথে, তবু এখনও মন থেকে সংশয় গেল না। সত্যি কি কিছু শেখাতে পারলাম,আদৌ কি কিছু শেখানো সম্ভব 'অনলাইন' পড়ানোতে, অন্তত স্কুলপর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের?

এমন একটা বিপর্যয়ের জন্য আমরা কেউই তৈরি ছিলাম না! শিক্ষককুলের অনেকেই যেমন ভার্চুয়াল ক্লাস নেবার উপযুক্ত প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত নন, তেমনই ছাত্রছাত্রীদের অনেকেরই বাড়িতে এই সুবিধা নেবার উপযুক্ত পরিকাঠামো নেই। স্মার্টফোন নেই অনেকেরই, লকডাউনে বাবা-মায়ের কাজ গেছে, তাই ফোন কেনার সাধ্যও নেই। অনেকের আবার ফোন থাকলেও তাতে ইন্টারনেট পরিষেবা পাবার জন্য রিচার্জ করার টাকা নেই। জানি আমরা সবটাই, কারো কারো ফোন রিচার্জ করে দেওয়া ছাড়া  আমাদেরও কিচ্ছুটি করার উপায় নেই। সকলে ক্লাস করতে পারছে না জেনেও চালিয়ে যেতে হচ্ছে 'অনলাইন ক্লাস'।

কিছু ছাত্রছাত্রী উপকৃত হচ্ছে অবশ্যই, তবে সেই সংখ্যাটা খুবই সামান্য।

 

আসলে 'ফাঁকিবাজি' আর 'ছাত্রছাত্রী' এই শব্দ দুটোর মধ্যে অচ্ছেদ্যবন্ধন।আর ফাঁকি দেওয়াটা ছাত্রসমাজের মৌলিক অধিকার। শিক্ষক-শিক্ষিকা সামনে থাকতেই যারা ক্লাসে কেবল শরীরটাকে বসিয়ে রেখে মনটাকে নিয়ে ইতিউতি ঘুরে বেড়ায়, তারা যে হাতে একটা স্মার্টফোনের মতো আকর্ষণীয় জিনিস স্বাধীনভাবে পেয়ে গিয়ে ভার্চুয়াল শিক্ষককে 'কাঁচকলা' দেখিয়ে ইন্টারনেট পথে নানা রঙিন দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াবে, এ তো বলাই বাহুল্য!

শিক্ষকের কড়া চোখের নজরদারি নেই, পড়া তৈরি করে প্রশ্নের উত্তর দেবার দায় নেই, কিছু লিখতে দিলে বই খুলে দেখে নেবার সুবিধা আছে, অতএব রোজ রোজ ভার্চুয়াল ক্লাসে বসে থেকে সময় নষ্ট করার মতো বোকামি কি কেউ করে! বিশেষ করে যেখানে আদৌ কোনো পরীক্ষাই হবে না।

ছাত্রছাত্রীদের এই মানসিকতা আমরা বুঝি।রোজকার ক্লাসে শুধু উঁকি দিয়ে কারা চলে যায়, তা জেনেও যখন  কিছুই করতে পারি না, তখন খারাপ লাগে। যে বাচ্চারা কিছু না শিখেই পরের ক্লাসে প্রোমোশন পাবে, তাদের সেই শ্রেণির উপযুক্ত কীভাবে যে করে তোলা সম্ভব হবে, সেটা ভেবে শিউরে উঠি।

 

সমস্যা শুধু ওদের তরফেই নয়, ঘাটতি থেকে যাচ্ছে আমাদের দিকেও। আমরা যারা ক্লাসে পড়িয়ে অভ্যস্ত, তারা সবাই জানি, ক্লাসরুমে ঢোকামাত্র আমাদের একটা রূপান্তর হয়ে যায়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলোর জিজ্ঞাসু দৃষ্টি, অফুরান প্রাণশক্তির সামনে আমাদের পড়ানো এবং শেখানোর আনন্দ বেড়ে যায় বহুগুণ। ওদের নানা প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বার হয়ে আসে এমন অনেক পাঠ্যক্রম বহির্ভূত তথ্য যা হয়তো বলার কোনো পরিকল্পনাই থাকে না আগে থেকে কিংবা কোনো বাচ্চার মুখ দেখে যখন বুঝতে পারি তার কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হচ্ছে না বা সে উৎসাহ পাচ্ছে না,তখন তার উপযোগী করে বোঝানোর জন্য  বদলে ফেলি শেখানোর পদ্ধতি। এভাবে প্রতিদিন আমরাও শিখি, শেখানো আর শেখা চলতে থাকে একসঙ্গে।

সে সুযোগ নেই এখন, জানি মুখচোরা বাচ্চারা কখনো নিজে থেকে বলে না পড়া বুঝতে না পারার কথা, তবুও তাদের শনাক্ত করার উপায় নেই। তাই যারা এই দুঃসময়েও বেশ খানিকটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে, নিয়মিত ক্লাস করতে পারছে, তাদের শেখার মধ্যেও যে অনেক ফাঁক থেকে যাচ্ছে, এ ব্যাপারেও কোনো সংশয় নেই। 

শিক্ষা তো শুধু বইয়ের পাতায় লেখা কয়েকটা কথা নয়, স্কুলে পড়ার বছরগুলোতে বাচ্চারা তাদের সমস্ত ইন্দ্রিয় এবং চেতনা দিয়ে ব্লটিংপেপারের মতো শুষে নিতে থাকে জীবনের নানা পাঠ, এই অতিমারীকালে সে সুযোগের সময়কাল থেকেও একটা বছর বাদ চলে গেল ওদের।

সবটাই বুঝি। তবুও প্রতিদিন যন্ত্রের দিকে মুখ ফিরিয়ে, যান্ত্রিকভাবে ক্লাস নিয়ে চলেছি অবয়বহীন শিক্ষার্থীদের, ভার্চুয়াল ক্লাস।

 

(লেখিকা শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত)