• ১২ কার্তিক ১৪২৭, বুধবার
  • 28 October 2020, Wednesday
ঘেঁটু ফুলের জোসনা ছবি: কৃষ্ণেন্দু মণ্ডল

ঘেঁটু ফুলের জোসনা

সায়ন্তন ঠাকুর

Updated On: 17 Oct 2020 12:02 am

পর্ব: ১০

পাড়ায় পাড়ায় টেম্পো গাড়ি চড়ে তিনি আসছেন। হইহই আলো, এখনও মফস্‌সলের দিকে আশ্বিনের দিন ফুরিয়ে আসলে আকাশের গায়ে মিহি নীল রঙ লেগে থাকে। গলির মুখে মাইকে একজন রমণী কাকে যেন বলছে, আজ সবাই এসেছে, শুধু তুমি এলে না! 


মাঝবয়সি লোক রাস্তার ধারে ছোলা বাদাম ভাজা ধামায় নিয়ে বসে, পাঁচ টাকা দশ টাকা, বিট নুন ছড়িয়ে দেয়, চেনা মানুষ আমার, প্রতিদিনই দেখি। আজ দেখি মুখখানি বড় মলিন, কাছে গিয়ে জিগ্যেস করলাম, পুজোর কদিন তো ছুটি, নাকি!
----আর বাবা, আমাদের কি পুজো আচে!
----কেন, কী হল?
একটু চুপ করে থেকে বলল
----চেলেটাকে তরশু কাজ থিকে চারিয়ে দেচে, পইসাকরি কিচুই দেয় নাই

----কোথায় কাজ করত?
----সললেক আচে না, সেকানে কার বারির গারি চালাত

----তা কী হল? এমনি ছাড়িয়ে দিল?
 
----যানি না বাবা, বলেচে আর লাগবে না

----মাইনে?
----মাইনা বোনাস কিচু দেইনি, মাস পরলে যেতে বলেচে

----তাহলে? এ মাসে চলবে কী করে?

করুণ মুখ তুলে চাইল মানুষটি। চারপাশ আলোয় ঝলমল করছে। ছোট ছোট দোকান বসেছে, এগরোল-চাউমিন-মোগলাইয়ের গন্ধ ভাসছে বাতাসে। উজ্জ্বল আলোয় মানুষের চোখ দেখা যায় না, ছাতিম ফুটেছে আজ খুব, কুসুম সুবাসে থইথই পথঘাট। এই সময় কে খাবে শুকনো বাদাম আর ছোলা ভাজা! ভাঙা ভাঙা গলায় বলে উঠল
----কে যানে বাবা। আমার হাতে তো কিচুই নাই

----ঘরে জমানো কিছু নাই?
----নাই গো, চাল নাই, ভাতের যোগান... শরীল আর দ্যায় না, কী করি আমি!

আমি কী বলব, একজন বৃদ্ধ অক্ষম পিতা বসে আছে ঝলমলে উৎসবের দুয়ারে। যুবতির দল রঙিন প্রজাপতির মতো ঝুটো গয়নার দোকানে ভিড় করেছে, কলকল করে নখপালিশ, ঠোঁটের রঙ, সুগন্ধী কিনছে তারা। পোশাকের কী বাহার! ঘোড়ার লেজের মতো দুলছে কেশরাজি, শেষবেলার কেনাকাটি সাঙ্গ করে বর-বউ হাসতে হাসতে চলেছে রাস্তায়। এক যুবক পিতা তার শিশুটিকে মিথ্যা বন্দুক কিনে দিয়ে একমুখ হেসে উঠছে।
 

আরেকটু এগিয়ে জাদুর তাঁবু বসেছে
জাদুকরির নাম এস. নিশা। বাইরে রঙিন ছবি, কাঁচা হাতে আঁকা এক লাস্যময়ীর মুখ, উদ্ধত গ্রীবা, চোখে মোহিনী কাজল আর লাল টুকটুকে দু’ খানি ঠোঁট। ওই নারীই বোধহয় এস. নিশা। একজন সম্ভ্রান্ত মানুষ জমকালো কালো ঘোড়ায় টানা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালেন, পরনে মিহি চুনোট করা ধুতি গিলে পাঞ্জাবি আর ডান হাতের অনামিকায় জ্বলজ্বল করছে একখান রক্তমুখী নীলা। ওয়েলম্যাক কোম্পানির ট্যাঁকঘড়ির সোনার দড়ি ঝুলে আছে বুকের কাছে। গাঁয়ের রঙ শীতঋতুর গমখেতের মতো, খাড়া নাক, তিনি আসছেন সম্ভবত পাথুরিঘাটা রাজবাড়ি থেকে। দুজন খিদমদগার সামনে এসে দাঁড়াল, মাথায় লাল পাগুড়ি ধবধবে সাদা ধুতি আর ফতুয়া হাতে রুপো বাঁধানো বাঁশের লাঠি।

টিকিট ঘর, সিড়িঙ্গে একজন লোক বসে আছে, ভদ্রলোক জিগ্যেস করলেন, নিশা ম্যাডামের সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে?
----কী দরকার বলুন?
জলদ গম্ভীর গলায় বললেন
----আমি শোয়ের বায়না করতে এসেছি!
----কোথাকার পার্টি?
----কী?
ভ্যাবাচাকা খেয়ে সিড়িঙ্গে লোকটি বলে উঠল
----আচ্চা, দাঁড়ান বলে দেকি! দাঁড়ান


ছোট অস্থায়ী ঘর, একখান ক্যাম্প খাট পাতা, দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার। খাটে বসে বসে সিগারেট খাচ্ছে বিগতযৌবনা জাদুকরি নিশা। গালে মেচেতার দাগ, প্রচুর রঙ মেখেছে মুখে, সস্তা আতরের গন্ধে ভরপুর চারপাশ। তবে দেহকাণ্ডটির বাঁধুনি এখনও অটুট। কালো চাপা সালোয়ার-কামিজ পরনে। ভদ্রলোকের দিকে আঁকা ভুরু তুলে জিগ্যেস করল
----কোথায় বায়না?
----এই কাছেই, বারাসাত পার হয়ে...
----শুনুন, আমার নাইট কিন্তু বিশ হাজার আর মরা মানুষের খেলা দেখালে আরো পাঁচ

মৃদু হেসে শান্ত স্বরে ভদ্রলোক উত্তর দিলেন
----তা বেশ! বেশ! টাকাপয়সা নিয়ে ভাববেন না আপনি!
----আমার দলে পনেরো জন, রাতে মাংস-ভাত দিতে হবে আর আমার জন্য একটা বিপির বোতল!
----বেশ তো! সেসব হয়ে যাবে

একটু অবাক হয়ে ফের জিগ্যেস করল
----কখন শো আপনাদের?
----এই ধরুন রাতের দিকে!
----কত রাত?
----মধ্যরাত, যখন তুলা রাশিতে প্রবেশ করবে মৃগশিরা নক্ষত্র!
----মানে?

এরপর একটি গল্প গড়িয়ে যাবে বাবু রমেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী আর এই নিশাকে নিয়ে, আরেকটি গল্পে ওই অক্ষম পিতা নিরন্ন ঘরে ফিরে যাবেন। একটি গল্পে চুম্বন ও বাসনার দাগ অন্য আখ্যান গড়িয়ে এসেছে আমার সময়ে।
 

আমি দেখি, সব দেখি, আমার কোথাও যাওয়ার নাই। সব গল্পে অধিকার ফুরিয়েছে বহুদিন। ঘরবাড়ি সাকিন তামাদি প্রেতের মতো হারিয়ে গেছে মহাশূন্যে। কোনো কাশফুল ছাওয়া আশ্বিনের অপরাহ্ন আমাকে ভিটায় ফেরত যাওয়ার ঘাটে নিয়ে যায় না। কোনো গস্তি নৌকো নাই বাঁধা আমার দুয়ারে। ভিটা নাই সম্পর্ক নাই উঠান অপরাজিতা শিউলি কিছুই নাই। আমি শুধু আখ্যানের লোভে ঘুরে বেড়াই ভবহাটে।

রাত হল, সিগারেট ধরিয়ে এক পা দু’ পা হেঁটে বেড়াচ্ছি, হিম বাতাস উঠেছে ভুবনডাঙায়, অতি মিহি কিন্তু আমার প্রিয় বিষাদ ঋতুর পায়ের নূপুরে ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। ভরাট কণ্ঠস্বরের অন্তরীক্ষ হতে কে যেন বলে চলেছেন,


আধারভূতা জগতস্ত্বমেকা মহীস্বরূপেণ যতঃ স্থিতাসি

অপাং স্বরূপস্থিতয়া ত্বয়ৈতদাপ্যায়তে কৃত্স্নমলঙ্ঘ্যবীর্যে