• ১২ কার্তিক ১৪২৭, বুধবার
  • 28 October 2020, Wednesday
অনুবর্তন ছবি: কৃষ্ণেন্দু মণ্ডল

অনুবর্তন

সৌমী গুপ্ত

Updated On: 17 Oct 2020 12:02 am

 পুরোনো বাড়ি বা পোড়ো বাড়ি দেখলেই নুড়ি যেন অন‍্য পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে যায়। অনেক সময় জ্ঞান হারিয়েও যে ফেলে, সে কথা মাথায় রেখেই নুড়ির মা টুপার সঙ্গে ওদের গ্রামে যাওয়ার ঘটনায় কিছুতেই সায় দিচ্ছিলেন না প্রথমটায়। তারপর নুড়ির জেদের কাছে হার মানতেই হয়েছিল। অবশ্য নুড়ির বাবাও এই অমূলক আশঙ্কাকে বিশেষ আমল দেননি।

 

ওরা যখন ট্রেন থেকে নামল স্টেশনে তখন চারিদিকে ধূ ধূ প্রান্তর। দু’ দিকে লম্বা সুদীর্ঘ দুটো প্ল্যাটফর্ম। নুড়ি যতটা লক্ষ্য করল শুধু একটা মাত্র ছোট্ট গুমটি দোকান আর টিকিট কাউন্টার ছাড়া আর কিছু নজরেই এল না।

“এই টুপা কোথায় নিয়ে এলি রে! এ যে ধ‍্যাড়ধ‍্যাড়ে গোবিন্দপুর!”

“তবে আর বলছি কী, তবে ওটা গোবিন্দপুর নয় ওটা রাঙাপুর।”

“ভারী সুন্দর নামটা কিন্তু, কোথায় যেন শুনেছি, যাই হোক তোর জেঠু কখন আসবে?”

“দাঁড়া ফোন করি, গোরুর গাড়ি নিয়ে আসছে তো লেট হচ্ছে ওই জন্য।”

“আমার কিন্তু বেশ অন্যরকম একটা ফিল হচ্ছে!”

“তাই বুঝি! আমার তো রীতিমত পেটটা খিদেতে চুঁ চুঁ করছে” টুপা ফোনটা হাতে নিয়ে বলল।

“ওই দেখ টুপা একটা গরুর গাড়ি!'

“হ্যাঁ আসছে বলল।”

দুই ধারে শুধু বিস্তীর্ণ জমি। সবুজ-শ্যামল ঠিক যেমনটা নুড়ি ভেবেছিল। মাঝেমধ্যে বড় বড় কালো দিঘির জল কোথাও শালুক ধরে আছে, কোথাও পদ্মপাতা শুয়ে আছে কালো জলের বুকে। মাঝে মাঝে মাথা উঁচু করা তাল গাছের সারি। পুকুর ধারে বড় বড় টিলা, সিমেন্টে বাঁধানো শ্যাওলা পড়া, মাঝে মাঝে বসার জায়গা। টিলার ধারে মহীরুহ। নুড়ি তাকাতে তাকাতে দোদুল্যমান গরুর গাড়ি চেপে চারিদিকের দৃশ্য উপভোগ করতে লাগল ।

নুড়ি লক্ষ করে চলতি রাস্তায় কিছুটা দূরে পুরোনো সুবিশাল খসটে লাল রঙের বাড়ি। ছাদের অংশটায় সামনে বড় ঈগল পাখি খোদাই করা। নুড়ির খুব চেনা মনে হল। অবশ্য এরকম অনেক কিছুই নুড়ির খুব চেনা লাগে। পুরোনো পলেস্তারা পড়া পোড়ো বাড়ি, সুবিশাল থাম, বাঁধানো উঠোন কড়িকাঠের ঘর এসব দেখলে নুড়ি হারিয়ে যায় কোথায়। মনে হয় কোথায় যেন দেখেছে আগে। নিজের সঙ্গে এই সব জিনিসের যেন কোথায় মায়াময় সংযোগ আছে। যার অমোঘ আকর্ষণে সে শুধু দৌড়চ্ছে দিকবিদিক শূন্য হয়ে তবুও পিছন ফিরে তাকাতে পারছে না। একটা বৃত্তাকার অন্ধকার ঘূর্ণি যেন নুড়িকে আপাদমস্তক গিলে খেতে চাইছে।

“এই নুড়ি, এই! কখন থেকে ডাকছি শুনছিস?”

“কিছু বললি?”

“কিছু বললি মানে তখন থেকে ডেকে ডেকে পাগল হয়ে গেলাম।”

“বল কী বলছিস?”

“তোকে বলেছিলাম না আমাদের গ্রামে একটা জমিদার পুরোনো বাড়ির কথা---- ওই দ‍্যাখ।”

“ওখানে একদিন নিয়ে যাবি আমায় টুপা?”

“সে তো যাবই!”

“না, থাকব আমরা একদিন।”

টুপা হাঁ করে অবাক হয়ে উত্তর দেয়, “রাতে থাকবি কী রে ওখানে কেউ রাতে থাকে না!”

“কেন? কেন থাকে না?”

“সে অনেক ব্যাপার, ওখানে নাকি অলৌকিক শক্তির প্রভাব আছে, আমি বাবা ওসবে নেই আর তুইও থাকার কথা ভুলে যা, আমরা যাব দেখব চলে আসব।”

(২)

টুপার জেঠু রঞ্জনবাবুকে রাজি করাতে নুড়িকে কম বেগ পেতে হল না। অন্তত ঘণ্টা দুয়েক টানাপোড়েনের পর রঞ্জনবাবু দোনামোনা করে রাজি হলেন। ঠিক বিকেল সাড়ে পাঁচটার সময় রঞ্জনবাবু নিজে টুপা ও নুড়িকে নিয়ে এসে হাজির হলেন জমিদার বাড়ির সামনে। জমিদার বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণকারী ও অফিসের কর্মচারী সুবিমলবাবু ওঁদের উদ্দেশে বললেন, “দেখুন রাতে তো কেউ এখানে থাকে না, শুধু প্রহরী ভোম্বল আর ওর ছেলে ছাড়া, তাও বাইরের ঘরে পাহারায় থাকে, বুঝছেন তো জায়গাটা বিশেষ সুবিধার নয়!”

রঞ্জনবাবু ভারিক্কি গলায় বললেন, “সবই বুঝি সুবিমলবাবু শুধু মেয়ে দুটো এত জোরাজুরি করল না করতে পারলাম না।”

সুবিমলবাবু আর কোনো উত্তর না দিয়ে মৃদু হেসে অফিস রুমের দরজায় তালা লাগিয়ে দিলেন।

নুড়ি এতক্ষণ বাইরের খোদাই করা বড় ঈগলটার দিকে তাকিয়ে ছিল আনমনে। সাদা বর্ডারের পাশের লাল রং করা বহু পুরোনো বাড়ি। সামনে নারায়ণ শিলার বড় মন্দির। দুর্গা মন্দির। দু’ পাশে বড় বড় থাম। সামনে গোলাপি ফুল ভর্তি করবী গাছ। দোতলা সুবিশাল বাড়ির মধ্যে দু’ ধারে অগুনতি কক্ষ সাজানো। একজন নাদুসনুদুস শ্যামবর্ণের লুঙ্গি পরিহিত খালি গায়ে কাঁধে গামছা ফেলে করজোড়ে এসে দাঁড়াল ওদের সামনে। “তাহলে উপরে দক্ষিণ খোলা ঘর দুটোতেই ব্যবস্থা করে দিলাম বাবু।”

“হ্যাঁ। আপাতত কড়া করে এক কাপ চা করো দেখি।”

“হ্যাঁ বাবু, রাতের বেলা দেশি মুরগির ঝোল আর গরম ভাতের ব্যবস্থাও করেছি।”

“আর মাঝখানে সময়টায় কি হাওয়া খেয়ে থাকব?'

“না বাবু, পকোড়া ভেজে দেব তখন।”

“দক্ষিণ দিকের ঘরের পাশে একটা বড় পুকুর আছে তাই না?” নুড়ি অন্যমনস্ক হয়ে বলে। ভোম্বল কালো ছোপ পরা দাঁতগুলো বের করে বলে, “হ্যাঁ দিদি ওইখানেই তো...”

কথাটা শেষ করার আগেই নুড়ি লুফে নিয়ে বলে ওঠে, “পিসি ঠাম্মা ডুবে মরে।”

“ইয়ে মানে কী বললেন? আমি তো জমিদার ভগিনী সুহাসিনী দেবীর কথা বলছিলাম।”

“এই নুড়ি, এ আবার কী হল!”

রঞ্জনবাবু এতক্ষণ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিলেন নুড়ির দিকে। রাশভারী কণ্ঠে বেশ জোরালো গলায় বললেন, “তুমি কী করে জানলে দক্ষিণে পুকুর আছে নুড়ি? কে পিসি ঠাম্মা!”

নুড়ি যেন হারিয়ে গিয়েছিল টুপার টানাটানিতে চমকে উত্তর দিল, “কই না তো! আমার যেন মনে হল একটা পুকুর আছে ওখানে।”

(৩)

সন্ধ্যা হতে না হতেই কালো মেঘ ঘনিয়ে এল চারিদিকে। মুষলধারায় বৃষ্টি নামল অঝোরে, চারিদিক সাদা হয়ে আসছে, কারেন্টের দেখা নেই বহুক্ষণ। ভোম্বল এসে জানিয়েছে কাছে কোথায় তার ছিঁড়ে গেছে। সকালের আগে আর কারেন্ট আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এখানে এসে ইস্তক নুড়ি কেমন থম মেরে গেছে। টুপা ভয়ে কোনো কথাই বলছে না খালি মোবাইল ঘেঁটে যাচ্ছে। কেমন অতিমানবী বলে মনে হল ওর নুড়িকে। চোখ দুটো নিঃসীম শূন্যে রেখে অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভেবেই চলেছে। চারিদিকে তার মধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ আর ব্যাঙের কর্কশ ধ্বনি। তারই মধ্যে বৃষ্টি শেষে টুপটুপ করে অভেদ্য নীরব নিস্তব্ধ অন্ধকারে বৃষ্টির আওয়াজ ভয়কে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। টুপা একবার নুড়িকে ঠেলা মারল, “এই নুড়ি চল না আমরা বাড়ি ফিরে যাই ডিনার সেরে, এখানে আমার একদম ভালো লাগছে না।”

নুড়ি জানালার পাল্লাগুলো খুলে দেয়, জানালার পাশে বাইরে থেকে মাকড়সার জাল বুনেছে, একটা-দুটো বাদুড় উড়ে যায় কালো ডানা মেলে। একটা ভ‍্যাপসা অথচ খুব চেনা গন্ধ ভেসে আসে। নুড়ি যেন হারিয়ে যাচ্ছে চেনা গন্ধে। ঠিক সেই সময়েই ভোম্বল চা আর পকোড়া নিয়ে এসে রাখতেই নুড়ি শুধোল, “আচ্ছা এটা কত বছরের পুরোনো?”

“তা ঠিক বলতে পারব না, আড়াইশো বছর তো হবেই!” নুড়ি মনে করার চেষ্টা করল খোদাই করা ঈগলের নীচে লেখা সংখ্যাগুলো। কিছুতেই মনে করতে পারল না---- “আচ্ছা এখানে কেউ থাকে না কেন? মানে এদের যারা পরবর্তী জেনারেশন?”

“কী করে থাকবে দিদি? কেউ থাকতেই পারে না, এই আমি কম দিন তো কাজ করছি না তবু একটা রাত ভেতরের ঘরে থাকতে পারি না!”

“কেন?”

“খালি মনে হচ্ছে ছায়ার মতো কতগুলো হাত খালি করতে আসছে পিছন থেকে, অথচ ঘুম ভাঙলে দেখতাম কিছু নেই সামনে। ঘরের বউ বলল তোমার ওখানে গিয়ে কাজ নেই, তখন থেকে আমি আর আমার ছেলে বাইরের ঘরেই থাকি!”

“কিছু তো কারণ আছে সেটাই বা কী?”

“ভোম্বল, তুমি রাতের খাবারের ব্যবস্থা করো গিয়ে” রঞ্জনবাবু আদেশ করে বললেন।

ভোম্বল হাতজোড় করে বলল, “হ্যাঁ বাবু, রাত ন’টা বাজলে দিয়ে দেব, আর আপনার শোবার ব্যবস্থা পাশের ঘরেই করেছি, ইমার্জেন্সি লাইট বন্ধ হয়ে গেলে আমি মোমদানিতে বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে যাব, অসুবিধা হলে হাঁকলেই আমি চলে আসব।”

“আচ্ছা, তুমি এখন এসো।”

“জেঠ্‌ তুমি জানো এই অলৌকিক ঘটনার পিছনে কারণ কী?”

“সে এক লম্বা ইতিহাস, কাল বরং শুনো, আজ ভয় পাবে।” রঞ্জনবাবু উত্তর দিলেন।

নুড়ি জোর করল, “এখনই বলুন প্লিজ!”

(৪)

টুপা একবার তাকাল নুড়ির দিকে আর মনে মনে বলল খাল কেটে কুমির সে-ই এনেছে এখন আর এই ভয়াবহ রাত্রির হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনো উপায় নেই।

রঞ্জনবাবু একটু থেমে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, “প্রায় আড়াইশো বছর আগে এখানে জমিদার নরসিংহ নারায়ণ চৌধুরী থাকতেন। তার একমাত্র পুত্র অনিরুদ্ধ নারায়ণ চৌধুরী ও কন্যা সুহাসিনী চৌধুরী। সুহাসিনী দেবী ছিলেন জ্যেষ্ঠা কন্যা। সুহাসিনী দেবীর বিয়ের পাঁচ বছরের মধ্যে বিধবা অবস্থায় ফেরত আসেন এক পুত্রসন্তান নিয়ে। পুত্রসন্তানটি আদরের দুলাল হয়ে শাসন বারণ ছাড়া বড় হয়ে একরোখা মাতাল ও কুসঙ্গদোষে চরিত্রহীনে পরিণত হয়। অনিরুদ্ধর বিয়ের পর অনিরুদ্ধের স্ত্রী প্রমীলা দেবী ক্রমশ চক্ষুশূল হয়ে ওঠে সুহাসিনী দেবীর। পুত্রের সঙ্গে যোগসাজশ করে কীভাবে সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে করিয়ে নেওয়া যায় সেই চক্রান্ত চলছিল গোপনে। ততদিনে নরসিংহবাবু মৃত্যুপথযাত্রী অশীতিপর বৃদ্ধ। এদিকে সুহাসিনীর একমাত্র পুত্র বিশৃংখল জীবনযাপনের জন্য লিভারের অসুখে পড়ে এবং কিছুদিনের মধ্যেই মারা যায়। শোনা যায় তারপরেই প্রমীলা দেবীর প্রতি আরো প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে সুহাসিনী দেবী। এক বিশ্বস্ত দাসীর কাছে তিনি স্বীকার ও করেন---- যে সম্পত্তি ভোগ করতে পারেননি তিনি, তাঁর পুত্র পর্যন্ত বঞ্চিত হয়েছে, সে সম্পত্তি তিনি কাউকে ভোগ করতে দেবেন না।

প্রমীলা দেবীর একমাত্র সন্তান চিত্রলেখার বয়স যখন পাঁচ বছর তখনই কালো ছায়া নেমে আসে ওদের সকলের জীবনে। এক গভীর রাতে মুষলধারা বৃষ্টির মধ্যে সকলকে ঘুমিয়ে পড়ার আগে বিষ মেশানো খাবার খাইয়ে হত্যা করেন স্বয়ং সুহাসিনী দেবী। শোনা যায় ছোট চিত্রলেখাকে মারতে পারেননি, কারণ সেদিন সে মামার বাড়িতে ছিল। সেই রাত্রেই সবাই চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন হলে নিজের স্বীকারোক্তি চিঠিতে জানিয়ে দক্ষিণের ওই পুকুরে ডুবে আত্মহত্যা করেন। অথচ মামারবাড়ি থেকে এই বাড়িতে ফেরার আগের দিন রহস‍্যজনকভাবে পুকুরপাড়ে চিত্রলেখার ডেডবডি পাওয়া যায়।

একটু থেমে রঞ্জনবাবু যোগ করলেন, এখনও নাকি রাত্রিবেলা মাঝে মাঝে অনেকে পুকুরপাড়ে সাদা থান পরে কাউকে বসে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে দেখে।

নুড়ি এতক্ষণ মোহিত হয়ে শুনছিল। রঞ্জনবাবু বললেন, “পরে দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজন বহু ঝুট-ঝামেলা করে সম্পত্তি আদায়ের চেষ্টা করলেও এই বিশাল অট্টালিকার কোনো সুরাহা করতে পারেনি।”

“কেন জেঠু?” টুপা এতক্ষণে ঢোঁক গিলে আমতা আমতা করে বলল।

দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে রঞ্জনবাবু বললেন, “কেননা এখানে রাত্রে কেউ থাকতে পারে না, সকলে বলে অতিপ্রাকৃত শক্তি এখানে কাউকে থাকতে দেয় না।”

টুপা আলো-আঁধারির মধ্যে নুড়ির ঠান্ডা অবশ হয়ে যাওয়া হাতটা জোরে চেপে ধরল।

 

(৫)

রাতের দিকে বৃষ্টিটা ধরে এল। বড় বড় জানালা দিয়ে চাঁদের পাশে মেঘ ভেসে যায়। একটা-দুটো তারা স্পষ্ট হয় এক একবার। ঠান্ডা জোলো হাওয়া ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। লম্বা বারান্দায় ঝোলানো বড় কাঠের ঘড়ির পেন্ডুলামটা আবছা দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দারুণ নিস্তব্ধতাকে খানখান করে ঢংঢং করে সময় জেগে উঠছে।

ভোম্বল মোমদানিতে বাতি জ্বালিয়ে রেখে গেছে। নুড়ি একদিকে খোলা নিজেদের কক্ষ থেকে বেরিয়ে লম্বা বারান্দায় পায়চারি করতে করতে চারিদিকে দেখে যেন চোখের সামনে দেখতে পেল হঠাৎ ছোট একটি মেয়ে দৌড়ে গেল এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। একটু এগোতেই সিঁড়ির নীচের ঘরে উঁকি মারতেই নুড়ির ভীষণ চেনা মনে হল। নুড়ির অকারণে ভীষণ ঠান্ডা লাগল। মাথার মধ্যে সব স্মৃতি মনে করতে চেয়েও মনে না পড়লে যে অস্বস্তি লাগে তেমন উচাটন করতে লাগল।

 

রাতে খাওয়াদাওয়া পর্ব শেষে তিন জন যখন ঘুমোতে গেল তখন রাত্রি সাড়ে দশটা।

টুপা কাঠের পালঙ্কের উপর ধবধবে সাদা চাদরে শরীর এলিয়ে দিয়ে বলল, “এই শোন নুড়ি, আমি চুপিচুপি দুটো ঘুমের ওষুধ নিয়ে এসেছি জেঠুর কাছ থেকে। টপ করে খেয়ে ফ‍্যাল তো। আমার তো না হলে বাপু ঘুম আসতই না আর জেগে থাকলে কাল সকালে অক্কা লাভ করব মনে হচ্ছে, কী ভুতুড়ে জায়গা রে! সবসময় গা ছমছম করছে।”

নুড়ি আবার আনমনে বলে, “হুম।”

“তবে যাই বলিস বাপু মাংসের ঝোলটা মাইরি ব‍্যাপক বানিয়েছিল।”

“হুম।”

“কী হুম হুম করছিস বল তো? এসে থেকে তুই কেমন একটা ম‍্যাদামারা হয়ে গেছিস। যেন অন্য জগতের বাসিন্দা হয়ে গেছিস, এই কী হয়েছে রে তোর ? সত্যি সত্যি ভয় লাগছে না রে?”

“আচ্ছা টুপা, আমি যদি চিত্রলেখা হতাম?”

“কে চিত্রলেখা! ও হরি! তুই আবার ওসব শুরু করেছিস। খবরদার বলছি আমার মাথা চিবোস না, কাকিমা ঠিকই বলেছিল তোকে না নিয়ে এলেই ভালো হত।” টুপা ঘুমের ওষুধ পালঙ্কের পাশে রাখা ছোট কারুকার্য খচিত কালো গোল টেবিলে রেখে নিজে একটা খেয়ে আপাদমস্তক চাদর গায়ে দিয়ে ঘুমের চেষ্টা করল।

নুড়ি আবছা অন্ধকারে মাথার উপর কড়িকাঠ, বড় ছাদ, লোনাধরা দেওয়াল এসব দেখে মনে করতে চাইল কেন তার সব জিনিস পূর্ব পরিচিত মনে হচ্ছে। ওর সঙ্গে যেন এই বাড়ির রন্ধ্রে রন্ধ্রে যোগ আছে। ও যেন চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছিল লাল গোল টিপ পরা প্রমীলা দেবীর মায়াময় মুখ, সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি পরিহিত অনিরুদ্ধ বাবু, মৃত্যুপথযাত্রী নরসিংহবাবু আর ভীষণ প্রতিহিংসাপরায়ণ, প্রভাবশালী, দেমাকী ছোটো করে ছাঁটা সাদা কালো চুলের সুহাসিনী দেবীর মুখ। চিত্রলেখার কথা মনে পড়লেই ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল বুকের ভেতর, রক্ত যেন দ্বিগুণ গতিতে প্রবাহিত হচ্ছে।

(৬)

কখন চোখ লেগে এসেছিল নুড়ির বুঝতেই পারেনি। তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কাটল যখন বুঝতে পারল ওকে কে যেন পালঙ্কের উপর থাকা তোষক সমেত দোলা দিচ্ছে, নুড়ি উঠে বসল ঝাঁকুনির জোরে। সামনে রাখা গ্লাস থেকে ঢকঢক করে বেশ খানিকটা জল খেল। তারপর আবার শুয়ে পড়ল। যতবার চোখ বন্ধ করল নুড়ি ততবারই মনে হল কে যেন ওকে আর টুপাকে একসঙ্গে দোলাচ্ছে। অথচ টুপা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন কিছুই যেন বুঝতে পারছে না। নুড়ি উঠে বসল। প্রচণ্ড ঘামতে শুরু করে সে। আচমকা দমকা বাতাসে দক্ষিণের জানালা খুলে যায়। নুড়ি ডাকার চেষ্টা করে টুপাকে। নুড়ি স্পষ্ট বুঝতে পারছিল কথা বলার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও শুধু ঠোঁট দুটো নাড়ছিল অথচ শ্রবণযোগ্য শব্দ বের করতে পারছিল না কিছুতেই। নুড়ি পালঙ্ক থেকে নেমে দাঁড়াল। টুপাকে ঠেলা মারার চেষ্টা করল কিন্তু হাত দুটোও যেন জমে গেছে। গোটা নুড়িই যেন পাথরে পরিণত হয়ে স্থবিরতায় আবদ্ধ থেকে চোখের সামনে অবশ‍্যম্ভাবী ঘটনাগুলোকে নিরুপায় হয়ে ঘটতে দেখছে। চুম্বকের মতো এক অমোঘ আকর্ষণে এক পা দু’ পা করে এগিয়ে যেতে মনে হল আচ্ছা অন্ধকারে কালো কালো ছায়ার মতো দশ-বারোটা হাত নুড়িকে ধরার চেষ্টা করছে। টিমটিমে বাতির আলোয় নুড়ি স্পষ্ট খেয়াল করছিল অনামিকা তর্জনী মধ্যমার সমাহার শুধু। নুড়ি কোনোরকমে বুকের কাছে হাত দুটো জোর করে চেপে ধরে।

একটা ধাপ সিঁড়ি নামতেই আবার দুটো ঘর। সে দিকে তাকাতেই নুড়ি দেখল দরজা দুটো হা করে খোলা। এলোমেলো হাওয়া ছেড়েছে চারিদিকে। আবারও দুটো কালো কালো হাত দেখতে পেল নুড়ি। একবার ঘরের ভেতর উঁকি মারল নুড়ি। অথচ একটা পূর্ণ শরীরের ছায়াও দেখতে পাচ্ছে না সে। আর বহু চেষ্টা করে নুড়ি একবারও পিছন ফিরে তাকাতে পারল না। মনে হচ্ছে ওকে যেন কেউ দুর্বার শক্তিতে সামনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পা দুটোতে অসম্ভব শক্তি ভর করে নীচে নেমে সন্ধ্যেবেলায় দেখা সামনে খোলা ছোট লাল মেঝের ঘরে ঢুকে পড়ে নুড়ি। মোহাবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে দেখল পালঙ্কের উপর যেন লাল টিপ পরে বসে আছে এক ছায়ামূর্তি। ঠিক স্পষ্ট নয় মুখটা। ঠিক সেই মুহূর্তে নুড়ির দুটো পা যেন আটকে গেল, একচুলও নড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে নুড়ি। আস্তে আস্তে নুড়ির দিকে ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসে, কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, “মাকে মনে পড়েছে বিনি? আমি জানতাম বিনি তুই আসবি আবার, ....আংটিটা ফেলে গিয়েছিলি যে, দ‍্যাখ তো হয় কিনা।”

(৭)

কতক্ষণ নুড়ি শুয়েছিল অচৈতন্য অবস্থায় জানে না। ভোরের দিকে হইচই হতেই জ্ঞান ফেরে তার।

“এই নুড়ি এইইইই, কী হল তোর?”

নুড়ি তাকায় চারিদিকে রক্তবর্ণ চক্ষু মেলে।

“আ-আমি এখানে কেন শুয়ে  বুঝতে পারছি না কিছুতেই।” নুড়ি মনে করার চেষ্টা করে।

টুপা নুড়িকে ধরে বসায় আস্তে আস্তে। মাথাটা ভীষণ ভার লাগছে। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করে বাইরেটা। ধীরে ধীরে আবছা ভাবে মনে পড়তে থাকে গতরাতের ঘটনাগুলো। দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়। আসলে সত্যিই কি ঘটনাগুলো ঘটেছিল ভাবতে ভাবতে ভোম্বলের দিকে তাকিয়ে বলল, “দাদা এখানে সব ঘরগুলো বন্ধ থাকে?”

“হ্যাঁ, সেটাই তো আশ্চর্যের, আপনি যে ঘরটায় শুয়ে আছেন এই ঘরটায় কুলদেবতার আদি শিলা থাকে বলে খোলা থাকলেও গতকাল রাতে প্রতিদিনের মতো বন্ধই করেছিলাম বামুন ঠাকুর যাবার পর, আপনি তালার চাবি কোথায় পেলেন?”

নুড়ির সব গুলিয়ে গেল, “দরজা তো খোলাই ছিল, আর অন্য ঘরের দরজাও বন্ধ থাকে?” নুড়ি মনে করার চেষ্টা করে রাতের অন্ধকারে কোন কোন ঘরের দরজা খোলা দেখেছে।

“কোনো ঘর খোলা থাকে না” ভোম্বল উত্তর দেয়। নিজের তর্জনী তুলে সিঁড়িঘরের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে ভোম্বলকে দেখাতেই কনিষ্ঠায় পরানো আংটি দেখে চমকে যায়। শীঘ্রই আংটি সমেত হাতটা লুকিয়ে ফেলে সে। সবাই যখন কথাবার্তায় ব্যস্ত সবার অলক্ষ্যে গোপনে আবার হাতটা নিয়ে এগিয়ে আসে সামনে। বিস্ফারিত চোখে দেখে আংটির উপরে বাঁকা অক্ষরে খোদাই করে লেখা চিত্রলেখা। নুড়ির গলা শুকিয়ে যায়। তখনই জেঠু রঞ্জনবাবু এসে বলেন, “হয়েছে তোমাদের জমিদারবাড়ি দর্শন? আর এক মুহূর্তও এখানে নয়, এমন বিপত্তি ঘটবে তা আগেই আন্দাজ করেছিলাম! অফিসের সব ফর্মালিটি, টাকা দেওয়ার ব্যাপার দেখছি আমি, এই যে নুড়ি ও টুপা, দুজনেই রেডি হও, আমরা বাড়ির দিকে রওনা দেব, আর এক মুহূর্তও এখানে নয়।”