• ১২ কার্তিক ১৪২৭, বুধবার
  • 28 October 2020, Wednesday
দিল্লির বইপাড়া আর তার চরিত্ররা ছবি: ইন্টারনেট।

দিল্লির বইপাড়া আর তার চরিত্ররা

শাওন বাগচী

Updated On: 17 Oct 2020 12:02 am


দরিয়াগঞ্জ হচ্ছে এমন একটি জায়গা যেখানে ভিড়ে ঠাসা রাস্তায় মার্সেডিস আর বই ভর্তি ভ্যানরিকশা একসঙ্গে পাশাপাশি রেষারেষি করে একে অপরকে ওভারটেক করার চেষ্টা করে ( পৃথিবীতে মনে হয় একমাত্র এখানেই এইরকমটা হয়)। এই দর্প একমাত্র বইয়ে ঠাসা ভ্যানরিকশার পক্ষেই দেখানো সম্ভব। বর্তমানের দিল্লির শো-অফ কালচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই যে নিজের অবস্থানকে প্রতিষ্ঠা করে সামনের প্রতিদ্বন্দ্বীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার স্পর্ধা একমাত্র এই বইপাড়াই দেখাতে পারে, তা সে প্রতিদ্বন্দ্বীর আয়তন যত বিপুলই হোক না কেন। এই সমান অধিকারের দাবি শুধুমাত্র বইয়ের পক্ষেই জানানো সম্ভব। এখানে যে কোনো শর্তের আগে প্রথম অগ্রাধিকার হল বই। অফিসে যাতায়াতের পথে প্রত্যেকদিনের এই দৃশ্য আমার কাছে পুরোনো দিল্লির রোজনামচা ছাড়া আর কিছুই মনে হত না, অফিসের টাইমে যা দেখে আমার ভ্রূ দুটো কুঁচকে যায়। কিন্তু এটাও সত্যি ওই জ্যামের মধ্যে আটকে থেকে এই যে রিকশাওয়ালার সদর্প ভঙ্গি আমাকে যে অনেকটা সুখানুভূতি দেয় তা সবার সামনে অস্বীকার করি কী করে! আসলে এখানকার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য যা কিনা অত্যন্ত সাধারণ হয়েও অনন্য হওয়ার দাবি রাখে। এই যে রিকশাওয়ালাটি যে কিনা তার নিজের অবস্থান থেকে এক চুলও নড়তে রাজি নয় এখানেই তার অনন্য হওয়ার প্রমাণ রেখে যায়। শুধু ওই রিকশাওয়ালাটি নয়, ওর মতো আরো যারা আছে তারাই আসলে ওখানকার শিকড়। যে শিকড় তাদের মহীরুহের পাশে ডালপালা ছড়িয়ে নিজের জায়গা করে নিতে জানে, নিজগুণে বনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। কারণ মরূদ্যান শুধু মহীরুহ নিয়ে তৈরি হয় না, সেখানে ছোট-বড় বিভিন্ন বৃক্ষের সহ অবস্থানে সেটি চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে। তাই এদের বইপাড়া বা দরিয়াগঞ্জের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে স্বীকার করে নিতে হবে।


আর হবে নাই বা কেন তাদের ছাড়া এপাড়া যে এচুলও নড়তে সক্ষম নয়। দরিয়াগঞ্জের ঘিঞ্জি গলি তারা তাদের নিজেদের হাতের চেটোর মতো চিনে রেখেছে। নতুন যে কোনো মানুষ এসে প্রথম বার এই সব গলিতে হারিয়ে যেতে পারে। তখন তাদের একমাত্র ত্রাণকর্তা এই মানুষগুলোই। এক গলি থেকে আরেক গলি বই বয়ে নিয়ে চলার জন্য এদের প্রয়োজন। ও পাড়ার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকটা মানুষের, তা তুমি যত বড়ই পাবলিশিং হাউজ হও না কেন, তুমি যত বড় গাড়িরই মালিক হও না কেন, তোমার গাড়ি ওই গলির মুখটায় দাঁড়িয়ে থাকবে। গলির ভেতরে ঢুকতে হলে তোমাকে ওদের শরণাপন্ন হতে হবে। এই বিষয়ে আমার রোজকার অভিজ্ঞতা এটাই বলে অফিসের মালিক গলির মোড়ে তার বিশাল বড় গাড়িটি ছেড়ে দিয়ে বাকি পথটুকু সে হেঁটে অফিসে ঢুকছে আর সেই অফিসের একজন কর্মচারী রিকশা করে অফিসারের দরজার সামনে এসে নামছে। আমার অফিসের পাশের বিল্ডিংটা জার্মানির স্পিকিংটাইগার কোম্পানির, সেখানে রাতদিন সাহেবরা মেমসাহেবরা এসে রিকশা থেকে নামছে এই দৃশ্য দেখা আমার রোজকার রুটিনের মধ্যে পড়ে। এটাই এ পাড়ার দস্তুর, এটাই এ পাড়ার অলিখিত নিয়ম, যা চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। ওটা ও পাড়ার খুব স্বাভাবিক একটা দৃশ্য।


এই বিষয়ে যখন কথা উঠলই তখন ওখানের রাস্তার জ্যামজট নিয়ে দু-চার কথা বলতে ইচ্ছা করছে, যেটা না বললে দিল্লির অফিসপাড়ার প্রকৃত চিত্রটা উঠে আসবে না সবার সামনে। ওখানে একটা কথা প্রচলিত আছে যে তুমি যদি একবার গলির মধ্যে ঢুকে গাড়ি পার্কিং করো তবে জেনে রাখো ওখান থেকে গাড়ি বের করার থেকে অনেক সহজ হবে তার আগে হিমালয়ে একটা ঝাণ্ডা গেড়ে আসা। এটা খুব সত্যি কথা ওখানে ট্রাফিক একটা সমস্যা। পুরোনো দিল্লির আগকার দিনের রাস্তা, যা কিনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা অফিসপাড়ার গুরুত্ব অনুযায়ী তাকে পরিবর্তন করা হয়নি। অথচ দেশের মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অফিসপাড়া। শুধু যে এটি অফিসপাড়া তা নয় এটা রেসিডেন্সিয়াল এলাকাও বটে। দেশ-বিদেশ থেকে একাডেমিক মানুষেরা এখানে আসে সুতরাং এই জায়গার গুরুত্ব অনুযায়ী এই জায়গার রাস্তাঘাটের সংস্কার হয়নি। অল্প জায়গার মধ্যে পুরোনো সময়ের ছাঁচে অপরিকল্পিত সব একের পর বিল্ডিং। রাস্তার দু’ দিকে ঠেলা নিয়ে ফেরিওয়াদের ভিড়, বেশিরভাগই বিভিন্ন খাবারের পসরা, যেগুলোকে ঘিরে অফিসপাড়ার মানুষের ভিড়। বাইরে থেকে কাজে আসা মানুষদের অবিবেচকের মতো যেখানে সেখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে চলে যাওয়া। দরিয়াগঞ্জের রাস্তার ছবিটা অনেকটা এরকম দাঁড়ায়, যেখানে রাস্তার দু’ ধারে সারি দিয়ে গাড়ি দাঁড় করানো থাকে যেগুলো বেশিরভাগই সেগুলো ওখানকার অফিস ওনারদের। এবারে সেই গাড়িগুলোর সামনে অফিস টাইমে একের পর ঠেলা দাঁড়িয়ে যায় পসরা নিয়ে। তার মধ্যে কিছু অবিবেচক ভিজিটার তো থাকেই, যারা তার মধ্যেও নিজেদের গাড়িটা প্রায় রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দিয়ে দডরিয়াগঞ্জের ভিড়ে অদৃশ্য হয়ে যায় সারাদিনের মতো। এই সময়টা হয় ড্রাইভারদের ড্রাইভিং স্কিল দেখানোর সময়। এই সময় বোঝা যায় কোন ড্রাইভার টুকে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছিল আর কে তা করেনি। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যেই একটা মনোভাব থাকে ‘ডর কে আগে জিত হ্যায়’ সুতরাং সবাই জান লড়িয়ে দু-তিন মিনিটের রাস্তাটা আধ ঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে শেষ করতে পারলে যুদ্ধজয়ের আনন্দ অনুভব করে। এর ফলে যেটা হচ্ছে সেটা হল দরিয়াগঞ্জ হয়তো তার সনাতনী ইমেজ বজায় রাখতে পারছে, কিন্তু যুগের হাওয়ায় সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে যে যুগ তোমাকে মনে রাখবে না তা কে না জানে। বড় বড় দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলো কিন্তু এখানে তাদের শাখা খোলার জন্য একেবারেই উৎসাহ হারিয়েছে শুধুমাত্র দরিয়াগঞ্জের ঘিঞ্জি এলাকার কারণে। তারা এখন দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তাদের কার্যালয় খুলেছে, যেটা কিনা এই বই পাড়াতেই সম্ভব হত। দেশে ও বিদেশের মানচিত্রে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠতে পারত। এতে কর্ম সংস্থান বাড়ত এবং দরিয়াগঞ্জের ঐতিহ্য আভিজাত্যও অটুট থাকত।


যাদের কথা এখানে বাদ থাকলে দরিয়াগঞ্জের সম্বন্ধে আসল চিত্রটাই বাকি পড়ে থাকবে। অফিসপাড়া দাপিয়ে বেড়ানো সেই সব তাদের কথা, যারা সরকারের ফ্যামেলি প্ল্যানিং প্রকল্পকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একতা কাপুরের সিরিয়ালের একান্নবর্তী পরিবারের ধারা বজায় রেখে সপরিবারে সমস্ত দুপুরটা দাপিয়ে বেড়ায় সারা দরিয়াগঞ্জের এ গলি থেকে ও গলি। ওরাই তখন বস, ও পাড়ার দাদা, মুম্বইয়ের ভাই, যা বলো না কেন সবকিছু এই ধরনের যে কোনো নামকরণে ওরা তখন ফিট হয়ে যায়। ফোনের তারে ঝুলে ঝুলে তাদের দ্বিপ্রাহরিক ভ্রমণ চলতে থাকে। আর ফল ভুগতে হয় টেলিফোন অফিসের লোকদের আর ওখানের অফিসগুলোর টেলিফোন অপারেটরকে। এই পর্যন্ত দাদাগিরি তাও মেনে নেওয়া যায় কিন্তু ওই যে বললাম একতা কাপুরের সাস বহু সিরিয়ালের একান্নবর্তী পরিবারের ধারা বজায় রাখা তাদের মজ্জাগত, তাই তাদের কাজ লোকের ঘরের ভেতরে নাক গলানো। কোথায় কী হচ্ছে, কে কী খাচ্ছে এসব না জানলে যে ওই দ্বিপ্রাহরিক ভ্রমণ ব্যর্থ। অনেকটা সেই পাড়াবেড়ানো কাকিমাদের মতো যাদের কাজ হল লোকের বাড়ির হাঁড়ি খবর জোগাড় করা। তা অফিসপাড়ার এই সপরিবারে টেলিফোনে তারে ঘুরতে থাকা তেনারা এর ওর তার অফিসের স্লাইডিং জানলা খুলে অফিসের মধ্যে মুখ বাড়িয়ে দেয়, দেখে কোথায় কে কেমন কাজ করছে, কেউ ফাঁকি দিচ্ছে কিনা। তখন অফিসের মধ্যে কার ক্ষমতা আছে ওদের মুখের ওপর অভব্যের মতো স্লাইডিং জানলা বন্ধ করে, তার থেকে অতিথিকে অফিস পরিদর্শনের দায়িত্ব দিয়ে নিজেরা অফিসের বাইরে বেরিয়ে আসা শ্রেয় বলে মনে করে। হ্যাঁ এরা কিন্তু ইভটিজিংও করে মহিলাদের গায়ের ওড়না টেনে নিয়ে। মেয়েদের বেআব্রু করার ইচ্ছা এদের প্রত্যেক সময়। মেয়ে দেখলেই এদের মন প্রান নেচে ওঠে পাড়ার বখাটে ছেলেদের মতো। অথচ পুলিশ এদের কোনো কেস দিতে পারে না। তা সে সিংহমের অজয় দেবগণই হোক বা সিম্বার রণবীর সিং, এদের কাছে সবাই কাবু। কলার ঠেলা নিয়ে বসা কোন কলাওয়ালার সাহস নেই ওদের কলা দিতে অস্বীকার করা। রাস্তার কলাওয়ালার কাছ থেকে কীভাবে হপতা তুলতে হয় সেটা ওরা জানে, হপতা না দিলে প্রয়োজনে কীভাবে ছিনিয়ে নিতে হয় সে ব্যাপারে ওরা সিদ্ধহস্ত। তাদের কলা দিয়ে ঘুষ না দিলে কোনো কলা বিক্রেতার অধিকার নেই ওখানে কলার ঠেলা নিয়ে বসার। শত হলেও তারা বইপাড়ার হনুমান তো! বুদ্ধিতে তাদের সঙ্গে পেরে ওঠে কার সাধ্যি। বই মানুষকে বুদ্ধি দেয়, কে বলতে পারে তার কিছু হাওয়া ওদের গায়েও লেগে যায়।


আতশ কাচের নীচে রেখে দেখলে এইসব ছোট ছোট ছবি মিলিয়ে দিল্লির বইপাড়ার যে চিত্রটা পাওয়া যায় সেটা এই রকমই। সাধারণ রোজনামচার জীবন, সকাল থেকে রাত হয় আর পাঁচটা অফিসপাড়ার মতোই কিন্তু কোথাও যেন নিজের মতো করে নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে রেখেছে এই পাড়া। এখানের এটাই বৈশিষ্ট্য যা কিনা অত্যন্ত সাধারণ হয়েও অনন্য হওয়ার দাবি রাখে। ভিড়ের মধ্যেও নজর কাড়ার দাবি রেখে, কেয়ারলেস বিউটির শিরোপা হেলায় অর্জন করে নেয় দিল্লির বইপাড়া।