• ১২ কার্তিক ১৪২৭, বুধবার
  • 28 October 2020, Wednesday
বুকসুখ ছবি: ইন্টারনেট।

বুকসুখ

শৌভনিক মণ্ডল

Updated On: 17 Oct 2020 12:02 am

Indian Mythology: Tales, Symbols, and Rituals from the Heart of the Subcontinent

লেখক: দেবদূত পট্টনায়েক

প্রকাশক: ইনার ট্র্যাডিশনস ইন্টারন্যাশনাল

মূল্য: ৩৫৫/-

 

আজ একটা মহাভারতের বহুল চর্চিত উপকথা দিয়ে শুরু করি। ঋষি জমদগ্নি, তার স্ত্রী রেণুকা এবং তাদের পাঁচ সন্তান। বলা হয়, রেণুকা এতটাই ‘পবিত্র’ ছিলেন যে তিনি যে কোনো অ-নির্মিত পাত্রে জল ধারণ করার ক্ষমতা রাখতেন। ঘটনাক্রমে নদীর পাড়ে, সেই রাজ্যের রাজাকে তিনি তাঁর রানির সঙ্গে সংগমরত অবস্থায় দেখে ফেলেন। রেণুকার মনে কামবাসনা জেগে ওঠে। এর ফলে ঋষি জমদগ্নি ক্রোধে উন্মাদ হয়ে যায়। তাদের পাঁচ সন্তানকে আদেশ করে রেণুকার শিরচ্ছেদ করতে। চার জন বিরত থাকে। পরশুরাম আদেশ পালন করেন।

ঘটনা এই খানে শেষ নয়। কুঠার হাতে পরশুরামের থেকে বাঁচতে রেণুকা দৌড়ে পালান এবং আশ্রয় নেন নিম্নবর্ণের এক মহিলার কুটিরে। পরশুরাম উত্তেজনায় শুধু তার মায়ের নয়, সেই নিম্নবর্ণের মহিলাটিরও শিরচ্ছেদ করেছিলেন যিনি পরশুরামকে মাতৃহত্যায় বাধা দিয়েছিলেন। ঋষি জমদগ্নি প্রসন্ন হন এবং পরশুরামকে বর চাইতে বলেন। পরশুরাম মাতৃপ্রাণ পুনঃস্থাপনের বর চান এবং ফলস্বরূপ একটি পাত্রে দৈব তরল পান যা শিরচ্ছেদের জায়গায় লাগিয়ে দিলে সেটি জুড়ে যায়। উত্তেজিত পরশুরাম আবার ভুল করেন। উচ্চবর্ণের রেণুকার মাথার সঙ্গে নিম্নবর্ণের মহিলাটির শরীর জুড়ে দেন এবং রেণুকার শরীরে জুড়ে দেয় নিম্নবর্গের মহিলাটির মাথা। চমৎকৃত হওয়ার মতো ব্যাপার, ঋষি জমদগ্নি নিজের স্ত্রী রূপে দ্বিতীয় নারীটিকে মেনে নেন এবং প্রথম নারীটি কৃষকদের দেবী ইয়াল্লাম্মা (ছবি-১) নামে পরিচিতি পায় ভারতবর্ষের প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায়।


মিথ এবং বিজ্ঞান দুটোই ভুবন রহস্য বুঝতে মানুষকে সাহায্য করে। মিথ যেটা প্রচলিত সংস্কৃতির মাধ্যমে করে বিজ্ঞান সেটাই করে সর্বজনীন স্তরে। দুটোই ব্যবহার হয় মানুষ, সমাজ এবং বিশ্বের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে আর বিজ্ঞান দিয়ে যখন মিথের খোসা ছাড়ানো হয় তখন তাকে বলা হয় মিথোলজি। দেবদূত পট্টনায়েকের এই বই হিন্দু মিথোলজির বিভিন্ন ঘটনার বেশ আধুনিক ব্যাখ্যা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। দেশীয় পুরাণের সঙ্গে সমান্তরালভাবে উঠে এসেছে বিভিন্ন দেশের উপকথা এবং তাদের সমাজে এর প্রাসঙ্গিকতা।

কোনো নির্দিষ্ট সমাজ বা দেশকে বুঝতে গেলে আমার মনে হয় বিজ্ঞানের থেকেও সেই স্থানের প্রচলিত মিথ অনেক বেশি কার্যকর কারণ বিজ্ঞান সর্বজনীন, কোনো সীমারেখা রক্ষা করার দায় নেই তার। তাই সে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য নির্ভর নয়। অপর দিকে মিথ শুধুই আঞ্চলিকতার বুনো গন্ধে ভরপুর।

শুরুতে লেখা ঘটনা বা উপকথাটি থেকে একটা গূঢ় বক্তব্য উঠে আসে। কৃষকের দেবীর অর্থ কৃষক নির্বিশেষে বোনা বীজের প্রাণ সঞ্চার করেন যিনি অর্থাৎ নিম্নবর্ণের নারীর ‘শরীর’ বেশ্যার প্রতিরূপ। সে বিবাহযোগ্যা নয়। তার শরীর উচ্চবর্ণের ঋষির কাছে ‘স্ত্রী’ হওয়ায় প্রত্যাখাত হয়। পিতৃতান্ত্রিক হিন্দু সমাজ যেমন নারীর নিজের যৌন বাসনাকে স্বীকৃতি দেয় না ঠিক তেমনি মানুষের শরীরের পবিত্রতা জন্মভিত্তিক, এই বিষবৃক্ষ স্ব-মূলে স্বীকৃতি পায়। ঘটনাটি আধুনিক এবং সময়ের বেড়া ভেঙে ভারতীয় সমাজে তাই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই বইটি চারটে পর্বে বিভক্ত। মিথোলজি, মিথোস্পেয়ার, মিথোপোয়েসিস এবং মিথোগ্রাফি।

মিথোলজি নিয়ে আগেই লিখেছি। মিথোস্পেয়ার পর্বে লেখক বিভিন্ন হিন্দু পৌরাণিক মতবাদ তুলনা করেছেন ইজিপ্ট, গ্রিক কিংবা চিন বা ইসলামের ভিন্ন আঞ্চলিক প্রথার সঙ্গে। উদাহরণস্বরূপ বলি, দু’ রকম ‘স্বস্তিক’ চিহ্ন পাওয়া যায়। একটি হিটলারের এবং অপরটি হিন্দু সমাজের। নিশ্চিত নই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে দুটোই এক রকম ছিল কিনা কিন্তু বর্তমানে আলাদা। হিটলারের ‘স্বস্তিক’ যেমন কালো রঙের এবং কাউনটার-ক্লকওয়াইস ঠিক তেমনি হিন্দুদের ‘স্বস্তিক’ লাল রঙের এবং ক্লকওয়াইস। প্রথম কে ‘স্বস্তিক’ এঁকেছিলেন সেটা ঠিক জানা যায় না। হিন্দু ধর্মে সেই সমস্ত ঘটনা বা বস্তুকে ‘পবিত্র’ বলে মেনে নেওয়া হয় যার উৎপত্তি কোনো মানুষের দ্বারা ঘটেনি, আরো পরিষ্কার ভাবে বললে যার উৎপত্তি কোনো সময়ের পরিমাপে ধরা দেয় না। যেমন ধরুন প্রথম যজ্ঞ কে করেছিলেন? অজানা। কিন্তু যজ্ঞ যে কোনো অনুষ্ঠানে পবিত্রতার মূলরূপ।

হিন্দু এবং খ্রিস্টান ধর্মে যৌনতাকে নিয়ে মেরু ভিন্ন দর্শন পাওয়া যায়। লাল রং হিন্দুমতে যৌন উর্বরতার লক্ষণ। খ্রিস্টান মতে লাল রঙের পরিধান নিকৃষ্ট কামুকতার নিদর্শন। বুঝতে হবে কোথা থেকে এই ভাবনা উঠে এসেছে। হিন্দুমতে যৌনতা একটি প্রক্রিয়ামাত্র প্রকৃতির আবহমান স্পন্দন বজায় রাখার জন্য। এই খানে ‘কাণ্ডারপা’ (ছবি-২) নামের এক দেবতার উল্লেখ বিশেষ প্রয়োজনীয়। ইনি শুধুমাত্র কামনা-বাসনা আর ভালোবাসার দেবতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু হিন্দু সমাজ একে প্রত্যাখ্যান করেছে। বোঝার বিষয় হল, হিন্দু সমাজে যৌনতা তখনই স্বীকৃতি পায় যখন সেই মানুষটি বা সেই দেবতা সমপরিমাণ ভক্তি কিংবা ভয় ভাবও সঞ্চার করতে সফল হন।


খ্রিস্টান মতে শুরু থেকেই  যৌনতা ‘Original sin’-এর ফল। তাই তাদের দর্শন ভিন্ন।

ঠিক একই ভাবে মিথোপোয়েসিস পর্বে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধার্মিক কাজ কর্মের বিবর্তনের ইস্তেহার এবং মিথোগ্রাফি পর্বে নানা পৌরাণিক ছবির ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

দেবদূত পট্টনায়েকের এই বই পাঠকের মনে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তার দিক খুলে দেয়। হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন রূপক ধর্মী আধুনিক সংস্কার ইদানীং কালে স্থাবর জঞ্জালে পরিণত হয়েছে কিছু ক্ষমতালোভী মানুষের সৌজন্যে। বইটি যদি ধৈর্য ধরে পড়তে পারেন তাহলে নিশ্চয়ই অনুভব করতে পারবেন হিন্দু মিথোলজি মানুষকে খুঁজে পাওয়ার এক অত্যন্ত আধুনিক প্রয়াস ছাড়া কিছু নয়। কিছু জায়গায় হয়তো নানারকম প্রশ্ন জাগতে পারে পাঠকের মনে। সেটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। যত বইটির গভীরে প্রবেশ করবে পাঠক তত সে মেলানোর খেলায় মেতে উঠবে। কিন্তু দিনের শেষে এই বইটি তাকে অনুভব করাবে, ‘All that is rational is actual and all that is actual is rational’. এই খানেই হয়তো লেখনীর বৈশিষ্ট্য।

জানেন কি ‘হিন্দু’ শব্দটি প্রথম কোথায় খুঁজে পাওয়া যায়? কিংবা প্রাণঘাতী অস্ত্রের নাম কী করে ‘সুদর্শন’ হতে পারে? অথবা গণেশের বাহন কেন ইঁদুর? জানতে ইচ্ছে করছে? তাহলে পড়ে ফেলুন বইটি। সমৃদ্ধ হবেন।

একটা কথা বলে শেষ করি। রামায়ণের বহু ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পড়েছি, বিভিন্ন বইতে। তবে এই রকম ফ্রয়েডিয়ান ব্যাখ্যার থেকে আমি এই বইটা পড়ার আগে পর্যন্ত বহু দূরে ছিলাম। ধন্যবাদ লেখককে আমার বহু শেকলের একটা উন্মুক্ত করার জন্য।

সবশেষে বইয়ের একটি অংশ হুবহু তুলে দিলাম আপনাদের জন্য,

‘A projectionof the desire to kill the father (Dasaratha) onto a father figure (Ravana) who deprivesman (Rama) of what he rightfully deserves (Ayodhya/Sita)’